আজকাল ‘কল্পতরু’ কথাটা লোকমুখে বেশ প্রচলিত। আমরা বুঝি আর না বুঝি, প্রাপ্তির আশা আংশিক পূর্ণ হলেই কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। নেতা বা মন্ত্রী মঞ্চে দাঁড়িয়ে গুচ্ছের প্রকল্প ঘোষণা করলেন। শ্রোতারা হাততালির ঝড় বইয়ে বলতে লাগলেন—‘আহা, মন্ত্রী যেন কল্পতরু।’ ছেলে বা মেয়ের জন্মদিনে হরেক রান্না করেছেন মা। নতুন জামা-প্যান্টের সঙ্গে উপরি পাওনা হয়তো বাইক কিংবা স্মার্টফোন। সন্তানরা বলে ফেলল, ‘মা, তুমি তো আজ কল্পতরু।’ আবার, কাউকে বিদ্রুপ করতেও কথাটা বহুল ব্যবহৃত। পাড়ার কোনও হাড়কিপটে ব্যক্তিকে দেখে ছেলে-ছোকরারা টিপ্পনি কাটে এই বলে—লোকটা কিন্তু কল্পতরু! যা চাইবি, তার চেয়ে ঢের বেশি পাবি! অর্থাৎ, একটাকা চাঁদা চাইলে একশোটা কথা। এটাও এক ধরনের প্রাপ্তি। অতঃপর, তিনি কল্পতরু। সমাজজীবন থেকে গার্হস্থ্য—এমন উদাহরণের শেষ নেই। আসলে, আমাদের সাগরসম চাওয়া-পাওয়াকে অতি সংক্ষেপে বোঝাতে যুক্তাক্ষর সহ এই পাঁচ অক্ষরের বিকল্প সম্ভবত বাংলা অভিধানে নেই।
কিন্তু, সত্যি কি ‘কল্পতরু’ কথাটি এতটাই ঠুনকো? চাহিদা পূরণের জবরদোস্ত উপমা হিসেবে ব্যবহার করে যা কিছু চাওয়ার অধিকার বর্তায়? এক কথায় উত্তর, না। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের ‘কল্পতরু’ হয়ে ওঠাকে কেন্দ্র করে আজকে যে চারিদিকে উৎসবের আয়োজন, তার সঙ্গে প্রচলিত ‘কল্পতরু’ কথাটি বড্ড বেমানান। কাশীপুর উদ্যানবাটীতে সেদিন ঠাকুর কিন্তু তাঁর গৃহী ভক্তদের অর্থ, যশ, খ্যাতি পেতে আশীর্বাদ করেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘তোদের চৈতন্য হউক।’ সেটাও আবার গড়পরতা সবাইকে বলেননি। নিজের তৃতীয় নয়ন দিয়ে যাঁদের দেখেছিলেন এবং বুঝেছিলেন যে এঁরাই চৈতন্য হওয়ার যোগ্য, তাঁদেরকেই স্পর্শ করেছিলেন। বাকি ভক্তদের বলেছিলেন, ‘তোদের এখনও সময় হয়নি।’ ঠাকুরের এই তৃতীয় নয়ন বা দিব্যদর্শন নিয়ে একটা বিজ্ঞান ভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রখ্যাত মস্তিস্ক বিজ্ঞানী ডঃ সিদ্ধার্থ গঙ্গোপাধ্যায়। সে কথায় পরে আসছি।
এখন দেখা যাক, ‘কল্পতরু’ কথাটির উৎপত্তি ঠিক কোথায়। সনাতন ধর্মের ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ পুরাণ সহ একাধিক পুরাণে কথাটির উল্লেখ রয়েছে। অমৃতের সন্ধানে দেবতা ও অসুরদের সমুদ্রমন্থনের কিংবদন্তি আখ্যান আমরা সবাই জানি। সেই মন্থনের সময় সমুদ্র থেকে উঠে আসে আশ্চর্য অনেক কিছুই। উদ্ভাসিত হয়েছিলেন শ্রীলক্ষ্মী, ঐরাবত, দৈবঘোটক, অপ্সরাকুল, কামধেনু, চন্দ্র। সেইসঙ্গে অবশ্যই হলাহল এবং অমৃত। এ সব ছাড়াও উঠে এসেছিল এক অত্যাশ্চর্য বৃক্ষ। যাকে পুরাণে ‘পারিজাত’ বলা হয়েছে। পরবর্তীকালে স্বর্গের মাহাত্ম্য বোঝাতে পুরাণকাররা ইন্দ্রের প্রমোদ কাননের প্রধান গাছ হিসেবে পারিজাতের নাম নিয়েছেন। এই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে দেবতারা যা চাইতেন, তাই পেতেন। এমনকি অসুররাও বিমুখ হতেন না। তাই পারিজাত বৃক্ষকে একাধিক পুরাণে বলা হয়েছে ‘কল্পতরু’।
পুরাণকেন্দ্রিক এই ‘কল্পতরু’ পরে ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম অলঙ্কার হয়ে ওঠে। উৎসব হিসেবে পালন করতে শুরু করেন নৃপতিগণ। গৌতমবুদ্ধের সংসার ত্যাগের ঘটনা স্মরণ করতে প্রাচীন বৌদ্ধ রাজারা বছরে একবার ‘কল্পতরু’ হতেন। যে যা চাইতেন, তাই পেতেন। পরে স্বাধীন হিন্দু রাজারাও ‘কল্পতরু উৎসব’ প্রচলন করেন। শেষ কল্পতরু রাজা হয়েছিলেন প্রতাপাদিত্য। এই রাজ ঐশ্চর্য নির্ভর ‘কল্পতরু উৎসব’ আর ঠাকুরের ‘কল্পতরু’ হয়ে ওঠাও এক নয়। সেদিন কেবলমাত্র ঠাকুরের আধ্যাত্মিক অবদানকে তুলে ধরতে তাঁর প্রিয় শিষ্য রামচন্দ্র দত্ত পুরাণে বর্ণিত কল্পতরু বা পারিজাত বৃক্ষের সঙ্গে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের তুলনা টেনেছিলেন। দিনটির নামকরণও করেছিলেন তিনি নিজেই—‘কল্পতরু দিবস’। যা পরে ‘কল্পতরু উৎসব’ নামে বাংলা ও বাঙালির আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হয়ে ওঠে।
দিনটা ১৮৮৬ সালের পয়লা জানুয়ারি। কাশীপুর উদ্যানবাটী যেন হয়ে উঠেছিল দেবরাজ ইন্দ্রের নন্দন কানন। ঠাকুর স্বয়ং পারিজাত বৃক্ষ (আমগাছ, মতান্তরে খেজুর গাছ)। বেশ কিছুদিন ধরেই গলার স্বরযন্ত্রের যন্ত্রণায় ঠাকুর ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। প্রচণ্ড অসুস্থ। তৎকালীন প্রখ্যাত চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল দত্তের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ঠাকুর। কোনও ওষুধ আর কাজ করছে না। মহেন্দ্রলাল পরামর্শ দিলেন কিছুদিনের জন্য শহরের বাইরে কোথাও নিয়ে যেতে। অর্থাৎ, দক্ষিণেশ্বর ছাড়তে হবে ঠাকুরকে। কিন্তু, তাঁর যা শারীরিক অবস্থা তাতে বেশি দূরে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। গভীর চিন্তায় পড়লেন পরমহংসের শিষ্যরা। অবশেষে ঠিক হল কাছেপিঠে কাশীপুরের বাগানবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে ঠাকুরকে। বাগানবাড়িটি রানি কাত্যায়নীর জামাই গোপাললাল ঘোষের। ভক্তরা তাঁর কাছে গিয়ে ঠাকুরের অবস্থা বর্ণনা করে বাগানবাড়িটি ভাড়ায় নেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। গোপাললাল মাসিক ৮০ টাকা ভাড়া নেওয়ার শর্তে রাজি হলেন। ১৮৮৫ সালের ১১ ডিসেম্বর। ভক্তরা ঠাকুরকে নিয়ে গিয়ে উঠলেন ওই বাগানবাড়িতে। দেখভালের দায়িত্ব পড়ল সন্নাসী ভক্তদের উপর। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শরৎ, শশী, বাবুরাম, রাখাল, নিরঞ্জন, বুড়ো গোপাল, লাটু, নরেন্দ্র প্রমুখ। অন্যদিকে, সংসারী ভক্তরাও ঠাকুরকে নিয়মিত দেখতে আসতেন। তাঁদের অন্যতম ছিলেন মহেন্দ্র মাস্টার মানে মহেন্দ্র গুপ্ত (পরে যিনি কথামৃত লিখে শ্রীম নামে সমধিক পরিচিত হন)। আসতেন প্রখ্যাত নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ, মনমোহন, রামচন্দ্র দত্ত, সুরেন মিত্র সহ অনেকেই। সবার সঙ্গে ঘরেই দেখা করতেন। টানা ২০ দিন প্রায় শষ্যাশায়ী থাকার পর পয়লা জানুয়ারি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন ঠাকুর। একাই হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন জলঘরের পিছনের দরজা দিয়ে। পরনে লালপেড়ে ধুতি, গায়ে লালপাড় বসানো চাদর, কানঢাকা টুপি। সঙ্গে একটি পিরান এবং পায়ে জুতো।
বাগানবাড়িতে তখন হিমেল পরশ। আমগাছের তলায় দাঁড়িয়ে গিরিশ ঘোষ, রামচন্দ্র দত্তরা। ঠাকুরের দর্শনপ্রার্থী সকলেই। হাতে ফুলের মালা ও নানান উপহার সামগ্রী। ঠাকুরকে খানিক সুস্থ দেখে সবাই আনন্দে আত্মহারা। শিষ্যদের কাছে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ। গিরিশের মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন,‘আচ্ছা, গিরিশ তুমি যে সকলকে এত কথা বলিয়া বেড়াও, তুমি কি দেখিয়াছ ও কি বুঝিয়াছ?’ উত্তর দিতে গিয়ে খানিক ঢোক গিললেন নাট্যকার। পরক্ষণেই বললেন, ‘ব্যাস-বাল্মীকি যাঁর ব্যাখ্যা করতে পারেননি, আমি আর কি বলব! শুধু এটুকু বলতে পারি, তুমি আর কেউ নও। নররূপধারী পূর্ণব্রহ্ম ভগবান। পাপীতাপীদের মুক্তির জন্য নেমে এসেছ।’ ঠাকুর বললেন—এ আর তোদের কী বলিব? চৈতন্য হউক।’ বলেই শিষ্যদের কারও বুকে, কারও মাথায় নিজের হাত ছুঁইয়ে ভাব সমাধিস্থ হলেন।
এখানে লক্ষণীয়, ঠাকুর কিন্তু জীবনের একেবারে অন্তিম সময়ে এসে শিষ্যদের মধ্যে চৈতন্য বিলোলেন। এটা তো তিনি আগেও বিলোতে পারতেন। কিন্তু না, ঠাকুর সেটা করেননি। দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণীর সেবক হয়ে আসার পর থেকে তিনি শুধু আহরণ করে গিয়েছেন। তার থেকে প্রাপ্ত নির্যাস বিলিয়েছেন। কথার ইন্দ্রজালে আকৃষ্ট করেছেন ভক্তদের। বশীভূত করেছেন নিজের জাগতিক চাওয়া-পাওয়াকে। ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’র প্রবক্তা হয়েও তিনি গ্রহণ করেননি কোনওটাই। গীতায় বলা নিষ্কাম কর্মে নিজেকে কঠোরভাবে নিয়োজিত রেখে ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। তাঁর উপলব্ধি, ‘যত মত, তত পথ।’ অর্থাৎ, তুমি যে পথেই যাও না কেন গন্তব্য একটাই—ঈশ্বর লাভ বা পরম সত্যকে উপলব্ধি করা। কোনও একটি মতকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করে অন্যের মতকে ঘৃণা করা উচিত নয়। সকল ধর্মীয় মতবাদ ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনোর ভিন্ন ভিন্ন উপায়মাত্র। এতদিন ঠাকুর এসব আধ্যাত্মিক তত্ত্বকথা বলতেন। ভক্তরা শুনতেন। কিন্তু কতটা আত্মস্থ করতে পেরেছেন, সেটা জানতে তিনি মোক্ষম সময় বাছলেন জীবন সায়াহ্নে। তৃতীয় নয়নে তিনি দেখতে পেলেন অন্তিম সময় আগত। এতদিন ধরে যা কিছু শেখালাম, যা কিছু দিয়ে গেলাম, সবকিছুরই ধারক হোক আমার ভক্তরা। তাই তিনি সুস্থ হয়ে চলে এলেন গিরিশদের মাঝে। সময় নষ্ট না করে শুধু বললেন, ‘তোদের চৈতন্য হোক।’ অর্থাৎ, ‘ভিতরের সব অন্ধকারকে দূর করে জ্ঞানের আলোয় তোরা বিকশিত থাকিস। অন্যকেও আলোকিত করিস।’ ঠাকুরের দু’টি চর্মচক্ষুর কাছে সেদিন গিরিশরা ছিলেন নিমিত্তমাত্র। আর তৃতীয় নয়ন খুলে তিনি আসলে দেখেছিলেন গোটা মানবজাতির সংকটময় ভবিষ্যৎকে। বুঝেছিলেন, এতদিন তাঁর বিলি করা আধ্যাত্মিক স্ফুলিঙ্গ দিশা দেখাতে পারে সংকটমুক্তির। সেদিন সেই স্ফুলিঙ্গে শুধু অগ্নিসংযোগ ঘটালেন ‘চৈতন্য হোক’ বলে। কিন্তু, ঠাকুরের কল্পতরু হয়ে ওঠার ১৪০ বছর পরও কি আমাদের আদৌ চৈতন্য হল?
আমাদের সবার মধ্যেই একটা ‘তৃতীয় চক্ষু’ থাকে। যাকে মস্তিষ্ক বিজ্ঞানীরা বলেছেন, পীনিয়াল গ্রন্থি। দুই ভ্রুর মাঝখানে কপালের ঠিক নীচে এর অবস্থান। ঠাকুরকে নিয়ে গবেষণালব্ধ একটি গ্রন্থে সিদ্ধার্থবাবু লিখেছেন,‘ঠাকুরের এই পীনিয়াল গ্রন্থিটি ছিল অতি সক্রিয়। অবতারদের তৃতীয় নয়ন বা পীনিয়াল গ্রন্থি তখনই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে যখন তাঁরা ভাবমুখে থাকেন। অর্থাৎ, হালকা সমাধিতে অবস্থান করেন। রামকৃষ্ণের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই হতো।’ নিগূঢ়ানন্দও ঠাকুর সম্পর্কে এই একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
আজ, পয়লা জানুয়ারি। ঠাকুরকে স্মরণ করে ‘কল্পতরু উৎসব’-এ মেতেছে গোটা বাংলা। মনোস্কামনা পূরণ করতে আমরা ছুটছি। মঠ ও মিশনগুলিতে সকাল থেকে উপচে পড়া ভিড়। ঠাকুর কিন্তু নিজের মনোস্কামনা পূরণে চেতনা চৈতন্যের কথাই বলেছিলেন। আমরা ক’জনই বা চৈতন্য জাগরণে বিবেকের প্রার্থনা করি?