সংবাদদাতা, পুরুলিয়া ও মানবাজার: বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। কিন্তু, নতুন বাড়িতেই নতুন বধূকে নিয়ে আসবেন বলে জেদ ধরে ছিলেন বরাবাজারের বাঁধডি গ্রামের তরতাজা যুবক সুখেন মাহাত। সেই মতো বাড়ি নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগচ্ছিল। সম্পূর্ণ হয়ে গেলেই বিয়ের আয়োজন। তার আগে সব শেষ! সুখেনের আর দেখা হল না নতুন বাড়ি, নতুন বউয়ের মুখ! বাংলায় কথা বলার অপরাধে বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রে খুন হতে হল সুখেনকে। তাঁকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ।
বান্দোয়ান বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বরারাজার ব্লকের বাঁধডি গ্রামে বাড়ি সুখেনের। বাবা ধীরেন মাহাত, মা চঞ্চলা মাহাত ও তিন ভাই, এক বোন নিয়ে তাঁর সুখের সংসার।
বাড়ির মেজো ছেলে সুখেন। ছোট বোন নন্দিনীর বিয়ে হয়েছে আগেই। ঘটনার খবর পেয়েই বাঁধডিতে আসেন নন্দিনী। তিনি বলেন, ‘তিন দাদাই মহারাষ্ট্রের পুনেতে কাজ করতেন। গত প্রায় দু’বছর ধরে তাঁরা সেখানকার একটি বাইকের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাতে কাজ করছেন। বড় দাদা এবং মেজো দাদা একসঙ্গে একই জায়গাতেই কাজ করত। দাদারা কষ্ট করে আমার বিয়ে দিয়েছিল। সেই ধাক্কা সামলে নতুন বাড়ি তৈরি করার কাজ শুরু করেছিল। সেই বাড়ি আর সম্পূর্ণ হল না।’ নতুন বাড়ি তৈরির পরই সুখেন সহ অন্য দুই ভাইয়ের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। নন্দিনী কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘সব ওলোট পালট হয়ে গেল। আমার সঙ্গে দাদার ৫-৬ দিন আগে কথা হয়েছিল ফোনে। তারপর আর কথা হয়নি। তবে বাবার সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো। সোমবার ডিউটির জন্য রুম থেকে বেরিয়েছিল। আর বাড়ি ফেরেনি। পরের দিন খোঁজখবর শুরু করে দাদা। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে বাড়িতেও জানিয়েছিল। তারপরই দেহ উদ্ধার হয়। আমি দোষীদের চরম শাস্তি দাবি করছি।’ সুখেনের বাবা ধীরেন মাহাত বলেন, ‘ওখানে সাতমাস ছিলাম চোখে অস্ত্রোপচারের জন্য। ওখানে তো মারাঠি ভাষা আর হিন্দি। আমি কিছু বুঝতাম না। ছেলেটাও বুঝতে ও বলতে পারতো না বলে সমস্যা হতো। কিন্তু, সেই সমস্যার জন্য ছেলেটাকে প্রাণ দিয়ে দিতে হবে, তা ভাবতেও পারছি না।’ কাকা দীনেশচন্দ্র মাহাত বলেন, ‘বাকি দুই ভাইও খুব টেনশনে ছিল। ওরা জানিয়েছে, ওদের ভাষার সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গের লোক বলেই এই অবস্থা।’ খুড়তুতো ভাই উজ্জ্বল মাহাত বলেন, ‘মারাঠি ভাষা বলতে না পারলে অত্যাচার হয়, এটা আগে থেকেই শুনেছি। নিজেও তিনমাস কাজ করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেছি। ভাষার কারণেই দাদাকে খুন করা হয়েছে বলে মনে হয়।’ সুখেনের সঙ্গেই পুনেতে কাজ করতেন তাঁর দাদা তুলসীরাম মাহাত। তিনি ভাইয়ের দেহ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনাও দিয়েছেন। তিনি ফোনে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের তো বহু মানুষ মহারাষ্ট্রে কাজ করেন। তাঁরা তো দিব্যি কাজ করছেন। কোনও সমস্যা হয়নি। ভাইয়ের যদি কোনও দোষ থাকত, তা হলে আইন-আদালত ছিল। সাজা হতো। কিন্তু খুন করা হল কেন? আমাদের রাজ্য সরকারের উচিত বিষয়টি নিয়ে জাতীয়স্তরে সরব হওয়া।’