সংবাদদাতা, কাঁথি: সরকারি উদ্যোগে বিপণনের অভাব সহ নানা সমস্যায় ভুগছে পটাশপুর-২ ব্লকের পঁচেট পঞ্চায়েতের কল্যাণপুর এলাকার প্রসিদ্ধ কাঁসা শিল্প। এলাকার একশোর বেশি পরিবার বংশানুক্রমিক শতাধিক বছরের পুরনো এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কাঁসার সামগ্রী তৈরি করেই তাঁদের রুটি-রুজির জোগাড় হয়। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ‘শাল’এর আগুনের আঁচের পাশে বসে তাঁরা পদ্ধতি মেনে একের পর এক কাঁসার সামগ্রী তৈরি করে চলেন। সমস্যাগুলি নিরসন করে শিল্পের মানোন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হোক-এটাই মূল দাবি কারিগর এবং এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের।
উল্লেখ্য, ৭ ভাগ তামা ও ২ ভাগ টিন এই অনুপাতে মিশিয়ে কাঁসার সামগ্রী তৈরি হয়। কাঁচামাল আসে কলকাতার বড়বাজার থেকে। তামা ও টিন মিশিয়ে কামারশালার আগুনে গলিয়ে একটি তাল বা মণ্ড তৈরি হয়। সেই মণ্ড থেকে রুটি তৈরিতে ব্যবহৃত বেলনের আকারে পাত তৈরি করা হয়। ওই পাতকে ফের গলিয়ে, পিটিয়ে তৈরি হয় নানা কাঁসার সামগ্রী। এখানে মূলত কাঁসার থালা-বাটি-গ্লাস, কাঁসর, ঘড়ি প্রভৃতি তৈরি হয়। কারিগরদের কাছ থেকে সামগ্রী কিনে পটাশপুর, এগরা, ভগবানপুর সহ বিভিন্ন এলাকার দোকানে বিক্রি করেন কিছু ব্যবসায়ী। উৎপাদিত পণ্য মেদিনীপুরের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও কলকাতা সহ রাজ্যের অন্যান্য জেলায় রপ্তানি করা হয়। যায় বিভিন্ন রাজ্যেও। এই শিল্পের মূল সমস্যা হল, কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক হয়রানি রয়েছে। নিয়মানুযায়ী তৈরি সামগ্রী নিয়ে মহাজনরা শিল্পী বা কারিগরদের কাঁচামাল দেন। কিন্তু এক্ষেত্রে মহাজনরা তাঁদের পাকা চালান দেন না। চালান দিতে গেলে জিএসটি বসবে। এতে কাঁচামালের ট্যাক্স বাড়বে, তৈরি সামগ্রীর দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে না। ফলে মহাজন ও কারিগর-দু’জনেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এদিকে কারিগররা যখন সেই কাঁচামাল নিয়ে আসেন, তখন রাস্তায় পুলিস তা চোরাই সামগ্রী বলে আটকায়। কারিগরদের হয়রানিতে পড়তে হয়। বর্তমানে জনপ্রতিনিধিদের তৎপরতায় সেই হয়রানি অনেকটা কমেছে। তাছাড়া মহাজনরা দাম ঠিক করে দেওয়ায় ছোট শিল্পীদের আশানুরূপ লাভ হয় না। তাই সরকারি উদ্যোগে বিপণন চান সকলেই।
বর্তমানে কাঁসার তৈরি সামগ্রীর চাহিদাও কমেছে। বাজারে স্টেনলেস স্টিলের তৈরি বাসনের রমরমা। আগেকার দিনে কন্যাপক্ষ বিয়ের সময় যৌতুক হিসাবে কাঁসার বাসন দিতেন। এখন এই ধরনের বাসনপত্র দেওয়ার চল কমেছে। শিল্পীরা বাড়িতে তো তৈরি করেনই, ২০২২সালে ‘কল্যাণপুর বেল অ্যান্ড ব্রাশ মেটাল ক্লাস্টার’ নামে কারখানাও গড়ে তুলেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ। সেখানে অনেকেই কাজ করেন। কাঁসা শিল্পের জন্য নতুন এবং উন্নত প্রযুক্তিযুক্ত পাত তৈরির মেসিন সম্প্রতি কারখানায় এসে গিয়েছে। এই পাত তৈরির জন্য শিল্পীদের তাল নিয়ে যেতে হতো বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়া কিংবা ঘাটালের খড়ারে। এতে সময় ও অর্থ খরচ হতো। স্থানীয় বাসিন্দা শিক্ষক অমলেন্দু মান্না, দেবাশিস রক্ষিত বলেন, নতুন পাত তৈরির মেসিন আসায় কারিগরদের সুবিধা হয়েছে। এখন কারখানায় কাঁসার পাশাপাশি পিতলেরও নানা সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। জেলা শিল্পদপ্তর উৎপাদিত সামগ্রী বিপণনের ব্যবস্থা করারও আশ্বাস দিয়েছে। কারিগররা আশার আলো দেখছেন। এই উদ্যোগের পিছনে এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক জ্যোতির্ময় করের বিশেষ অবদান রয়েছে। নানা সমস্যা থাকলেও পেটের তাগিদ আর ঐতিহ্যের টানে কাজ করে চলেন শিল্পীরা। শিল্পীদের স্বার্থে ‘কল্যাণপুর কাঁসা শিল্প উন্নয়ন সমিতি’ ও ‘কল্যাণপুর মা শীতলা কাঁসা ও পিতল উন্নয়ন সমিতি’ নামে দুটি সংগঠনও গড়ে উঠেছে। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি স্বপন মাইতি বলেন, কল্যাণপুরের কাঁসা শিল্প পটাশপুরের গর্ব। আগামীদিনে যে কোনও সমস্যায় পাশে থাকবে পঞ্চায়েত সমিতি। -নিজস্ব চিত্র