Bartaman Logo
১৩ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মা সারদা

বাঁকুড়া জেলায় অবস্থিত জয়রামবাটী নামক এক নিভৃত পল্লীতে ১২৬০ সালের ৮ই পৌষ (১৮৫৩ খ্রীষ্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর) রাত্রে, কৃষ্ণাসপ্তমী তিথিতে শ্রীমা সারদার শুভ আবির্ভাব হয়।

মা সারদা
  • ৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বাঁকুড়া জেলায় অবস্থিত জয়রামবাটী নামক এক নিভৃত পল্লীতে ১২৬০ সালের ৮ই পৌষ (১৮৫৩ খ্রীষ্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর) রাত্রে, কৃষ্ণাসপ্তমী তিথিতে শ্রীমা সারদার শুভ আবির্ভাব হয়। তাঁহার পিতা শ্রীরামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন দরিদ্র কিন্তু উদার ও সত্যনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ। মাতা শ্রীমতী শ্যামাসুন্দরী ছিলেন সরলতার প্রতিমূর্তি। মা সারদা ছিলেন তাঁহাদের প্রথম সন্তান। পরে তাঁহাদের আরও পাঁচটি পুত্র এবং একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। অতি অল্প বয়সে একটি কন্যা ও একটি পুত্রের মৃত্যু হয়।

Advertisement

শ্রীরামকৃষ্ণের মত মা সারদার জন্মবৃত্তান্ত সম্বন্ধেও অলৌকিক কাহিনী আছে যাহা তিনি নিজ মুখে বর্ণনা করিয়াছেন—সরস্বতী পুজার সময় শ্যামাসুন্দরী দেবী তাঁহার পিতৃগৃহে এক বেলগাছের তলায় অসুস্থ হইয়া পড়েন। সেই সময় লাল চেলী পরা একটি ছোট্ট মেয়ে বেলগাছ থেকে নামিয়া আসিয়া তাঁহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল, —“আমি তোমার ঘরে আসছি।” শ্যামাসুন্দরী দেবী তখন অজ্ঞান হইয়া পড়েন। এই ঘটনার পর শ্রীরামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গৃহে যে শিশু কন্যাটির জন্ম হয়, তিনিই জগজ্জননী মা সারদার।
পল্লীগ্রামের আর পাঁচজন মেয়ের মতই মা সারদার বাল্য ও কৈশোর অতিবাহিত হয়। সেকালে গ্রামের মেয়েদের লেখাপড়া শেখার প্রচলন ছিলনা। ভায়েদের সঙ্গে তিনি মাঝে মাঝে পাঠশালায় যাইতেন কিন্তু পড়াশুনা বেশীদূর অগ্রসর হয়নি। পরবর্তী কালে শ্রীরামকৃষ্ণের ভাইঝি লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে আবার পড়াশুনা শুরু করিয়াছিলেন কিন্তু ভাগ্নে হাদয় বই কাড়িয়া নেওয়ায় এবারও সেটা সম্ভব হয়নি। বহুদিন পর আবার দক্ষিণেশ্বরে সে চেষ্টা করেন; ফলে কিছুটা পড়িতে পারিতেন কিন্তু লিখিতে পারিতেন না।
মা সারদার বয়স যখন পাঁচ অতিক্রম করিয়া ছয়ে পড়িয়াছে, সেই সময় শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁহার বিবাহের সম্বন্ধ হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ তখন দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর পূজক। ভগবৎ সাধনায় তিনি এতই তন্ময় হইয়া থাকিতেন যে, মহামায়ার দর্শনলাভের জন্য খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম—সব কিছু ত্যাগ করিয়া কেবল “মা-মা” বলিয়া দিন-রাত কাঁদিতেন। লোকে মনে করিত তিনি বোধহয় উন্মাদ হইয়া গিয়াছেন। এই সংবাদ কামারপুকুরে পৌঁছাইলে তাঁহার বাড়ির লোকজন ভাবিলেন—বিবাহ দিলে বোধহয় এই সমস্যার সমাধান হইবে। তাই মনোমত পাত্রীর সন্ধান চলিতে লাগিল। একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেই পাত্রীর সন্ধান দিলেন তিনি বলিলেন, “জয়রামবাটীর রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ঘরে পাত্রী ‘কুঁটো বাঁধা’ আছে।” শ্রীরামকৃষ্ণের বয়স তখন তেইশ পূর্ণ হইয়া চব্বিশে পড়িয়াছে। ১২৬৬ সালের বৈশাখ মাসে শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে মা সারদার বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিবাহ কোনও সাধারণ বিবাহ নয়; এ বিবাহ জগতের প্রভুর সঙ্গে জগজ্জননীর বিবাহ। এই দৈবী বিবাহের ফলে জগতের অশেষ কল্যাণ সাধন হইয়াছে।
শ্রীরামকৃষ্ণ কামারপুকুরে অবস্থানকালে মা সারদা শ্বশুরালয়ে গমন করেন; তখন তাঁহার বয়স তেরো-চৌদ্দ বৎসর। এখানে শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট হইতে তাঁহার নানাপ্রকার শিক্ষা শুরু হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের ত্যাগ মণ্ডিত জীবনের আদর্শ, দৈনন্দিন জীবনে গৃহকর্ম, গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি করা, ছোটদের স্নেহ-ভালবাসা দেওয়া—সব শিক্ষাই তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট হইতে লাভ করেন এবং তিনি উপলব্ধি করেন যে তাঁহার স্বামী শুধু একজন অসাধারণ মানুষই নন, ত্যাগী এবং সদানন্দ পুরুষ। এই সব কথা উল্লেখ করিয়া মা সারদা বলিয়াছেন, “হৃদয় মধ্যে আনন্দের পূর্ণঘট যেন স্থাপিত রহিয়াছে ঐ কাল হইতে সর্বদা এইরূপ অনুভব করিতাম।” দক্ষিণেশ্বরে ফিরিয়া আসিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ পূর্বের ন্যায় ধর্ম সাধনায় ডুবিয়া গেলেন। তাঁহার ভাবোন্মাদনা এবং অদ্ভুত আচরণের জন্য লোকে তাঁহাকে উন্মাদ বলিয়া মনে করিতে শুরু করিল। এই সংবাদ জয়রামবাটীতে পৌঁছাইলে সেখানকার লোকে মা সারদাকে পাগলের স্ত্রী বলিয়া উপহাস করিতে লাগিল।
তারাপদ দাস সংকলিত ‘শ্রীমা সারদা দেবীর উপদেশামৃত’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ