সংবাদদাতা, কাটোয়া: লকডাউনে হারিয়েছিল ঘর৷ ভবঘুরে হয়ে এসেছিলেন বছর চব্বিশের মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবক৷ নিজের ঠিকানা বলতে পারতেন না। কোন রাজ্য থেকে এসেছিল, তাও তিনি বলতে পারতেন না৷ শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকতেন৷ সেই ভবঘুরে এখন আউশগ্রামের প্রতাপপুর গ্রামের বাসিন্দাদের হয়ে উঠেছেন আদরের ‘রোহিত’। গ্রামে জুটেছে তাঁর মাথার ছাদ৷ বাসিন্দারা পালা করে তাঁকে দু’বেলা খাওয়ান৷ সব হারিয়ে এখন বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন ‘রোহিত’।
'রোহিত' নামে কোনও জাত-ধর্ম নেই। কোনও পদবি নেই৷ নামটির আষ্টেপৃষ্টে শুধু মানবতা। তাই হয়তো হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই ভবঘুরে রোহিত এখন নিজের ছেলে৷ প্রত্যেকেই পালা করে তাঁকে দু' বেলা খাওয়ান৷ গ্রামে কেউ অনুষ্ঠান করলে নিমন্ত্রিতদের তালিকায় বাদ যান না রোহিত৷ তাঁকে নিয়ে এসে নতুন জামা পরিয়ে অনুষ্ঠান বাড়িতে নিয়ে আসা হয়৷ দুই সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানেই তাঁর নেমন্তন্ন। তাঁর এখন একটাই পরিচয় তিনি একজন মানুষ।
সালটা ২০২০। দেশজুড়ে করোনার চোখরাঙানি। অদৃশ্য ভাইরাসের সঙ্গে যুঝতে ‘মেঘনাদ’ হওয়ার দাওয়াই দেয় সরকার। শুরু হয় লকডাউন। পথে বেরিয়ে পথ-ভোলা হয়ে যান ‘রোহিত’। একদিন আচমকা আউশগ্রাম-২ ব্লকের ভাল্কি পঞ্চায়েতের প্রতাপপুর গ্রামে চলে আসেন। মাথায় বড় বড় চুল৷ পরনে মলিন পোশাক৷ ভাল্কির উপপ্রধান শেখ সাদেরুল ও গ্রামের বাসিন্দা মিলে ওই যুবককে তৃণমূল পার্টি অফিসের একটি ঘরে ঠাঁই দেন৷ তাঁর চুল কেটে, নতুন জামা কাপড় কিনে দেওয়া হয়৷ বাসিন্দারা সেখানে স্বযত্নে আপন করে নাম রাখেন ‘রোহিত’। পার্টি অফিসে রোহিতের জন্য আসে বিছানা সহ অন্যান্য আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র৷ গ্রামবাসীর কাছে তিনি বড় আদরের হয়ে ওঠে কয়েক বছরেই। সারাদিন ‘রোহিত’ সকাল থেকে অফিসেই থাকেন৷ তবে মাঝেমধ্যে বেরিয়ে পড়েন গ্রাম ঘুরতে।
শেখ সাদেরুলের কথায়, ‘রোহিত পাঁচ বছর আগে লকডাউনের সময় ভবঘুরের মত আমাদের গ্রামে আসেন৷ গ্রামের হাটতলার কাছেই তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন। সে সময় ওঁর মাথায় ছিল বড় বড় চুল। পরনে অপরিষ্কার পোশাক। আমরা তাঁকে গ্রামের একজন বলে কাছে টেনে নিই। এখানে কোনও জাতিধর্ম নেই৷ যাঁরা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেন, তাঁদের উদ্দ্যেশ্যে একটাই বলব, ‘বাংলায় সকল ধর্মের বসবাস৷ বাঙালিদের কাছে মানবতা সবকিছুর আগে। পুলিসকেও জানিয়েছি। যদি রহিতের ঠিকানা খুঁজে তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যায়।
রোহিত এখন পার্টি অফিসে একাই থাকেন৷ তিনি পাগল নন৷ তাঁর আগের স্মৃতি মনে না থাকলেও এখন মোটামুটি স্বাভাবিক। গ্রামের কাউকে বিরক্ত করেন না। গ্রামের বাসিন্দা শেখ বকুল বলেন, ‘রোহিত আমাদের গ্রামেরই ছেলে। আমরাও ওকে খুব ভালবাসি। আমরা গ্রামবাসীরা ওর জন্য যতটা করা সম্ভব, ততটাই করি। ওঁর প্রতি সকলের একটা মায়া জন্মেছে। তবে আশা করব, রোহিত একদিন যেন পরিবারকে খুঁজে পান।’অতঃপর, জাত-ধর্মহীন রোহিত এক যুবকের নাম। নিজস্ব চিত্র