সুখেন্দু পাল, গলসি: স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আখড়া চান্না আশ্রম এখন গাছ মাফিয়াদের দখলে। নির্জন এলাকা হিসেবে বিপ্লবীরা এই গ্রামটিকে বেছে নিয়েছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্লুপ্রিন্ট ঠিক করতে সুভাষচন্দ্র বসু, রাসবিহারী বসু, বটুকেশ্বর দত্ত প্রমুখ এই আশ্রমে বৈঠক করেছিলেন। দেশে স্বাধীনতা এসেছে। কিন্তু, এই আশ্রমের শ্রী ফেরেনি। উল্টে নির্জন এই আশ্রম থেকে গাছ কেটে সাফ করে দেওয়া হচ্ছে। দিনের আলোতেই গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে।
শুক্রবার দুপুরে এক সময়ের বিপ্লবীদের আখড়ায় গিয়ে দেখা গেল, রাস্তার উপরেই কাটা গাছের পরপর গুঁড়ি পড়ে রয়েছে। ৪০৭ জাতীয় গাড়িতেও বেশ কয়েকটি গাছের গুঁড়ি তোলা রয়েছে। প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন গাছ কাটছে। আশ্রম ঢোকার রাস্তায় কয়েকটি ছোট গাছও কাটা হচ্ছে। গাড়িতে গাছের গুঁড়ি তুলতে তুলতে একজন শ্রমিক বলেন, পারিশ্রমিকের জন্য কাজ করছি। গাছ কাটার অনুমতি আছে কি না, আমি জানি না। এলাকার এক ‘দাদা’ গাছ কাটার জন্য বলেছেন। এসব নিয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।
আশ্রমের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ১০থেকে ১৫জন যুবক। তাঁরা কেউ কিছু বলতে চাইলেন না। তবে গ্রামের এক ব্যক্তি বলেন, চান্না আশ্রমের ইতিহাস কারও অজানা নয়। বর্ধমানের গর্ব এই আশ্রম। সেখানে এভাবে গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে। এটা লজ্জার। প্রশাসনের উচিত কড়া পদক্ষেপ নেওয়া। এই আশ্রমের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক অয়েশা রানি এ বলেন, ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বনদপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, বিষয়টি জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখছি। স্থানীয়রা বলেন, পূর্ব বর্ধমান জেলাজুড়ে গাছ মাফিয়ারা সক্রিয় রয়েছে। আউশগ্রাম জঙ্গল থেকেও দেদার গাছ কেটে পাচার করা হয়েছে। কিন্তু, চান্না আশ্রম থেকেও নির্বিচারে গাছ কাটা হওয়ায় অনেকেই অবাক। এমনিতেই এই আশ্রমের কোনও উন্নয়ন হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা যে ঘর গুলিতে বসে বৈঠক করতেন সেগুলি ভেঙে পড়তে বসেছে। বিভিন্ন জেলার পর্যটকরাও চান্না গ্রামে ঘুরতে এসে আশ্রমের হতশ্রী চেহারা দেখে একরাশ ক্ষোভ নিয়ে ফিরে যান।
ওই গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, আশ্রমের উন্নয়নের জন্য বহুবার দরবার করা হয়েছে। কিন্তু, সেভাবে কিছু হয়নি। এক সময় এই গ্রাম জঙ্গলে ঘেরা ছিল। পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে খড়ি নদী। ভৌগলিক অবস্থানের জন্যই বিপ্লবীরা এই গ্রামটিকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু, সেই জঙ্গল অনেক আগেই উধাও হয়ে গিয়েছে। শুধু আশ্রমে কিছু গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এখন সেগুলিও কাটা শুরু হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে বিপ্লবীদের এই আখড়া বা আশ্রম অচিরেই হারিয়ে যাবে। জেলা প্রশাসনের অপর এক আধিকারিক বলেন, বনদপ্তর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে। এধরণের ঐতিহাসিক জায়গায় থাকা গাছ কাটার অনুমতি কখনোই দেওয়া হয়নি। পুরোটাই বেআইনি।-নিজস্ব চিত্র