মৃণালকান্তি দাস: বড়দিনের আগের রাত। সবাই যখন আলো জ্বালিয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে, এবেনিজার স্ক্রুজ তখন বসে তার অন্ধকার, ঠান্ডা, কৃপণতায় মোড়া ঘরে। সে একমনে মুদ্রা গুনছে, আর এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা তার কর্মীকে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইশারা করছে। ওই কর্মী বড়দিনের একটি দিন পরিবারের সঙ্গে কাটাতে চায়। কিন্তু স্ক্রুজের কাছে তার ছুটির আর্জি সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দের মতো মনে হচ্ছে। স্ক্রুজ ভাবছে, গরিব মানুষের উৎসবের কী প্রয়োজন? তার বদলে কাজ করলে
ক্ষতি কী!
ঠিক তখনই দরজা খুলে ঘরে ঢোকেন দুই ব্যক্তি। হাতে তালিকা, মুখে বিনয়। তাঁরা এসেছেন স্থানীয় গরিবদের জন্য সামান্য কিছু সাহায্য চাইতে। যাতে বড়দিনে গরিবদের কাছে অন্তত খানিকটা উষ্ণতা পৌঁছে দেওয়া যায়। কিন্তু স্ক্রুজ তাঁদের দিকে এমনভাবে তাকায়, যেন তাঁরা ধনরত্ন লুট করতে এসেছেন। বিরক্তির ভাঁজে কুঁচকে ওঠে তার মুখ। হুমকির সুরে হাত নাড়তে নাড়তে সে দু’জনকে ঘর থেকে বের করে দেয়। চেঁচিয়ে ওঠে স্ক্রুজ। মুখ থেকে বেরিয়ে আসে বিষাক্ত বাক্য— যদি তারা মরতেই চায়, তবে মরুক। তাতে অন্তত বাড়তি জনসংখ্যা একটু কমবে! কোনও মানুষের হৃদয় কতটা কঠোর হলে এমন কথা মুখে আসতে পারে?
চার্লস ডিকেন্সের বিখ্যাত গল্প ‘ক্রিসমাস ক্যারল’-এ আমরা যে মানুষটির সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই, তিনি কৃপণতার এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। রাগী, শুষ্ক, ঠান্ডা হৃদয়ের এবেনিজার স্ক্রুজ। দুনিয়ার কোনও আনন্দ তাকে ছুঁতে পারে না। স্ক্রুজের ভাষা শুধু গল্পের নির্মমতা নয়, এটি ইতিহাসের গভীর এক ভয়কেও প্রতিফলিত করে। কারণ, পৃথিবীতে ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই মানুষের মনে জন্ম নিয়েছিল সেই জনসংখ্যার আতঙ্ক— অসংখ্য মুখ, সীমিত খাবার। মানুষ যত বাড়ছে, খাবার কি সেই হারে বাড়ছে? পৃথিবীর টেবিল কি এত মুখ সামলাতে পারবে? প্রকৃতি কি এত উদার যে মানুষের সব দাবি মেনে নেবে? সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের পিছনে চুপিসারে হেঁটে চলেছে এই অস্থিরতা। ডিকেন্স আমাদের মনে করিয়ে দেন, যখন সমাজব্যবস্থার অন্দরে করুণা শুকিয়ে যায়, যখন মানুষ সংখ্যাকে জীবনের থেকে বড়ো করে দেখে, তখন মানবসভ্যতা অন্ধকারেই হারিয়ে যেতে শুরু করে! স্ক্রুজের নিষ্ঠুর কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই ভয়ই পরবর্তী সময়ে ম্যালথাসের তত্ত্ব হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ব্রিটিশ সংস্থা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরিচালিত ইস্ট ইন্ডিয়া কলেজের প্রথম অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন টমাস রবার্ট ম্যালথাস। তাঁর মস্তিষ্ক ছিল তীক্ষ্ম গণিতজ্ঞের মতো। তিনি জনসংখ্যার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, মানুষ শুধু জন্ম নিচ্ছে, আর শস্যক্ষেত্রগুলি ছোটো হয়ে যাচ্ছে। জমি একই থাকছে, কিন্তু মানুষের চাহিদা বাড়ছে। শিল্পবিপ্লবের শব্দ পথঘাট কাঁপিয়ে তুলছে। শহরের ঘরবাড়িগুলি ভরে উঠছে নতুন নতুন শ্রমিকে। রাস্তাগুলি জনতার ঢল সামলাতে হিমশিম। আর এই সমস্ত কিছু দেখে ম্যালথাসের মনে জেগে ওঠে এক ভয়— এই পথে যদি মানবজাতি এগোয়, তাহলে একদিন খাবার কমে যাবে। অভাব বাড়বে। আর মানুষ প্রকৃতির কাছে হেরে যাবে। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অ্যান এসে অন দ্য প্রিন্সিপাল অব পপুলেশন’-এ লিখলেন, মানুষের জনসংখ্যা বাড়ে দুই, চার, আট, ষোল– এভাবে জ্যামিতিক হারে। কিন্তু খাবার বাড়ে এক, দুই, তিন, চার– সোজা সোজা গাণিতিক হারে। ম্যালথাসের চোখে এই দুই বৃদ্ধির রেখার ব্যবধানই ছিল সভ্যতার ভবিষ্যৎ বিপদের
মূল। ডিকেন্সের কাহিনি লেখার ঠিক আগেই, ম্যালথাস এমন এক অর্থনৈতিক মতবাদ প্রকাশ করেছিলেন, যার জন্য মানুষ তাঁকে অর্থনীতির স্ক্রুজ, অর্থাৎ কৃপণ, নির্দয় তত্ত্বের ফেরিওয়ালা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিল।
ম্যালথাস এই বিপদকে বললেন, পুপলেশন ট্রাপ বা জনসংখ্যার ফাঁদ। তিনি ঠিক যেন ভবিষ্যতের ভয়াবহতার দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন— বড়ো বড়ো শহর, দরিদ্র পরিবার, শিশুদের ক্ষুধার্ত চোখ, কাজের চাপে থরথর কাঁপা শ্রমিক শ্রেণির কাহিনি। ইংল্যান্ডের গ্রামগঞ্জে তখন সত্যিই এমন কঠিন সময় ছিল। অভাব, অসুখ-বিসুখ, ক্ষুধা, ভিড়, দুর্দশা ছিল নিত্যসঙ্গী। মানুষ বাড়ছে, কিন্তু তাদের কাছে খাবার পৌঁছাচ্ছে না। কারণ, উৎপাদিত খাবার জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। ম্যালথাস বললেন, প্রকৃতির নিয়ম কঠোর, শীতের কামড়ের মতো নির্মম। প্রকৃতি ভারসাম্য চায়, আর সেই ভারসাম্য আনতে হলে দুর্ভিক্ষ আসবে। মহামারী আসবে। যুদ্ধ লাগবে। সঙ্গে আসবে মৃত্যু। এই তত্ত্বকে তিনি বললেন, প্রকৃতির কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা পজিটিভ চেকসের কথা। যা নিমর্মতার মধ্য দিয়ে জনসংখ্যা কমায়। তবে তিনি আরও এক কথা বললেন, মানুষ যদি বুদ্ধিমান হয়, তবে এই বিপদ এড়ানো সম্ভব। যদি মানুষ জন্মহার কমায়, কম বয়সে বিয়ে না করে, নিজের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, নাগরিক দায়িত্ব গ্রহণ করে, তবে প্রকৃতির নির্মম হাত নামার আগেই মানুষ নিজেই ভারসাম্য রাখতে পারে। একে তিনি বললেন, স্বেচ্ছায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ।
এই ভয় ছড়িয়ে পড়ে সবচেয়ে বেশি শিল্পবিপ্লবে। কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠছে, জনতার ঢল বাড়ছে, শহরের বুকে দারিদ্র্য ছড়িয়ে যাচ্ছে, খাদ্যের অভাব বাড়ছে। শহর আর গ্রাম দু’দিক থেকেই যেন একটি সতর্ক সংকেত পাওয়া যাচ্ছিল। তবে ইতিহাসের নিয়মই হল, চূড়ান্ত ভয়ের সময়ই কোনও অদৃশ্য পথ খুলে যায়। একই সময়ে অন্য চিন্তাবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানীরা এগিয়ে এলেন। তাঁরা বললেন, মানুষ শুধু খাবার খায় না, মানুষ খাবার বানায়ও। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি আর মানুষের চেষ্টা ধীরে ধীরে ম্যালথাসের আঁকা অন্ধকার ভবিষ্যতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন পথ খুলে দিল। কৃষক আর বিজ্ঞানী মিলে চেষ্টা শুরু করলেন, কীভাবে কম জমিতে বেশি ফসল ফলানো যায়। পুরোনো গ্রামের আত্মনির্ভর ব্যবস্থা বদলে গিয়ে তৈরি হয় বড়ো বড়ো বাজার আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। অর্থনীতির ভাষায়, ম্যালথাস শুধু চাহিদা দেখেছিলেন। সরবরাহের গতিশীল চরিত্রটি পুরোপুরি ধরতে পারেননি। ইতিহাস দেখিয়েছে, ভুল ছিলেন ম্যালথাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বে জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং মাথাপিছু জিডিপি-ও বেড়েছে পাঁচ গুণ। প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি বরং জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করেছে। প্রশ্ন হল, তাহলে ভারত বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ হয়ে ওঠায় এত উদ্বেগ কেন?
জনসংখ্যাকে ‘অফুরান সম্ভাবনা’ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না কয়েক দশক আগেও। স্বস্তির কথা, আজকের দুনিয়া বিশ্বাস করে না, জনসংখ্যা বৃদ্ধি মানবিক এবং পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। খোদ রাষ্ট্রসংঘের পপুলেশন ফান্ড-এর ‘স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন’-এর রিপোর্টের শিরোনামই হল, ‘এইট বিলিয়ন লাইভ্স, ইনফাইনাইট পসিবিলিটিজ’। ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যাকে বলা হয়েছে ‘১৪০ কোটি সুযোগ’। কিন্তু জনবিস্ফোরণের যে তত্ত্ব ম্যালথাস বড়ো মুখ করে প্রচার করেছিলেন এবং তাঁর ভক্তরা দুই শতাব্দী ধরে যে তত্ত্বের ধুয়ো তুলে জনসংখ্যার চাপে পৃথিবীর ভেঙে পড়ার ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়ে আসছেন, তার শেষ ভরসাস্থল ভারত। বিপুল থেকে বিপুলতর জনসংখ্যাই এই দেশের প্রকৃত সমস্যা, জনবিস্ফোরণ দমন করতে না পারলে সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী— এমন ধারণা এ দেশে এখনও বহুলপ্রচলিত। অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস ঠিকই বলেছিলেন, মৃত ধারণারাই দীর্ঘকাল রাজত্ব করে। মৃত ধারণার প্রভাবে সঞ্জয় গান্ধী ভারতের দারিদ্র্য দূর করার জন্য বলপ্রয়োগ করে জন্মনিয়ন্ত্রণে ব্রতী হয়েছিলেন। ভারতীয় গণতন্ত্র সেই অপচেষ্টাকে প্রতিহত করে। কিন্তু আজও এ দেশের নেতাদের মুখে দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়: কাজটা তো জরুরি ছিল, জোর না করলে জন্মনিয়ন্ত্রণ হবে কী উপায়ে?
অথচ, জনসংখ্যা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, কোনও জাতির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.১ এর নীচে নেমে গেলে সেই সমাজের অবলুপ্তি ঘটে। এর আগেও বহু ভাষা ও সভ্যতা এ ভাবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বিশ্বের বহু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বিপুল জনসংখ্যা ভারতকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনসংখ্যায় তরুণ প্রজন্মের সংখ্যাধিক্যজনিত সুবিধা অর্জন করার সুযোগ এনে দিয়েছে। মূলত চারটি বিষয়ের উপরে নির্ভর করে এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’— কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও কর্মদক্ষতা, স্বাস্থ্য এবং সুশাসন। ভারত যদি তার কর্মক্ষম জনসংখ্যার জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারে, তা হলে তার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড-এর সুফল অর্জনের স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হবে। একটি সুস্থ এবং দক্ষ কর্মীর দল শুধু উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে তা সরকারের আর্থিক চাপ কমায় এবং দেশের মূলধন সৃষ্টিতে সাহায্য করে। ভারতের জনসংখ্যাই এই দেশকে বিশ্বে অন্যতম শক্তি করে তুলতে পারে। শুধু ক্রেতা হিসেবে নয়, শ্রমশক্তি হিসেবেও।
আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির জীববিদ্যার অধ্যাপক পল এরল্যাখ দিল্লি আসেন ১৯৬৬-তে। দিল্লির অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েই শুরু তাঁর ১৯৬৮-র বই, দ্য পপুলেশন বম্ব। এরল্যাখ-এর বইয়ে দিল্লির বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৬৬-তে দিল্লির জনসংখ্যা কিন্তু ৩০ লক্ষেরও কম। প্যারিসের জনসংখ্যা তখন ৮০ লক্ষ। অথচ, সেই সময় প্যারিসের উন্নত সামাজিক অবস্থা প্রমাণ করে, সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ জীবনধারা। জীবন এবং জীবনশৈলীর গুণগত মান উৎকর্ষ না হলে দেশের নেতাদের মাথায় ম্যালথাসের ভ্রান্তি চেপে বসবেই!
যে কোনও দেশের জনসংখ্যার বেলাগাম বৃদ্ধি অমোঘ নয়, অনিবার্যও নয়। বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে সমস্যা অবশ্যই আছে। কিন্তু তা সংখ্যার সমস্যা নয়। তা তরুণ প্রজন্মকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সমস্যা। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ ভারতবাসীর বয়স পঁয়ত্রিশের নীচে। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশ অপুষ্ট, অশিক্ষিত, অদক্ষ হলে পরিণাম কী হতে পারে, সেটাই আতঙ্কের। এ দেশের নেতারা আধুনিক জনসংখ্যা বিজ্ঞানের ভাষা কবে বুঝবেন?