শ্রীকান্ত পড়্যা, সোয়াদিঘি (শহিদ মাতঙ্গিনী): অস্মিকাকে মনে পড়ে? রানাঘাটের সেই ছোট্ট অস্মিকা। জন্ম থেকেই বিরল জেনেটিক রোগে ভুগছিল সে। তার জীবন বাঁচাতে তোলপাড় হয় গোটা নেট ভুবন। চলো বাঁচাই অস্মিকাকে...সহ একাধিক শিরোনামে শুরু হয় ক্রাউড ফান্ডিং। এগিয়ে আসেন বহু সেলিব্রিটিও। অবশেষে, বিদেশ থেকে ১৬ কোটির ইঞ্জেকশন এনে শুরু হয় চিকিৎসা। অস্মিকা এখন অনেকটাই ভালো বলে খবর। অস্মিকার মতোই ওই বিরল জেনেটিক রোগ ‘স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোপি, টাইপ-২’তে আক্রান্ত পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুকের আদিত্য প্রধান। বয়স মাত্র দু’ বছর ন’মাস। অসহায় বাবা-মায়ের আর্তি—‘অস্মিকার মতো আমার ছেলের জীবন বাঁচাতে নেটিজেনরা একটু সাড়া দিক। এগিয়ে আসুন সকলেই।’
আদিত্যকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পারে একমাত্র ওই ইঞ্জেকশনই। যার দাম এখন ৯ কোটি টাকা। অস্মিকার পর কেন্দ্রীয় সরকার ইঞ্জেকশনটির উপর আমদানি কর প্রত্যাহার করে। সেই কারণে দামও কমে গিয়েছে অর্ধেকেরও কম। কিন্তু আদিত্যর বাবা বাপনকুমার প্রধান সামান্য হোটেল কর্মী। একমাত্র ছেলের চিকিৎসায় কলকাতা, দিল্লি, বেঙ্গালুরু দৌড়ঝাঁপ করতে গিয়ে কাজটি হারিয়েছেন। এখন সম্পূর্ণ বেকার। মা অর্চনা প্রধান গৃহবধূ। কেন্দ্রের সাহায্য চেয়ে বাপন-অর্চনা ইতিমধ্যেই তমলুকের সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন। সন্তানের জীবন ভিক্ষা চাইছেন নানাজনের কাছে। কিন্তু এত পরিমাণ টাকা ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ ছাড়া সংগ্রহ করা একপ্রকার সম্ভব নয় বলে মত অনেকেরই।
আদিত্যর বাড়ি তমলুক থানার শহিদ মাতঙ্গিনীর বল্লুক-২ পঞ্চায়েতের উত্তর ওষুধপুর গ্রামে। অসুস্থ হওয়ার পর সে থাকে সোয়াদিঘি গ্রামে মামার বাড়িতে। তার দু’ পায়ে কোনও শক্তি নেই। দাঁড়াতে পারে না। পায়ের পাতা সোজা হয়ে ঝুলে থাকে। বয়সের তুলনায় হাতেও বল কম। দেড় বছর বয়সেও আদিত্য হাঁটাচলা করতে না পারায় সন্দেহ হয় বাড়ির লোকের। শুরু হয় ডাক্তার দেখানো। ছেলেকে প্রথমে ভুবনেশ্বর এইমসে নিয়ে যান বাপন-অর্চনা। সেখানে রোগটি ধরা পড়েনি। তারপর বেঙ্গালুরুর হাসপাতালে। শেষে দিল্লির এইমসের চিকিৎসকরা জানান, শিশুর শরীরে বাঁসা বেঁধেছে বিরল জেনেটিক রোগ। অস্মিকাও যে রোগে আক্রান্ত।
রোগের একমাত্র চিকিৎসা বিদেশের ওই মহার্ঘ্য ইঞ্জেকশন। বিকল্প পথ একটাই—প্রতি মাসে ৬ লক্ষ ২০ হাজার টাকার ওষুধ। আদিত্যর ওজন ২০ কেজির বেশি হয়ে গেলে তখন মাসে দু’টি ডোজ খাওয়াতে হবে। অর্থাৎ, ওষুধের ডাবল দাম। শুধু তাই নয়, সারাজীবন ওষুধ খাইয়ে যেতে হবে। সেটা ধনকুবের কোনও পরিবারের পক্ষেও অসম্ভব! আকাশ ভেঙে পড়ে বাপন-অর্চনার মাথায়। ছেলেকে বাঁচাতে তাঁদের কাছে এখন একমাত্র ভরসা ওই ইঞ্জেকশন। এবং যত দ্রুত সম্ভব সেটা দিতে হবে আদিত্যকে। কেননা, রোগটি ক্রমেই শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে।
গত ২৩ অক্টোবর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় আদিত্য। নিয়ে যাওয়া হয় তমলুক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। চিকিৎসকরা কোনও ঝুঁকি নেননি। পাঠিয়ে দেন কলকাতার এসএসকেএমে। সেখানে আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে আদিত্য। কাঁদতে কাঁদতে মা অর্চনা এদিন বলছিলেন, ‘আদিত্য আমাদের একমাত্র সন্তান। হাঁটা চলার বয়সে ও স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারছিল না। চিকিৎসা করাই। তখনই জানতে পারি, ছেলে বিরল জেনেটিক রোগে আক্রান্ত। দিল্লি এইমসের চিকিৎসক টিম চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছে। খরচের হিসেবও দিয়েছে। প্রয়োজন ৯ কোটি টাকা মূল্যের ওই ইঞ্জেকশন! এত টাকা কোথায় পাব? দয়াকরে করে সবাই এগিয়ে আসুন। আমার ছেলেকে বাঁচান।’ আঁচলে মুখ ঢাকলেন অর্চনা। মায়ের কোলে ছোট্ট আদিত্য। ছবি: চন্দ্রভানু বিজলি