Bartaman Logo
১২ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ছোট রবির বন্ধুরা

ছোট বন্ধুরা, আজ তোমাদের শোনাব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধুদের গল্প। যখন তিনি তোমাদের বয়সি, সেই সময়কার বন্ধুদের কথা। রবি ঠাকুর একসময় গেয়েছিলেন,‘বন্ধু, রহো রহো সাথে’।

ছোট রবির বন্ধুরা
  • ৪ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন্তন মজুমদার: ছোট বন্ধুরা, আজ তোমাদের শোনাব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধুদের গল্প। যখন তিনি তোমাদের বয়সি, সেই সময়কার বন্ধুদের কথা। রবি ঠাকুর একসময় গেয়েছিলেন,‘বন্ধু, রহো রহো সাথে’।

Advertisement

আমরা বন্ধু বলতে প্রধানত সহপাঠীদের বুঝি। ছোট্ট রবি সহপাঠীরূপে পেয়েছিলেন ঠাকুরবাড়িরই ছেলেদের। ‘জীবনস্মৃতি’ বই কিংবা জীবনের প্রায় প্রথম ছবিতে আমরা তিনজনকে দেখতে পাই। কবি যাঁদের সম্পর্কে বলেছিলেন ‘আমরা তিনটি বালক’। সেই অন্য দু’জন হলেন তাঁর অন্যতম দাদা সোমেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তাঁর বড়দিদির ছেলে অর্থাৎ ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়। উভয়েই ছিলেন কবির থেকে বছর দুয়েকের বড়। রবি-সোম-সত্যকে আমরা একসঙ্গে দেখতে পাই ‘কঙ্কাল’ গল্পের প্রথমেই।
সোমেন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে বিশ্বখ্যাত ভাইটির প্রথম কাব্য ‘কবিকাহিনী’,‘বনফুল’ প্রকাশের সহায়ক হয়েছিলেন। ছেলেবেলায় স্কুল যাওয়া, কুস্তি লড়াই, বড়দের পোশাক পরা, পৈতে গ্রহণ দুই ভাইয়ের একই সময়ে হয়েছিল।
ভাগ্নে সতীন বা সত্যপ্রসাদ সহপাঠী থেকে আমসত্ত্ব চুরির কাজে রবির সহযোগীও হতেন। জীবনের নানা সময়-অসময়ে, বইপ্রকাশ হতে  শান্তিনিকেতনের কাজে রবীন্দ্রনাথ পাশে পেয়েছিলেন তাঁকে। আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে কবির মনে পড়ে গিয়েছিল এক মেঘলা দিনে সত্যের পুলিসের নামে চিৎকার করে ভয় দেখানো, পড়ার ঘরে তিনজনের গাছঘেরা নকল পাহাড় বানানো এবং গুরুজনদের কোপে তার অদৃশ্য হওয়ার কথা। বাবার সঙ্গে বোলপুর যাওয়ার আগে সত্য আরও একবার ট্রেন সম্পর্কে নানা কথা বলে ছোটমামাকে ভয় দেখিয়েছিলেন।
শুধুমাত্র সত্যপ্রসাদ নন, তাঁর বোন ইরাবতী দেবীও ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বাল্যসখী। ইনি ছিলেন সেই সময়ে তাঁর একমাত্র সমবয়সি বন্ধু। ঠাকুরবাড়িতে রাজবাড়ি থাকার বানানো গল্পের জন্যই তিনি রবির ‘গল্পসল্প’ বইতে অমর হয়ে রয়েছেন। ছুটির দিনে দুপুরবেলায় মামা-ভাগ্নী আমতলায় গিয়ে আম পেড়েছেন। আম খাওয়ার জন্য মামার ঝিনুকটি পেয়েও কিন্তু রাজবাড়ি দর্শনের মন্ত্রটা ইরাবতী রবিমামাকে বলেননি। তাই নিজের বাড়ির মধ্যে থাকা সেই ‘রাজার বাড়ি’ আর দেখাই হয়নি ছোটকর্তা রবীন্দ্রনাথের।
বেঙ্গল অ্যাকাডেমি স্কুলের ম্যাজিক জানা একজন বন্ধুর কথা বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথ স্বজীবনীতে লিখেছিলেন, যাঁর নাম দিয়েছিলেন হ.চ.হ. অর্থাৎ হরিশ্চন্দ্র হালদার। ঠাকুরবাড়িতে তিনি আসতেন এবং রবিদের সঙ্গেই গাড়িতে স্কুলে যেতেন। নিজেকে ম্যাজিকের বই লিখিয়ে, প্রফেসর বলে জাহির করে বেড়াতেন। একবার ঠাকুরবাড়ির কুস্তির আখড়ায় বাখারি ও কাগজ দিয়ে নাট্যমঞ্চ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু গুরুজনবাক্যে তাতে আর অভিনয় করা সম্ভব হয়নি। ‘মুক্তকুন্তলা’ গল্প থেকে অবশ্য জানা যায় যে, সেই নাটকে শাড়ি, সিঁদুর পরা রানির ভূমিকায় অভিনয়ের কথা ছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের।
এই হরিশ্চন্দ্রের কথা মেনে চলে রবীন্দ্রনাথ কী বিপদে পড়েছিলেন সে কথা বলি। বাগানের মালির কাছ থেকে যথেষ্ট মনসা সিজের আঠা নিয়ে, একুশবার আমের আঁটিতে তা  লাগিয়ে, শুকিয়ে নেওয়ার পরেও গাছ বেরয়নি। সেই জন্য জাদুকর হরিশ্চন্দ্র লজ্জায় কিছু দিন স্কুলগাড়িতে রবির পাশে বসতে পারতেন না। এরপর অন্য এক দিন হরিশ্চন্দ্রের কথামতো রবীন্দ্রনাথ বেঞ্চের উপর থেকে লাফও দিয়েছিলেন। এইসব ভেবেই হয়তো ‘দর্পহরণ’গল্পের নায়কের নাম তাঁর নামে রেখেছিলেন গল্পগুচ্ছকার।
অবশেষে ওই  বয়সে সব থেকে বড় বন্ধুরূপে রবীন্দ্রনাথ যাঁকে পেয়েছিলেন সেই দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলি। আজ থেকে একশো বছর আগে প্রতিবেশী রাজ্যের রাঁচিতে তিনি প্রয়াত হন। তাঁর জন্যই কবি অবসাদগ্রস্ত হতে পারেননি। যখন স্কুলের তথাকথিত পড়াশোনায় ‘ব্যর্থ’ কবিকে নিয়ে সকলে বিব্রত, তখন সেই জ্যোতিদাদাই তাঁকে পিয়ানো বাজিয়ে শুনিয়েছেন, ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন, কবিতার খাতা ভরিয়ে দিতে উৎসাহ দিয়েছেন, ফুলের রস চিপে কালি তৈরির অনর্থক আনন্দকাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথকে ‘বড়রকমের স্বাধীনতা’ জ্যোতিদাদাই দিয়েছিলেন। আবার জ্যোতিদাদার বন্ধু, রবির থেকে এগারো বছরের বড়, আইনজ্ঞ অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরীকে কবি ‘একজন অনুকূল সুহৃদ’ আখ্যা দিয়েছেন। গভীর রাতে পড়ার টেবিলে রবির সঙ্গে সভা জমাতে দেখা যেত তাঁকে। বিদেশের কলেজে পড়ার সময় ক্লাসে রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন দেশে ফিরে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়া লোকেন্দ্রনাথ পালিতকে। বয়সে ছোট হয়েও বন্ধুভাবে রবির সঙ্গে লাইব্রেরিতে বসে তাঁর হাসাহাসি ও গপ্পো চলত। সমকালে তিনি পেয়েছিলেন ‘উৎসাহী বন্ধু’ প্রবোধচন্দ্র ঘোষকে। যিনি ‘কবিকাহিনী’ ছাপিয়ে কবিকে পাঠাতে ভোলেননি।
বিশেষ ফুল গোলাপের মতো বিশেষ মানুষ এই বন্ধুদের সম্পর্কে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সেই কথাটিই যেন বার বার সত্যি হয়ে যায়—‘দুঃখের বরষায়  চক্ষের জল যেই  নামল/বক্ষের দরজায় বন্ধুর রথ সেই  থামল।।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ