পিনাকী ধোলে, মহম্মদবাজার: এক সময়ে এই নদীতে কত দাপিয়ে বেড়িয়েছি। এখন নদীটার দিকে আর তাকানো যায় না। দেখলে বড্ড কষ্ট হয়! একদৃষ্টিতে ময়ূরক্ষীর দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ করছিলেন মহম্মদবাজারের ভূতুরা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ। গত এক দশকে যথেচ্ছ বালি তোলার ফলে ময়ূরাক্ষী আজ মৃত্যু খাদ। মুনাফার লোভে নদীবক্ষ থেকে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বালি উত্তোলন চলছেই। ফলে নদীর স্রোত এবং স্বাভাবিক গতি উভয়ই রুদ্ধ হচ্ছে। ক্রমশই ভাঙছে নদীর পাড়। পরিবেশবিদদের দাবি, এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোর অস্তিত্বই মুছে যাবে। প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের কারও কারও সঙ্গে মাফিয়াদের ‘যোগসাজশ’ না থাকলে বেআইনি এসব কাজকর্ম বছরের পর বছর চলে কী করে? বীরভূমের অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর) শুভম আগরওয়াল বলেন, এই ধরনের অবৈধ কারবার বরদাস্ত করা হবে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রের খবর, গত কয়েক বছরে ময়ূরাক্ষী নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি মহম্মদবাজার ব্লকের ভূতুরা গ্রামও মারাত্মক নদী ভাঙনের সাক্ষী থেকেছে। গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে ময়ূরাক্ষী নদী। নদীর তীর ঘেঁষে কালীমন্দিরে কাছে বসে ধান ঝাড়ার কাজ করছিলেন দুই মহিলা। তাঁদেরই একজন বলছিলেন, গত বর্ষায় এই এলাকার নদীর বাঁধ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর দীর্ঘ পাড় বন্যার জলে তলিয়ে গিয়েছে। ভাঙতে ভাঙতে নদী মন্দিরের কাছে এসে ঠেকেছে। অপরজন মন্দিরের অদূরেই একটি বালিঘাটের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, এভাবে যদি প্রতিদিন আট-দশটা জেসিবি মেশিন নদীতে নামিয়ে শ’য়ে শ’য়ে ট্রাক ভর্তি বালি পাচার করা হয়, তাহলে তো নদীর পাড় ভাঙবেই। দুই মহিলার কথপোকথনের মাঝে এক বৃদ্ধ এসে হঠাৎই শোনাচ্ছিলেন, ও নদীতে এখন নামলেই মরণ আছে গো। গ্রামের বাচ্চাগুলিকে বারণ করি। যেন ওদিকে গেলেও, নদীতে না যায়। কেন? তাঁর দাবি, যেভাবে বালি তোলা চলছে, তার ফলে নদীর বুকে তৈরি হয়েছে পেল্লায় সব গর্ত। সেখানে একবার তলিয়ে গেলে প্রাণ বাঁচানোই দায়। স্নান করতে নেমে কতজন যে তলিয়ে গেল এই নদীতে!
ভূতুরা কালীমন্দিরের সামনে দিয়ে শুকনো ময়ূরাক্ষীতে নামলেই চোখে পড়ে নদীর বর্তমান অবস্থা! একদিকে নদীর পাড় ভেঙে কঙ্কালসার চেহারা, অন্যদিকে নদীবক্ষে অন্তত দশটি জেসিবি মেশিন নামিয়ে দেদার চলছে বালি উত্তোলন। প্রতিবাদ করেন না? গ্রামেরই বাসিন্দাদের একাংশ বলছিলেন, পুলিশ-প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সবাই তো বিকিয়ে গিয়েছে। কাকে বলব? বলেও কোনও লাভ হয়নি। গ্রামেরই কয়েকজন যুবকের দাবি, বেশি মুখ খুললে মাফিয়াদের হুমকির মুখে পড়তে হয়। গ্রেফতারির ভয় দেখায়। তাই কেউ আর প্রতিবাদ করার সাহস দেখায় না। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রশাসনের যত নিয়ম কানুন সব নদীর তীরে এসেই থমকে গিয়েছে। নদীতে চলে বালি মাফিয়াদের রাজত্ব। সেখানে সরকারি বিধিনিয়ম চলে না। রাস্তা দিয়ে শত শত চোরাই বালির গাড়ি ছুটে চলেছে দেখেও মুখ বুঝে থাকে পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা। নদী গবেষকদের কথায়, নিয়ম না মেনে অবাধে বালি তোলায় বিপদের মুখে ময়ূরাক্ষী দুই পারের বাসিন্দারা। বালি ঘাটগুলিতে ৭০-৮০ ফুটের বেশি গর্ত করে বালি তোলা চলছে। নদীর তলদেশে বড় বড় গর্তের কারণেই নদীর স্রোত এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বর্ষার সময় ওই গর্তে ঘূর্ণি তৈরি হয়। বন্যায় নদীর পাড় ভাঙে। গতিপথ বদলে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী বাঁচাতে সবচেয়ে বেশি জরুরি প্রশাসনের নজরদারি। প্রশাসনের এক কর্তা অবশ্য বলেন, মাঝেমধ্যেই নদীঘাটগুলিতে অভিযান চালানো হয়। অবৈধ বালির গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
মহম্মদবাজারে নদী থেকে বালি
তোলা হচ্ছে। -নিজস্ব চিত্র