সংবাদদাতা, পুরুলিয়া: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ক্লাস শুরু হতে সকাল এগারোটা। গ্রামের কচিকাঁচাদের স্কুল যাওয়ার হেলদোল নেই। টিউশন বা বাড়িতে পড়ানোর মতো কেউ নেই। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া বইখাতার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই গ্রামের শিশুদের। তার উপর জঙ্গলে ঘেরা গোটা গ্রাম। রাত নামে অনেক তাড়াতাড়ি। সন্ধ্যা সাতটা বাজলেই ঘুমিয়ে পড়াটা রীতি। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির গ্রামে এসে শিশুদের এমন রুটিন দেখে বেশ অবাকই হয়েছিলেন মালতী। স্বামীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। পরে গ্রামবাসীদের সঙ্গেও আলোচনা হয়। কীভাবে গ্রামের ছেলে মেয়েদের পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়িয়ে তোলা যায়। কিন্তু কি করলে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে গ্রাম, সেটা ঠাহর করতে পারছিলেন মালতি। দীর্ঘকালের একটা রেওয়াজকে রাতরাতি বদলে দেওয়াটা খুব সহজ নয়। তবে, হাল ছাড়েননি মালতী মুর্মু, তাঁর স্বামী বাঙ্কা মুর্মু এবং গ্রামেরই আর এক যুবক ভরত মুর্মু। সবাই মিলে ঠিক করেন, সকাল সকাল শিশুদের পড়াবেন। গ্রামেরই এক ব্যক্তির ছোট্ট একটা টিলার ওপর ত্রিপল খাটিয়ে পড়ানো শুরু হয়। সকাল ৬ টা থেকে ৯টা পর্যন্ত সেখানে পড়ার পর বাড়িতে স্নান খাওয়া সেরে জিলিংসেরেং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে যাবে তারা। সেই শুরু। পরে গ্রামবাসীরা নিজেরা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। কেউ কায়িক শ্রম দিয়ে, কেউ বা অন্য ভাবে সাহায্য করেন। বাইরের একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও এসে সাহায্য করেছে। কেউ দিয়েছে বাচ্চাদের পোশাক। কেউ আবার মাটির ঘর তৈরিতে সাহায্য করেছেন। কেউ আবার টিফিনের ব্যবস্থাও করেছেন। পরে ভরত মুর্মু অন্য একটি স্কুলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। পড়ানোর কাজে আরও এক বধূ মমতা মুর্মু এগিয়ে আসেন। স্কুলের অন্যান্য কাজের যুক্ত হন মেনকা মুর্মুও।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে অনেকেই মালতী মুর্মু নামটার সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু মালতী সহ গ্রামের একাধিক বধূ নিজেদের উদ্যোগে কোচিং ক্লাস শুরু করার কাজটা সহজ ছিল না। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের একপ্রান্তে জিলিংসেরেং গ্রাম। পাহাড়ের নীচে থাকা বুড়দা-কালীমাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত। কয়েকবছর আগে সেখানে প্রথম ঢালাই রাস্তা হয়েছে। গ্রামের কয়েকটা ঘর পেরিয়েই পাহাড়ি রাস্তায় ডানদিকে খানিকটা নেমে একটা টিলার ওপর মাটির ঘর। সেখানেই ‘মারাং বুরু জাহের আয়ো ইতুম আসরা’ নামের ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রধান শিক্ষিকা মালতী মুর্মু। স্বামী বাঙ্কা মুর্মুও ওই স্কুলের পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনা করেন।
মালতীর দুই ছেলে এবং স্বামী ও শ্বাশুড়ি নিয়ে সংসার। বড়ছেলের বয়স ৫ বছর এবং ছোট ছেলের সবে ২ মাস। তাকে কোলে নিয়েই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মালতী। তিনি বলেন, বাংলা এবং অলচিকি ছাড়াও ইংরেজি এবং গণিতও শেখানো হয়। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই বাড়ির কাজ সেরে কোচিং সেন্টারে চলে যেতে হয় সকাল ৬ টার মধ্যেই। ৯টার পর স্কুলের অনান্য কাজ সেরে বাড়ি ফেরেন। তারপর চাষের কাজেও যেতে হয়। মালতী বলছিলেন, গ্রামের শিশুরা নিয়মিত ক্লাসে আসছে। বিনামূল্যে ওই কোচিং পড়ে। এর পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। সেখানে মিড ডে মিল খায়। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বাচ্চাদের কোচিং ক্লাসের জন্য ড্রেসের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমি নিজে কোনও পারিশ্রমিক পাই না। গ্রামের শিশুদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ। তাছাড়া সরকারি স্কুলে তো বাংলা মিডিয়ামের। কোচিং ক্লাসে তো নিজেদের অলচিকিও ভাষাও শিখতে পারছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আরও বড় করে গড়ে তুলতে চান বাঘমুন্ডি হাইস্কুলে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করা ‘মালতি দিদিমনি।’