Bartaman Logo
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ঢাকের তালে জীবন দোলে

হিমের পরশ হাওয়ায় লেগেছে কি না এখনও টের পাওয়া যাচ্ছে না। আমলকী বনের বুক কাঁপার খবরও এসে পৌঁছায়নি নাগরিক কোলাহলে।

ঢাকের তালে জীবন দোলে
  • ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমের পরশ হাওয়ায় লেগেছে কি না এখনও টের পাওয়া যাচ্ছে না। আমলকী বনের বুক কাঁপার খবরও এসে পৌঁছায়নি নাগরিক কোলাহলে। নিম্নচাপের আকাশে মাঝেমধ্যে উঁকি মারছে পেঁজা তুলোর মেঘ। শুধু কাশফুল আর মন বলছে শরৎ এসেছে। এমনই এক শরৎ সন্ধেয়, সূর্য যখন সবে পাটে নেমেছে, বেজে উঠল সজল নন্দীর ফোন। এমনিতে সারাদিনই তাঁর ব্যস্ততা থাকে। শরৎ এলে সেই ব্যস্ততার সুতোয় লাগে বাড়তি টান। কিন্তু এই ফোন যে বড়ো অসময়ের। এমন এক জায়গায় আছেন, যেখানে প্রভূত বাজনার আওয়াজ। একটু দূরে সরে এলেন কথা বলবেন বলে। ফোনের ওপাশে তখন বেজে চলেছে ঢাকের বোল, দ্রিমি দ্রিমি তালে। শুনলে প্রাণ জুড়ায়। এ যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসা শরতের আবহসংগীত। এই সজল নন্দী কে? 
অশোকনগর ও তার সংলগ্ন অঞ্চলের মেয়েরা তাঁকে চেনেন ‘ঢাকি গুরু’ হিসেবে। সজলের রক্তে বাজনা। পড়াশোনাও করেছেন বাজনা নিয়ে। ২০১৭ সালে ঠিক করেন, স্থানীয় মেয়েদের নিয়ে একটি মহিলা ঢাকির দল গড়বেন। সঙ্গে পেলেন বোন অঞ্জনা নন্দী সহ আরও ৪-৫ জনকে। শুরু হল ‘অমূল্য চন্দ্র নন্দী রিদম মিউজিক কলেজ’-এর পথ চলা। বিনামূল্যেই মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্ষমতায়নের পথে এগিয়ে দিচ্ছেন তিনি ও তাঁর বোন অঞ্জনা নন্দী।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম থেকেই অঞ্জনা নন্দী বেশ অনেকটা এগিয়ে। বাড়ির সকলেই গানবাজনায় যুক্ত হওয়ায় ছোটো থেকেই বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাঁর আলাদা বোঝাপড়া রয়েছে। এই রাজ্যের তিনি একমাত্র মহিলা সানাইবাদক। বাকিদের কেউ বিড়ি বাঁধেন, কেউ মাঠে কাজ করেন, কেউ আবার অন্যের বাড়ি রান্নার কাজ করেন। নুন আনতে পান্তা ফুরায় পরিবারে। ঢাকের তাল শিখলে যদি কিছু অন্ন সংস্থানে সুরাহা হয়! দাদার সঙ্গে মিলে অঞ্জনাও শেখাতে লাগলেন নানা ঢাকের বোল। কলাবউ স্নান, ষষ্ঠীর বোধন, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীর আলাদা আলাদা বাজনা, বরণ ও আরতির সুর সবই নিখুঁত দক্ষতায় বাজাতে পারেন অঞ্জনা। মাত্র পাঁচ জন নিয়ে শুরু হলেও এখন এই দলে সদস্য প্রায় ১৫০ জন। বিভিন্ন জায়গায় খুঁটি পুজোর ডাক পাচ্ছেন ঢাক বাজানোর জন্য। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঢাক ও তাঁদের দল নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন। নিজের ঢাকি হওয়ার পুরো কৃতিত্ব তিনি দেন দাদা সজলকে। দাদার ফোনেই জানালেন, ‘এই পেশায় ভালোবেসে এসেছি। আমাদের বংশপরম্পরায় বাজনা রয়েছে। তাই পরিবারের অন্য সদস্যদেরও গানবাজনায় দেখতে চাই। জানেন, আমার সেজদার নাতিকেও খুব ছোটো থেকেই প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছি আমরা। তবে সমস্যাও আছে বটে...!’ গলার উষ্ণতা যেন ম্রিয়মাণ হল খানিক। চোরা দীর্ঘশ্বাসও শোনা গেল কি?  
কী সমস্যা? প্রশ্ন প্রায় লুফে নিলেন অঞ্জনা। গলাটা অনেকখানি খাদে এবার। ‘জানেন, আগের সরকারের আমলে আমরা অনেক অনুষ্ঠানে ডাক পেতাম। এখন আর অত অনুষ্ঠানও হচ্ছে না, রোজগারও কমেছে। আমাদের রাজ্যের অনেক মেয়েই কিন্তু শুধু ঢাক বাজিয়ে সংসার চালান। তাঁরাও আর আস্থা রাখতে পারছেন না এই পেশায়। একটা শিল্পী কার্ডও হয়েছিল...। শিল্পীদের ভাতাও পেয়েছিলাম মাস চারেক। তারপর তো ভোট চলে এল...। একটু দেখুন না যদি কার্ডটা আমরা হাতে পাই, আর এই সরকার যদি ঢাকিদের কথা ভাবেন, অনেকগুলো সংসার বেঁচে যায় জানেন...!’
অঞ্জনার গলায় তখন হেমন্তের বিষাদ লেগে আছে।
অঞ্জনার মতোই আর এক ঢাকি গীতা গোলদার। হাবড়ার কুমড়োকাশিপুরের গেরস্থ বাড়ির বউ। নিশ্চিত পেশা বলতে ছিল বিড়ি বাঁধা আর মাঠে কাজ। কিন্তু অসুস্থ স্বামী, সন্তানদের পড়াশোনা, বেঁচে থাকার খুঁটিনাটি সামলাতে গিয়ে কুল পাচ্ছিলেন না। তখন পরিচিত এক দাদা সন্ধান দিলেন ‘অমূল্য চন্দ্র নন্দী রিদম মিউজিক কলেজ’-এর। ভরতি হলেন সেখানে। ঢাকের বোলেও সৃজনশীলতা মিশিয়ে দিয়েছে এই সংস্থা। সজলের প্রশিক্ষণে তাঁরা শুধু কাঁধে ঢাক নিয়েই বাজান না, একই সঙ্গে মাথায় চলে ব্যালেন্সের খেলা। বিড়ের উপর কুলো, তার উপর পাত্র রেখে প্রদীপ জ্বালিয়ে ব্যালেন্স করে ঢাক বাজাতেও তাঁরা সিদ্ধহস্ত। বাড়ি থেকে বাধা আসেনি? গীতা বললেন, ‘স্বামী মারা যান ২০২২-এর আগেই। দুই ছেলেকে নিয়ে খালিপেটে বেঁচে থাকা খুব কঠিন। বিড়ি বেঁধে এদিক ওদিক জোগাড়ের কাজ করে সবটা চলছিল না। তাই ঢাককেই বেছে নিই। সমাজ কী ভাববে, কে কী বলল, এসব ভাবার মতো মানসিক অবস্থাই ছিল না!’
এবছরও নিউ টাউন সর্বজনীন দুর্গোৎসবে ঢাক বাজানোর বায়না পেয়েছেন গীতারা। চলছে তারই প্রস্তুতি। শেষ মুহূর্তের রিহার্সাল চলছে জমিয়ে। সে কথা বলতে বলতেই নিজের ছেলেদের কথায় ফিরে গেলেন গীতা। বড়ো ছেলে একটা পাশ দিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছে সংসার টানতে। উচ্চ মাধ্যমিকে ভরতি করেছে ভাইকে। মায়ের ঢাক বাজিয়ে সংসার চালানো তাদের গর্বিত করে। 
মায়ের হাতে ঢাক, কাঁধে সংসারের দায়— এই ছবি আজ আর অচেনা নয় অঞ্জনা, গীতা কিংবা তাঁদের সঙ্গীদের সন্তানদের কাছে। পুজোর মরশুমে যখন শহর-শহরতলির মণ্ডপে ঢাকের বোল উঠবে, তখন সেই তালে মিশে থাকবে তাঁদের ঘাম, অভ্যাস আর বেঁচে থাকার লড়াই। সজল নন্দী অবশ্য মনে করেন, এই মেয়েদের শুধু ঢাকি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁরা শিল্পী। সুযোগ পেলে আরও অনেক দূর যেতে পারবেন। প্রয়োজন শুধু নিয়মিত কাজ, সম্মান এবং প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার মতো একটা ভরসার জায়গা। সরকারি উদ্যোগের দিকেই তাকিয়ে তাঁরা। 
যে হাত সারাদিন ব্যস্ত থাকত বিড়ির পাতা, খেতের কাস্তে কিংবা রান্নার হাতায়, সেই হাতই পুজোর ক’টা দিনে হয়ে ওঠে তাল-লয়ের আধার। 
শরৎ এলে তাই তাঁদের অপেক্ষাও আলাদা। ঢাকের ডাক শুধু রোজগার নয়, শিল্পীসত্তার কাছে ফিরে যাওয়ারও অমোঘ হাতছানি। যার বোলে দুগ্গা আসে, দুগ্গা ভাসে। 
               

Advertisement

মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ