সংবাদদাতা, রামপুরহাট: হাসপাতালে প্রসবযন্ত্রণা উঠতেই বারবার কুঁকড়ে যাচ্ছিল ছোট্ট মেয়েটি। তাকে দেখে চমকে গিয়েছিলেন কর্তব্যরত চিকিৎিসক, নার্সরা। কিছু পরে ফুটফুটে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেয় সে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাড়ে চোদ্দ বছরে বিয়ে। ষোলো বছরেই সন্তানের জন্ম! পুলিসে অভিযোগ জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফল যা হওয়ার তাই। সন্তানের মুখ দেখার বদলে শ্রীঘরে ঠাঁই বছর একুশের যুবকের। নাবালিকাকে বিয়ে ও সহবাসের অভিযোগ তুলে পকসো ধারায় মামলা করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার ধৃতকে রামপুরহাট পকসো আদালতে তোলা হলে ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
রঞ্জন মাল নামে ওই যুবকের বাড়ি মাড়গ্রাম থানার বিষ্ণুপুর গ্রামে। পেশা বলতে দিনমজুর। বছর দেড়েক আগে ঝাড়খণ্ডের ওই নাবালিকাকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে এসে বিয়ে করে। নাবালিকার মা ও বাবা মাড়গ্রামের একটি ইটভাটায় কাজে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গেই থাকত নাবালিকা। তখনই তার সঙ্গে পরিচয় হয় রঞ্জনের। পরে নাবালিকা বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝাড়খণ্ডে ফিরে যান। কোনওভাবে তার বাড়ির ঠিকানা জোগাড় রঞ্জন সেখানে পৌঁছয়। নাবালিকাকে নিয়ে এসে একটি মন্দিরে বিয়ে করে। কিছুদিনের মধ্যেই নাবালিকা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। বাড়ি ফিরে আসে অভিযুক্ত।
গত জুলাই মাসের শেষে নাবালিকার প্রসব যন্ত্রণা ওঠে। তাকে রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মেয়েটির চেহারা দেখেই চিকিৎসকদের সন্দেহ হয়। মাত্র ১৫ বছর বয়স জানতে পারার পরই হাসপাতালে চাঞ্চল্য ছড়ায়। মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ নথিভুক্ত ঠিকানা দেখে মাড়গ্রাম থানার পুলিসকে জানায়। পুলিস তদন্ত করে পকসো ধারায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে। বিষয়টি জানতে পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল রঞ্জন। সোমবার রাতে বাড়ি ফিরতেই পুলিস তাকে গ্রেপ্তার করে।
গত ১৯ জুন নলহাটির পাখা খিদিরপুর গ্রামের সোহেল শেখ নামে বছর কুড়ির এক যুবককে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার করে মাড়গ্রাম থানার পুলিস। ১০ জুলাই মাড়গ্রামের হাঁড়িপাড়া থেকে শ্রীকান্ত মাল নামে বছর আঠারোর এক যুবককেও গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিস সূত্রে খবর, এখনও পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে আটটি এমন তথ্য মিলেছে। সেইমতো আটজন যুবককেই গ্রেপ্তার করে পকসো ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
বাল্যবিবাহ ও নাবালিকা প্রসূতিতে রাজ্যের মধ্যে শীর্ষস্থানে বীরভূম। যেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মতো সরকারি প্রকল্প চালু করেছেন সেখানেই বাল্যবিবাহের অভিশাপে মেয়েদের শিক্ষা দূরে চলে যাচ্ছে। বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে ধারাবাহিক প্রচার চললেও আটকানো যাচ্ছে না নাবালিকা বিয়ে ও অকাল মাতৃত্ব। অনেকে মারাও যাচ্ছেন। প্রশাসনিক কর্তাদের উদ্বেগ সেখানেই। এই পরিস্থিতি দূর করতে জেলা প্রশাসন, পুলিস, বিচার বিভাগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যদপ্তর মিলে উদ্যোগ নিচ্ছে। কিছুদিন আগে জেলাজুড়ে প্রতিটি স্কুলে শপথবাক্য পাঠ সহ নাবালিকা বিয়ের কুফল বোঝাতে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। সেই সঙ্গে প্রশাসনের তরফে বলা হয়, কোথাও নাবালিকা বিয়ে হলে দুই পরিবার, ডেকরেটার্স, পুরোহিত সহ সকলকে গ্রেপ্তার করা হবে। জেলাশাসক বিধান রায় বলেন, নাবালিকা বিয়ে সামাজিক ব্যাধি। সেটা দূর করতে প্রশাসনের সর্বস্তরের আধিকারিক থেকে কর্মী একযোগে কাজ করছেন। সবার মিলিত প্রয়াসে এই ব্যাধি আমরা দূর করবই। নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষদেরও এবিষয়ে সজাগ থাকার থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।