বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট:
বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট:
১৭০১ সালে মুর্শিদকুলি খাঁয়ের সময় নাটোরের তৎকালীন রাজা উদয় নারায়ণের অধীনস্থ জমিদার রামজীবন চৌধুরী প্রথম মায়ের মন্দির নির্মাণ করেন। তখন থেকেই মায়ের শিলামূর্তির উপর কালীর আরাধনা শুরু হয়। যা প্রায় ৩২৫ বছর ধরে চলছে। পরবর্তীকালে ১৭৭৫ সালে রানি ভবানীর দত্তক পুত্র রাজা রামকৃষ্ণ রায় তারা মায়ের রাজবেশের উপর কালীপুজোর প্রবর্তন করেন। তাঁকে সহায়তা করেন তৎকালীন সাধক দ্বিতীয় আনন্দনাথ। তখন থেকে আজও মায়ের রাজবেশের উপর কালীপুজো হয়ে আসছে। আবির্ভাব তিথি, কৌশিকী অমাবস্যার পর কালীপুজোয় স্বর্ণালঙ্কারে সাজিয়ে তোলা হয় দেবীর বিগ্রহ। সারা বছর সেই অলঙ্কার থাকে গোপন জায়গায় ও লকারে। এমনটাই জানান তারাপীঠের গবেষক তথা প্রবীণ সেবাইত প্রবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়।
কথিত আছে, তারামায়ের মধ্যেই সব দেবীই বিদ্যমান আছেন। তাই সকল দেবীকে তারামায়ের সঙ্গে অভেদ কল্পনাজ্ঞানে পুজো করা হয়। তাই আলোর দেবীর আরাধনা উপলক্ষ্যে আলোকিত হয়ে উঠেছে গোটা তারাপীঠ। বৈদ্যুতিক আলো নয়। প্রথা অনুযায়ী মায়ের মন্দির, শ্বেত শিমুলতলা, পঞ্চমুণ্ডির আসন, বশিষ্ট ও বামদেবের সিদ্ধিলাভের জায়গা ও মায়ের পাদপদ্মে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করবেন সেবাইত বাড়ির মহিলারা। শবদাহ ও তন্ত্র সাধনার যজ্ঞের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে অন্ধকারচ্ছন্ন মহাশ্মশান। মা তারার স্মৃতি বিজড়িত জীবিতকুণ্ডটি প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে তোলা হবে। এদিন নিশিরাতে মাকে সোনার মুকুট ও গয়না পরিয়ে ডাকের সাজে সাজিয়ে তোলা হবে। এরপর গর্ভগৃহে একদিকে চলে চণ্ডীপাঠ, পাশাপাশি চলে তারা অঙ্গে শ্যামাকালীর পুজো।
মায়ের স্বর্ণালঙ্কার কোথায় থাকে? প্রবোধবাবু বলেন, ১৭০১সালে মায়ের শিলামূর্তিকে শ্মশান থেকে উদ্ধার করে যখন মন্দিরে বসানো হয় তখন শিলার উপরই পুজো অর্পণ করা হতো। সেইসময় সেভাবে স্বর্ণলঙ্কার নিবেদন করা হতো না। পরবর্তীকালে সাধক বামাক্ষ্যাপা সিদ্ধিলাভ করেন। তারপর থেকেই ভক্ত সমাগম বাড়তে শুরু করে। অনেকের মনোস্কামনা পূরণ হওয়ায় স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে ভক্তরা পুজো দিতে শুরু করেন। ১৯২৭সালে নাটোরের তৎকালীন বীরেন্দ্রকুমার রায় বাহাদুরের সঙ্গে তারাপীঠের সেবাইত যতীন্দ্রনাথ পাণ্ডার একটি মামলা হয় সিউড়ির জজ কোর্টে। বিচারকের আদেশে একটি শোলেনামা সম্পাদিত হয়। তাতে বলা হয়েছে, তারাপীঠের সেবাইত এবং রানি ভবনী উভয়ের মায়ের সেবাইত। সেবাইতরা মায়ের পুজো করবেন এবং কাপড় বা স্বর্ণলঙ্কার যা কিছু ভক্তরা নিবেদন করবেন সেগুলি মায়ের সেবার জন্য ব্যবহার করতে পারবেন। বড় জিনিস যেমন সোনার মুকুট বা মালা যেগুলি ভক্তরা নিবেদন করেন সেগুলি মন্দির কমিটি ও পাণ্ডাদের সম্মতিক্রমে খুবই গোপনীয় জায়গা এবং লকারেও রাখা হয়। বিশেষ বিশেষ তিথিতে সেগুলি মাকে পরানো হয়। আজ সেই স্বর্ণলঙ্কারে সেজে উঠবেন দেবী তারা। মন্দির কমিটির সভাপতি তারাময় মুখোপাধ্যায় বলেন, সকালে স্নানের পর হবে মঙ্গলারতি ও পরে মাকে ভোগ নিবেদন করা হবে। এরপর নিশিরাতে দেবী তারাকে কালীরূপে পুজো করা হবে। স্বর্ণলঙ্কার ও ডাকের সাজে সাজানো হবে।