সংবাদদাতা, কাঁথি: মধ্যপ্রদেশের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী ইন্দর সিং পারমার ভারতের নবজাগরণের অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায়কে ‘ব্রিটিশদের এজেন্ট’ বলায় গোটা দেশ তোলপাড়। এই আবহে খেজুরির প্রাচীন বন্দরের ধ্বংসাবশেষ সংলগ্ন এলকায় স্থাপিত রামমোহন ও দ্বারকানাথ ঠাকুরের পূর্ণবয়ব মূর্তি দু’টির রক্ষণাবেক্ষণ ও সৌন্দর্যায়নের দাবি তুলল খেজুরি হেরিটেজ সুরক্ষা সমিতি। একইসঙ্গে সমিতির তরফে মধ্যপ্রদেশের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।
খেজুরির প্রাচীন বন্দর এলাকায় রামমোহন এবং প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের শুভাগমনের স্মৃতিতে তাঁদের পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আলোর ব্যবস্থা নেই। সৌন্দর্যায়নের দাবি থাকলেও পূরণ হয়নি। ফাঁকা জায়গায় দু’টি মূর্তি থাকায় দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে অভাব রয়ে গিয়েছে। প্রতিদিনই খেজুরিতে আসেন বহু ইতিহাসপ্রেমী মানুষ ও পর্যটক। তাঁরা খেজুরিতে দেশের প্রথম ডাকঘর, ইউরোপিয়ান গ্রেভ ইয়ার্ড, সেচ বাংলো সহ অন্যান্য নিদর্শন ঘুরে দেখার পাশাপাশি দুই মণীষীর মূর্তিও দর্শন করে যান। তাই মূর্তি দু’টি রক্ষণাবেক্ষণের দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী থেকে শুরু করে ইতিহাসপ্রেমী মানুষজন।
উল্লেখ্য, প্রাচীন খেজুরি বন্দর থেকেই ১৮৩০ সালের ২০ নভেম্বর বিলেত যাত্রা করেছিলেন রামমোহন। আগের দিন ১৯ নভেম্বর কলকাতা বন্দর থেকে ‘ফোবর্স’ নামক দ্রুতগামী স্টিমারে যাত্রা শুরু করে ওইদিন সন্ধ্যায় তিনি খেজুরিতে পৌঁছন। খেজুরি পোস্ট অফিসের যাত্রীনিবাসে একরাত কাটিয়ে পরদিন ২০ তারিখ সকালে ‘আলবিয়ন’ নামক পালতোলা জাহাজে হুগলি নদী হয়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন রামমোহন। জাহাজে ওঠার আগে খেজুরি বন্দরের কর্মচারীরা তাঁকে সংবর্ধনা জানান। রামমোহন সঙ্গীদের নিয়ে বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে ইংল্যান্ডের লিভারপুল বন্দরে পৌঁছন ১৮৩১ সালের ৮ এপ্রিল। খেজুরিতে প্রথম ভারতীয় আধুনিক মানুষ রাজা রামমোহনের পদার্পণ ও তাঁর ঐতিহাসিক বিলেত যাত্রাকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৮৭ বছর পরে খেজুরি হেরিটেজ সুরক্ষা সমিতি এগিয়ে আসে। খেজুরিতে প্রাচীন বন্দরের ধ্বংসাবশেষ সংলগ্ন এলাকায় তাঁর একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৭ সালে ১৯ নভেম্বর পূর্ণাবয়ব মূর্তির আবরণ উন্মোচন করা হয়। রামমোহনের সঙ্গে দ্বারকানাথ ঠাকুরেরও পূর্ণাবয়ব মূর্তি বসে এবং ওইদিনই আবরণ উন্মোচন করা হয়। এই বন্দর থেকেই ১৮৪২ সালের ৯ জানুয়ারি এবং ১৮৪৫ সালের ৮ মার্চ বিলেত যাত্রা করেছিলেন দ্বারকানাথ। যদিও খেজুরি থেকে দু’জনে বিলেতযাত্রা করলেও কেউ আর ফেরেননি। সেখানেই তাঁরা দেহত্যাগ করেন। এদিকে দুই মনীষীর মূর্তি দীর্ঘদিন ছাউনি বিহীন অবস্থায় পড়েছিল এবং রোদ-বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ২০২২ সালে দু’টি মূর্তির উপর ছাউনির ব্যবস্থা করে খেজুরি হেরিটেজ সুরক্ষা সমিতি। স্থানীয় পঞ্চায়েত চারদিকে রেলিং করে দেয়। মূর্তিগুলির সামনে ইতিপূর্বে বাতিস্তম্ভের ব্যবস্থা করা হলেও তা রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, চারদিকে একটি বাঁশের বেড়া এবং বাগান তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বেড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাগানও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এলাকায় একটি শৌচালয় না থাকায় পর্যটকরা খুবই সমস্যায় পড়েন। হেরিটেজ সুরক্ষা সমিতির যুগ্ম সহ-সম্পাদক সুমননারায়ণ বাকরা ও সুদর্শন সেন বলেন, প্রশাসন এগিয়ে এলে বাতিস্তম্ভ স্থাপন থেকে শুরু করে সৌন্দর্যায়ন, সবই সম্ভব। এই উদ্যোগ নিলে দুই প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে বলে আমরা মনে করছি। আমরা এ বিষয়ে আগেই প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। বিডিও অনির্বাণ সাহা বলেন, আমি নতুন এসেছি। সবকিছু ঘুরে দেখব। প্রয়োজনে হেরিটেজ সুরক্ষা সমিতির সঙ্গে এনিয়ে আলোচনা করব। প্রশাসনের তরফে যতটুকু করার, নিশ্চয়ই করব। নিজস্ব চিত্র