সংবাদদাতা, কাঁথি: দীঘার কাছে রামনগরের খোলাবেড়িয়া গ্রামের বিখ্যাত মাদুর শিল্প বিপণনের অভাব সহ নানা সমস্যার সম্মুখীন। তবে দীঘার জগন্নাথ মন্দির গড়ে ওঠার পর এই কুটির শিল্পও ঘুরে দাঁড়াবে, এই আশায় বুক বাঁধছেন শিল্পীরা। খোলাবেড়িয়ায় ৫০টির কাছাকাছি পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। খোলাবেড়িয়া গ্রামেরই মাদুর শিল্পী সরযূবালা গিরি হাতে বোনা বিভিন্ন ডিজাইনের মাদুর তৈরি করে বেশ কয়েকবছর আগে দিল্লিতে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়াও আরও কয়েকজন মাদুরশিল্পী নতুন নতুন ডিজাইনের মাদুর তৈরি করে রাজ্য ও জাতীয় স্তরে বিভিন্ন সময়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। সব মিলিয়ে খোলাবেড়িয়ার মাদুরশিল্প দশকের পর দশক ধরে ঐতিহ্য বহন করে এগিয়ে চলেছে। এমন একটি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উন্নয়নে সরকারিভাবে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে দীঘায় একটি বিপণন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি তুলেছেন শিল্পীরা।
উল্লেখ্য, খোলাবেড়িয়া ছাড়াও পার্শ্ববর্তী সাদি, কনিওরা, বালকবাড়, নীলকণ্ঠপুর, দামোদরপুর, বাধিয়া এলাকার বেশকিছু পরিবারও মাদুর তৈরির কাজ করেন। সব মিলিয়ে রামনগরের ওই অংশে দেড়শোর কাছাকাছি পরিবার এই শিল্পে যুক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাদুর তৈরির কাঁচামাল হল, মাদুরকাঠি, সুতো ও কাপড়। মাদুরকাঠি পশ্চিম মেদিনীপুরের খাকুড়দা ও সবং এলাকা থেকে আসে। কাপড় কলকাতার বড়বাজার থেকে এবং সুতো এজেলার রাধামণি থেকে আসে। বর্তমানে বাজারে ডিজাইন দেওয়া ফোল্ডিং মাদুর ছেয়ে গিয়েছে। তাঁত বোনা মেসিনেই ফোল্ডিং মাদুর তৈরি হয়। তবে চিরাচরিত ‘মসলন্দ’ মাদুর কিন্তু হাতেই বোনা হয়। প্রথমে কাঠিগুলি বড় কাঁচিতে কাটা হয়। তারপর নানা প্রক্রিয়ার সাহায্যে বিভিন্ন সাইজের মাদুর তৈরি হয়। এখানকার তৈরি মাদুর ওড়িশার বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি হয়। এছাড়া দীঘার সৈকত সহ বিভিন্ন জায়গায় সরকারি উদ্যোগে হস্তশিল্প মেলায় পসরা সাজিয়ে বিক্রি করেন শিল্পীরা। কলকাতা ছাড়াও ভিনরাজ্যে অর্ডার অনুযায়ী পাইকারি হিসেবে পাঠানো হয়। কেউ পাইকারি হিসেবে মাদুর কিনে ব্যবসা করেন। আবার কেউ আগ্রহী হয়ে এলাকায় এসে মাদুর কিনে নিয়ে যান। তবে সরকারি উদ্যোগে কোনও বাজার কিংবা বিপণন কেন্দ্র না থাকা এই শিল্পের মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
আরও সমস্যা হল, নতুন প্রজন্ম এই কাজে আগ্রহী নয়। মাদুরশিল্পীদের পরিবারের ছেলেরাই এতে যুক্ত না থেকে ভিনরাজ্যে কাজের সন্ধানে পাড়ি দেয়। তাছাড়া এমনিতে সারাদিনে দিনমজুরির কাজ করে পাঁচশোর কাছাকাছি টাকা মেলে। তুলনামূলকভাবে এখানে কম টাকায় কেউ কাজ করতে চান না। এরফলে কারিগর পাওয়াই মুশকিল হয়ে উঠেছে। পুরনো কারিগরদের দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে। বর্তমানে মাদুর তৈরির উপকরণ মাদুরকাঠি, সুতো কিংবা কাপড়ের দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সব খরচখরচা সামলে উপযুক্ত দাম পান না শিল্পীরা। এভাবে মাদুরশিল্প নানা সমস্যায় জর্জরিত। খোলাবেড়িয়ার মাদুরশিল্পী পূর্ণচন্দ্র গিরির অধীনে বেশ কয়েকজন কারিগর কাজ করেন। তিনি মাদুরশিল্পী হিসেবে রাজ্য সরকারের তরফে পুরস্কৃতও হয়েছেন। পূর্ণচন্দ্রবাবু বলেন, উৎপাদিত মাদুর সরকারি উদ্যোগে বিপণনের ব্যবস্থা করা দরকার। দীঘায় শুধু মাদুরের জন্য একটি বিপণন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে খুবই ভালো হবে। বেড়াতে আসা পর্যটকরা মাদুর কিনতে পারবেন এবং মাদুরশিল্পী বা ব্যবসায়ীদের বিক্রিবাট্টাও খুব ভালো হবে। মাদুরশিল্পী সরযূবালাদেবী, বিজয়কৃষ্ণ গিরিরা বলেন, অনেক সমস্যা সত্ত্বেও আমরা জীবিকার তাগিদ আর ঐতিহ্যের টানে কাজ করে যাই। রামনগর-১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নিতাইচরণ সার বলেন, খোলাবেড়িয়ার মাদুরশিল্প রামনগরের ঐতিহ্য। উৎপাদিত মাদুর যাতে সঠিকভাবে বিপণন হয়, তার জন্য দীঘায় একটি কেন্দ্র তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে।