


প্রথম যখন রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছিলাম তখন তা সর্ব অর্থে বোঝা বা অনুধাবন করার ক্ষমতা আমার ছিল না। সেই সময় আমি নেহাতই অল্পবয়সি তরুণী। রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ে জ্ঞানও আমার সীমিত। ফলে তখন গান গাইতাম গাওয়ার আনন্দে। কী প্রেম, কোথায় তা প্রকৃতি বা পূজা পর্যায়ে গিয়ে মিশেছে এসব নিয়ে ভাবার বা বোঝার বয়স তখনও হয়নি।’ কথা হচ্ছিল বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সঙ্গে। রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষ্যে কবিগুরুর গানে প্রেম বিষয়ে তাঁর ভাবনা বিস্তারিতভাবে ব্যক্ত করলেন তিনি।
শান্তিনিকেতনের দিনগুলো
সংগীতভবনের কথা দিয়েই শুরু হল আলাপচারিতা। বন্যা বললেন, তাঁর স্কুলবেলায় শান্তিনিকেতনে পড়তে আসার বাসনা ছিল অলীক কল্পনার মতো। তখনও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। ফলে ভারতে আসা তাঁদের কাছে চিন্তারও অতীত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ যখন স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে স্বাধীনতা পেল এবং ভারত বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়াল তখনই প্রথম ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ও এক দেশ থেকে অন্যত্র যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে থাকে। এরপর থেকেই ভারত বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন স্কলারশিপ চালু করে। তেমনই একটি স্কলারশিপের জন্য আবেদন করে তা পেয়ে যান রেজওয়ানা, এবং সেই থেকেই তাঁর জীবন এক ভিন্ন মোড়ে ঘুরে যায়। শান্তিনিকেতনে এসে সংগীতভবনে গান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি।
রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হওয়ার বাসনা কি বরাবরের? প্রশ্ন শুনে একটু কৌতুকী সুরে বললেন, ‘না, না, অমন বাসনা কখনোই মনে লালন করিনি। এটাকে নিয়তি বলতে পারেন। সুপরিকল্পিত কোনো পথ চয়ন নয়। আসলে গান শেখার আনন্দেই আমি শান্তিনিকেতন এসেছিলাম। রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি অমোঘ টান ছিল আমার। সেই ভালোবাসার হাত ধরেই গান নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছা তৈরি হয়। পরবর্তীতে যে এই গানের মাধ্যমেই আমার জীবিকা তৈরি হবে বা আমি পরিচিত হয়ে উঠব সেই বিষয়ে সামান্য পরিকল্পনা বা ধারণাও আমার ছিল না।’
প্রথম যখন চার বছরের ডিগ্রি কোর্সে সংগীতভবনে রেজওয়ানা ভরতি হলেন তখন সেখানকার অধ্যক্ষা ছিলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘আমাদের সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস নিতেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাকি তিনদিন ক্লাস নিতেন নীলিমা সেন। সেই সময়ই তাঁদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তাঁদের গান শোনা ও রবীন্দ্রসংগীতকে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করতে মোহরদিই শিখিয়েছেন। আমি যে বাংলাদেশের মেয়ে, সেটাও আমাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠা বা নিবিড় হওয়ার পিছনে একটা বড়ো কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মোহরদির ছিল বাংলাদেশের প্রতি এক অমোঘ টান। সেই সূত্র ধরেই আমাদের সম্পর্ক জমে উঠেছে একাধিকবার। বাংলাদেশের প্রতি তাঁর দুর্বলতা বিষয়ে বহুবার বহু প্রসঙ্গে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। ওঁর সঙ্গে অনুষ্ঠানে আমাকে কলকাতায় নিয়ে যেতেন। তবে মোহরদির সঙ্গে আমার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছিল অনেক পরে। আমি যখন উচ্চশিক্ষার জন্য আবারও শন্তিনিকেতনে ফিরে যাই, সেই সময় ওঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিবিড় হয়ে ওঠে। উনি ছিলেন আমার গুরু, আমি শিষ্যা।’
রবীন্দ্রনাথের গানে প্রেম
রবীন্দ্রসংগীতে প্রেম আপনাকে কতটা মোহাবিষ্ট করে? একটু ভাবলেন বন্যা। তারপর বললেন, রবীন্দ্রসংগীতে ‘প্রেম’ বহু আঙ্গিকে বিভক্ত। যাকে বলা হয় ‘মাল্টিডাইমেনশনাল’। যেমন ‘যদি বারণ কর তবে গাহিব না’, গানটি সাধারণ প্রেম পর্যায়ের গান। যেখানে পুরুষ ও নারীর প্রেমের নানা আঙ্গিকের সহজ বর্ণনা করেছেন কবি। তাঁরা একে অপরের দিকে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছে, হঠাৎ দেখা হলে থমকে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভিন্ন কাজের ভান করে চলে যাচ্ছে। এখানে প্রেমের অভিব্যক্তির মধ্যে কোনো ব্যঞ্জনা নেই। একইভাবে ‘হৃদয়ের এ কূল, ও কূল, দু কূল ভেসে যায়...’ সরল প্রেমের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু কবির সব গানে প্রেম এমন সরলভাবে ধরা দেয়নি। কখনো প্রকৃতিকেই রবীন্দ্রনাথ প্রেমিকের রূপে বর্ণনা করেছেন। যেমন বর্ষার গান, ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে,’। এখানে বর্ষা যেন সযত্নে মনের কোণে লালিত এক প্রেমিক হয়ে ওঠে। কেয়া ফুল বর্ষা ঋতুর সাধারণ এক অনুষঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এমনই চিত্রায়ন যে আমরা প্রেমিকারূপে সেই কেয়া ফুলকে এই গানে পাই। বর্ষা সেখানে তার প্রেমিক, যাকে পাওয়ার জন্য কেয়া নিজেকে সাজিয়ে তুলছে। সে বর্ষার কাছে নিজেকে উৎসর্গ করতে চায়।
অথবা ‘ক্ষণিকের অতিথি’ হিসেবে যখন কবি শরৎকে বর্ণনা করছেন তাঁর ‘হে ক্ষণিকের অতিথি,’ গানে, তখন মনে হয় শরৎ যেন কোনো প্রেমিক যে অল্প সময়ের জন্য এসে প্রেমিকার মনে দোলা দিয়ে যায়। রবীন্দ্রসংগীতে প্রেম ও প্রকৃতি মিলেমিশে গিয়েছে বিভিন্নভাবে। কখনো তা প্রেক্ষাপটের কাজ করেছে। কখনো মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। উদাহারণ হিসেবে রেজওয়ানা বললেন, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়,’ গানটিতে বর্ষা প্রেমের প্রেক্ষাপট।
আবার কখনো পূজা পর্যায়ের গানের মধ্যেও আমরা প্রেমের ছন্দ খুঁজে পাই। কিছু ক্ষেত্রে কবি রাধা-কৃষ্ণর প্রেম প্রতীক হিসেবে রেখেছেন। কৃষ্ণের জন্য অপেক্ষমান শ্রীরাধিকা, বা কৃষ্ণের উপর অভিমান করছেন শ্রীরাধা অথবা শ্রীকৃষ্ণের প্রেমে ব্যাকুল হয়ে উঠছে রাধার মন। এগুলো সবই কিন্তু নর-নারীর প্রেমগাথায় রূপকের কাজ করে। মানুষের মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা না বলা বাণীর ঘন যামিনীর মধ্যেই প্রেমের উৎস সন্ধান লুকিয়ে রেখেছেন কবি।
আবার ‘ধরণীর গগনের মিলনের ছন্দে’ গানটির বর্ণনা করতে গিয়ে বন্যা বললেন, এখানে ধরণীর সঙ্গে গগনের প্রেম। এই দুই ক্ষেত্রর মাঝে বিস্তর ফারাক, যোজন যোজন দূরত্ব। যে দূরত্ব মুছে যায় যখন গগন থেকে বৃষ্টির জল এসে ধরণীতে মেশে। ধরণী স্নাত হয় সেই জলে। সেই মিলনের ছন্দে পৃথিবীতে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। শ্যামল মাটির পরশে প্রকৃতির প্রাণে ভালোবাসার শিহরন জাগে। এই গান ছন্দে বাঁধা প্রেমের কথা বলে। প্রেমের উচ্ছল রূপ-তরঙ্গে ভেসে যাওয়ার মর্ম খুঁজে পাওয়া যায় কিছু পঙ্ক্তির মাধ্যমে। যেমন, ‘উৎসবসভা-মাঝে শ্রাবণের বীণা বাজে,/শিহরে শ্যামল মাটি প্রাণের আনন্দে॥’। এখানে চঞ্চল প্রেমের যে তারুণ্যে ভরা পদচারণা তা-ই প্রতি ছত্রে ধরা রয়েছে। শ্রাবণের ধারা যেন সুরের হিল্লোল তোলে পৃথিবীর বুকে।
প্রেমের গানে নাটকীয় রূপ
‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ গানটির কথাই ধরা যাক, বললেন রেজওয়ানা। এখানে প্রেম অতি নাটকীয়। গল্পের ছলে প্রেমের প্রেক্ষাপটের নিদারুণ বর্ণনা দিচ্ছেন কবি। গানের প্রতি পর্যায়ে প্রেমিকের চোখে প্রেমিকার রূপ বর্ণনার মাধ্যমেই তাঁর আকুতি, ভালোলাগা ফুটে উঠছে। কখনো সে কৃষ্ণকলির কালো হরিণ চোখের মায়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছে, কখনো বা তার মুক্তবেণির দোলায় প্রেমিকের মন চঞ্চল হয়ে উঠছে। কবি যতই পরিণত বয়স্ক হয়েছেন ততই তাঁর প্রেমের বর্ণনায় কখনো নাটকীয় রূপ ফুটে উঠেছে, কখনো বা তা ভরে গিয়েছে সহজ সারল্যে। পরিণত বয়সের প্রেমের গানের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের ছবি আঁকতে চেয়েছেন কবি। পটভূমি, অনুভূতি ও আবেগ দিয়ে তিনি প্রেমের মালা গেঁথেছেন ভারী যত্ন সহকারে। ‘তুমি কোন্ ভাঙনের পথে এলে সুপ্তরাতে’, ‘আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলায়...’ ইত্যাদি সেই আবেগ বা অনুভূতিরই নানা রূপ। এই সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করতে না পারলে রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান গাওয়া যায় না। গায়কির সঙ্গে ভাবনার মিলন না ঘটলে সঠিক অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। আর সেই অনুভূতি ফুটিয়ে তোলাই রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার যথার্থ উপায়।
কণিকা ও সুচিত্রা
এই দুই দিকপাল রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীকে নিয়ে আলোচনা শুরু হলে রেজওয়ানা বলেন, ‘দু’জনেই রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হিসেবে শ্রেষ্ঠ। এই দু’জনের মধ্যে কিন্তু কোনো তুলনা চলে না। তাঁরা নিজগুণে রবীন্দ্রনাথের গানে সর্বোচ্চ আসনে রয়েছেন। অথচ তাঁদের গায়কির অসম্ভব অমিল। একজনের কণ্ঠ মধুর, কোমল। অন্যজনের ভঙ্গি দৃপ্ত, জোরালো। নিজস্ব স্টাইলের মধ্যেই তাঁদের সুরের বৈশিষ্ট্য অন্তর্নিহিত। কণিকার গলায় যেমন মীড়ের কাজ (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে গড়িয়ে যাওয়া) এক ভিন্ন মাত্রা পায়, সুচিত্রায় গলায় আবার নাটকীয় রস পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁদের গায়কির মধ্যেও কিন্তু পারস্পরিক যে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা তাঁরা লালন করেছেন তার প্রতিফল দেখতে পাই। এই দুই গায়িকা একে অপরের গায়কি সম্পর্কে সচেতন থেকেছেন বরাবর। কখনোই অন্যজনকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি।’
রবীন্দ্রসংগীত ও অন্যান্য গান
‘আমার গুরু, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলতেন, গানকে কখনো মিশিয়ে ফেলো না। যে কোনো একরকমের গানেই নিজের পরিচিতি তৈরি করো। আমি সেকথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার চেষ্টা করি’, বললেন রেজওয়ানা। রবীন্দ্রনাথের গানে বাণীর গভীরতা সুরের মাধুর্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। আর সেই কারণেই এই গানের যথার্থ মর্ম অনুভব করতে না পারলে তা কখনোই সঠিকভাবে গাওয়া যায় না। একই গানের মধ্যে যে বহুমুখিতা লুকিয়ে রয়েছে সেই ভাব ফুলের পাপড়ির মতো পরতে পরতে প্রস্ফুটিত হলে তবেই সুরমাধুরী সৃষ্টি হয়। রেজওয়ানা বললেন, ‘আমার ক্ষেত্রে বয়স ও মানসিক পরিণতির সঙ্গেই রবীন্দ্রসংগীতের ব্যঞ্জনা সুস্পষ্ট হয়েছে।’ যতদিন গাইছেন, যত ধরনের গান গাইছেন, ততই গানের মর্ম নব নব রূপে তাঁর জীবনে ধরা দিচ্ছে। প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথকেও যেন নতুন করে বুঝতে শিখছেন প্রতিনিয়ত। এই গানের মাধ্যমেই রেজওয়ানা শিল্পী হিসেবে একটু একটু করে আরও পরিণত হয়ে উঠছেন।
কমলিনী চক্রবর্তী