Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গোড়ায় গলদ

তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হাতে রইল পেনসিল।

গোড়ায় গলদ
  • ৫ জুলাই, ২০২৫ ১৪:০৭
Prefer us on Google

অভিষেকের মঞ্চেই বিপুল হাততালি কুড়িয়েছেন বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। আরএসএস-এর কথায় চলা ১৯৮০ সালে তৈরি বিজেপি যে একটি ‘সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল’—তা নিয়ে কোথাও কোনও বিরোধ নেই। বিজেপি ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ বানাতে চায়— এটা একরকম তাদের ঘোষিত কর্মসূচি। এই লক্ষ্যেই দুশো, পাঁচশো, আটশো বছরের পুরনো সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ধ্যানধারণাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। তাই সনাতনী হিন্দুধর্মের প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস বইয়ের পাঠ্যক্রম থেকে বাদ পড়ছে মুঘল আমলের দীর্ঘ অধ্যায়। আর অভিযোগ, হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে! এ দেশের বৈধ নাগরিক হলেও সংখ্যালঘু মুসলিমরা ‘অচ্ছুত’— এই ধারণা সুকৌশলে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে সমাজের বুকে। গোটা দেশে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ থেকে বিজেপির বড়, ছোট, মাঝারি নেতারা যখন চড়া সুরে এই হিন্দুত্বের প্রচারকেই ভোটে জেতার প্রধান অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, তখন অভিষেকের মঞ্চে শমীকের বক্তব্য খানিক কৌতূহল তৈরি করেছে সন্দেহ নেই। তিনি বলেছেন, বহুত্ববাদের কথা, নানা ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের কথা। ‘আমরা চাই, দুর্গাপুজোর বিসর্জনের মিছিল আর মহরমের মিছিল একই দিনে, একই সময়ে একই সঙ্গে হেঁটে যাক। কোনও সংঘর্ষ নেই, কোনও দাঙ্গা নেই’— বলেছেন শমীক। আরও বলেছেন, ‘আমরা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নই। মুসলিমদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ নয়।’ হাততালি কুড়ানো এই মঞ্চেই অবশ্য দলের লাইন মেনে ‘বঙ্গের হিন্দু এক হও’ স্লোগান শোনা গিয়েছে। ফলে এ কথা নিশ্চিন্তে বলা যায়, শমীকের বক্তব্য যদি ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে জেতার কৌশল হয়, তাহলে তা বড়ই দুর্বল ভাবনা। এতে বিজেপি সম্পর্কে সংখ্যালঘু হৃদয়ে বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ার আশা খুবই কম। ভাষণ দিয়ে দলের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভাজন-রাজনীতির চরিত্র বদলানো যায় কি? 

Advertisement

সভাপতি হয়ে নতুন কিছু করে দেখানোর স্বপ্ন দেখেন সকলেই। শমীকও এ রাজ্যে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার কথা শুনিয়েছেন। বলেছেন, ‘২০২৬-এর নির্বাচন, তৃণমূলের বিসর্জন’। ঝান্ডা ধরার জন্য দলমত নির্বিশেষে নতুনদের আহ্বানও জানিয়েছেন। কথায় আছে, মুখের কথায় কোনও ট্যাক্স (কর) দিতে হয় না। কিন্তু তা করে দেখানোর জন্য বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে এগতে হবে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভোটে জিততে গেলে সবচেয়ে জরুরি হল একটা ঐক্যবদ্ধ মজবুত সংগঠন। বঙ্গের বিজেপি তার জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রাথমিক পাঠটুকুও নেয়নি। এই মুহূর্তে রাজ্যের অর্ধেকের বেশি বুথে পদ্মফুলের ঝান্ডা ধরার লোক মেলা দুষ্কর। অথচ দলের রাজ্য দপ্তর থেকে মণ্ডল স্তর পর্যন্ত অন্তর্দ্বন্দ্ব, কোন্দল যে-কাউকে লজ্জায় ফেলে দিতে পারে। নানা নেতার নানা গ্রুপ! প্রায় প্রত্যেকে একে অপরকে পিছন থেকে যেন ছুরি মারতে তৎপর। নতুন রাজ্য সভাপতি হয়তো সেই অর্থে ব্যতিক্রমী। তাঁর নিজস্ব কোনও গ্রুপ নেই। দলীয় কোন্দল থেকে আপাতত দূরেই আছেন শমীক। কিন্তু বঙ্গ বিজেপির ডাকসাইটে নেতা তথা প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে দূরে সরিয়ে রেখে শুরুতেই বুঝিয়ে দিলেন, স্রোতের বিরুদ্ধে তিনি হাঁটতে অপারগ। তাঁকে চলতে হবে গোষ্ঠী নেতাদের অঙ্গুলিহেলনেই। বঙ্গ বিজেপি অতএব বিজেপিতেই থাকছে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের চিন্তাভাবনা আটকানো দূর অস্ত, নিজের দলকেই এক সুতোয় বাঁধতে শুরুতেই হোঁচট খেলেন নব্য সভাপতি। 
তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হাতে রইল পেনসিল। এ রাজ্যে বিজেপির গর্ব হল, ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে ১৮টি আসন দখল। তারপর থেকে সব ভোটে রক্তক্ষরণ হয়েই চলেছে। বালির বাঁধ দিয়ে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস আটকানো যায় না। এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ সংগঠন, লোকবলের অভাব আর মোটা দাগের ‘হিন্দু এক হও’ প্রচারে যে চিড়ে ভিজবে না, সেই বাস্তব সত্যটা নিশ্চয়ই আরএসএস-এর ঘরের ছেলে শমীক জানেন। সম্প্রতি কালীগঞ্জ বিধানসভা ভোটের উপ নির্বাচনের ফলাফলও দেখিয়ে দিয়েছে, হিন্দু ভোট মানেই বিজেপির নয়। পরের বছর বিধানসভা ভোটের আগে মোদি-শাহ ‘ডেইলি প্যাসেঞ্জারি’ শুরু করলেও রাধা নাচবে কি? আসলে মুখ বদলালেও জামাটা একই আছে যে। তাই ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে পাওয়া ৭৭টি আসন যদি ২০২৬-এ টপকাতে পারে বিজেপি, সেটাই হবে শমীকের ‘জয়’। তবে সে সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে কই! আর বঙ্গ বিজেপির এখন যা দশা তাতে সরকার বদলের দিবাস্বপ্ন কুলুঙ্গিতে তুলে রাখার মতো। তবু জয়ের সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে চান বঙ্গ বিজেপির নয়া স্থপতি। তাতে অন্তত শাসক তৃণমূলের ছুড়ে দেওয়া তাদের জন্য ৫০টি আসনের (বিজেপি পাবে কি না সন্দেহ) চ্যালেঞ্জের জবাব একটা দেওয়া হবে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ