অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: এ যেন ঠিক প্রদীপের নীচে অন্ধকার। কাটোয়ার কার্তিক লড়াইয়ে থিম, রঙিন আলো ও বাহারি মণ্ডপের ভিড়ে তিনি যেন ব্রাত্য। অথচ তাঁকে ছাড়া কার্তিক লড়াই সম্পন্ন হয় না। বহু পুজো উদ্যোক্তার ভরসা বছর ৬৫-র মন্টু দাস। কার্তিক পুজোয় যে ঐতিহ্যবাহী ‘থাকা’ তৈরি হয় তার বাঁশের ম্যারাপ বেঁধে দেন মন্টুবাবু। অথচ তিনিই থাকেন শহরের শেষ প্রান্তে ছোট কুঁড়েঘরে। কার্তিক লড়াই আজও টিকিয়ে রেখেছে তাঁর সংসার।
রামায়ণ বা মহাভারত, পৌরাণিক কাহিনি এই থাকার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। থিমের মণ্ডপের পাশাপাশি থাকা দেখতে হাজার হাজার মানুষ কাটোয়া শহরে ভিড় জমায়। একসময় থাকাই ছিল পুজোর মূল আকর্ষণ। ওই থাকাই মন্টুবাবুর হাতের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। কার্তিক লড়াই এলেই তাঁর ডাক পড়ে। থাকা সাজাতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।
১০ নম্বর ওয়ার্ডের সুকান্তপল্লির বাসিন্দা মন্টুবাবু। বাড়িতে স্ত্রী ছবিদেবী ও এক ছেলেকে নিয়ে থাকেন। তিন মেয়ের আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কার্তিক লড়াইয়ের উৎসবই তাঁকে সারা বছর রুটিরুজি জোগায়। শহরের আলোর ঝলকানিতে মন্টুবাবুর মতো বহু মানুষের অবদান থাকে। উদ্যোক্তারা বলেন, কার্তিক লড়াইয়ের থাকা বাঁধা কঠিন কাজ। বাঁশ দিয়ে পিরমিডের মতো আকার তৈরি করা হয়। বাঁশের এই কাঠামোয় থাক থাক করে বসানো থাকে ২৫-৩০ বা ৪২টি মাটির তৈরি মূর্তি। পুরাণের বিভিন্ন কাহিনি তুলে ধরা হয়। এরই নাম ‘থাকা’। এই থাকার মধ্যমণি রাজা কার্তিক। মাটির পুতুল তৈরি করেন মৃৎশিল্পীরা। সেই পুতুল রামায়ণ বা মহাভারতের পালা অনুযায়ী বাঁশের কাঠামোতে বসানোর কাজ করেন মন্টুবাবু। এমনকী, তিনি বাঁশের কাঠামোও বেঁধে দেন। এবার মন্টুবাবু কাটোয়া শহরে শাঁখারিপট্টি, খড়ের বাজার, বড়বাজার, ঝাউতলা গলি, চাউলপট্টি, কিশলয়, ঝংকারের মতো পুজোর থাকা করেছেন। ঝংকার ক্লাবের সম্পাদক কালীচরণ চট্টোপাধ্যায় বলেন, মন্টুবাবুর এখন বয়স হয়েছে। কিন্তু, থাকা সাজাতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তিনিই আমাদের ভরসা।
মন্টু বাবু থাকেন ভাগীরথীর পাড়ে টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট একটি ঘরে। তিন দশক ধরে তিনি এই কাজ করছেন। এখন তিনি বয়সের ভারে খুব বেশি পারেন না। তা সত্ত্বেও বহু থাকা তাঁরই হাতে বাঁধা। তাঁর স্ত্রী ছবিদেবী বলছিলেন, কার্তিক লড়াই আমাদের সংসারটা আগলে রেখেছে। আমাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, এই পুজো আমাদের পেটের ভাত জোগায়। মন্টুবাবু বলেন, থাকায় মাটির পুতুল পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে বসাতে হয়। আর সেই কৌশলও আমি ছোটোবেলায় রপ্ত করেছিলাম। এবারও পাঁচটি থাকা আমি বেঁধেছি। কার্তিক লড়াই এলেই আমার রোজগার হয়। অভাবের সংসারে যা পাই তাতেই চলে যায়। সস্ত্রীক মন্টু দাস।-নিজস্ব চিত্র