Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পিক্সেলের খাঁচায় বন্দি জীবন

কলকাতার দমবন্ধকর জীবনে এক চিলতে খোলা হাওয়ার খোঁজ চাইলে ভরসা সেই ময়দান। এক ছুটির বিকালে ল্যাদের মেজাজে ধুলোমাখা শুকনো ঘাসে পা ছড়িয়ে বসে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখছিলাম।

পিক্সেলের খাঁচায় বন্দি জীবন
  • ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: কলকাতার দমবন্ধকর জীবনে এক চিলতে খোলা হাওয়ার খোঁজ চাইলে ভরসা সেই ময়দান। এক ছুটির বিকালে ল্যাদের মেজাজে ধুলোমাখা শুকনো ঘাসে পা ছড়িয়ে বসে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখছিলাম। পড়ন্ত রোদে ফুটবল নিয়ে চার-পাঁচটা ছেলে মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিছুটা দূরে স্তূপীকৃত কিটব্যাগগুলির পাশে বসে দশ-বারো বছরের আরও জনাপাঁচেক কিশোর। তাদের শরীর মাঠে থাকলেও চোখজোড়া আটকে হাতের ওই পাঁচ ইঞ্চির স্ক্রিনে। কেউ মগ্ন কোনো অনলাইন গেমে, কেউ বা হয়তো রিলসের অন্তহীন সাগরে ডুব দিয়েছে। মাঠের ধুলোবালি বা বন্ধুদের চিৎকার তাদের স্পর্শ করছে না। এই ধরনের দৃশ্যগুলি আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের ড্রয়িংরুম থেকে খেলার মাঠ—সর্বত্র এ এক ভয়ংকর বাস্তব। আমরা যখন এসআইআর বা ভূ-রাজনীতি নিয়ে তর্কে মেতে, তখন আমাদের অজান্তেই একটা গোটা প্রজন্মের শৈশব চুরি হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র পিক্সেলের রঙিন মরীচিকায়।

Advertisement

পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আমরা বিলক্ষণ জানি সেকথা। কিন্তু কতটা? তার একটা ঝলক মিলতে পারে সম্প্রতি গাজিয়াবাদের ‘ভারত সিটি’ আবাসনে, তিন নাবালিকা বোনের আত্মহত্যার ঘটনায়। অনলাইন গেম আর মোবাইল ব্যবহারে বাধা দিয়েছিলেন বাবা-মা। তার পরেই দশতলা থেকে ঝাঁপ দেয় তিন বোন। তদন্তে যা উঠে এসেছে, তা যে কোনো অভিভাবকের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। জানা যাচ্ছে, কিশোরী তিন বোন কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিল না। বরং গাজিয়াবাদের ফ্ল্যাটে দিন-রাত কাটলেও অবচেতনে তারা বাস করত এক মায়া-জগতে। এক প্যারালাল ইউনিভার্সে। কোরিয়ান সিনেমা, গান ও বিভিন্ন ধরনের গেম দিয়ে তৈরি সেই মায়া-জগৎ। আর এই দুনিয়ার দুর্নিবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘টাস্ক বেসড’ গেম—‘কোরিয়ান লাভ’। গাজিয়াবাদের এই ঘটনায় ফিরে এসেছে কয়েক বছর আগের কুখ্যাত সেই ‘ব্লু হোয়েল’ চ্যালেঞ্জের স্মৃতি।
গত বেশ কিছু বছর ধরেই কোরিয়ান সংস্কৃতি নিয়ে একটা আলাদা লেভেলের উন্মাদনা দেখা দিয়েছে ভারতীয় ‘জেন জি’দের মধ্যে। কে-পপ বা কে-ড্রামায় ডুবে থাকা এই প্রজন্মের দেওয়ালে বলিউডি নায়ক-নায়িকা বা স্পোর্টস স্টারদের ঠাঁই হয় না। শোওয়ার ঘরের দেওয়ালজুড়ে থাকে বিটিএস-এর ভি (কিম তাই হুয়াং), জিয়ন জুং-কুক বা জিমিনের পোস্টার। বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনায় সারাক্ষণ ঘুরেফিরে আসে ‘ক্র্যাশ ল্যান্ডিং অন ইউ’-এর ক্যাপ্টেন রি বা ‘গবলিন’-এর নায়ক কিম শিনের নাম। বাস্তব জীবনের রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে এই চরিত্রগুলোই হয়ে উঠেছে তাদের ধ্যান-জ্ঞান। খালি চোখে মনে হতে পারে, এটুকু না হয় ঠিক আছে। ভক্তদের পাগলামি কবেই বা নিয়ম মেনেছে! কিন্তু এই নেশার আড়ালেই জন্ম নিচ্ছে বড়োসড়ো এক সমস্যা। প্যারালাল এই ইউনিভার্সের বিনোদনের সুরেলা পথ মিশে যাচ্ছে ‘টাস্ক বেসড’ গেমের চোরাবালিতে। ঠিক যেমন ‘কোরিয়ান লাভ’ নামে একটি অনলাইন ‘টাস্ক বেসড’ গেমের ফাঁদে পড়েছিল গাজিয়াবাদের তিন বোন। এই গেমের বিশেষত্ব—এটা কোনো সাধারণ ভিডিয়ো গেম নয়। এখানে গেমের ভিতরে অনেক সময় এমন সব ভার্চুয়াল চরিত্র বা ‘মাস্টার’ তৈরি করা হয়, যারা নিজেদের পরিচয় দেয় জনপ্রিয় সব কোরিয়ান আইডলদের নামে। স্টেপ বাই স্টেপ সাজানো এই গেমের টাস্কগুলির সঙ্গে থাকে পুরস্কারের প্রলোভন। বলা হয়— ‘এই ধাপগুলি শেষ করলে তুমি তোমার প্রিয় ক্যারেক্টার হিউন বিন বা লি মিন-হো’র মতো একজনের দেখা পাবে।’ এই ভার্চুয়াল জগতের চালিকাশক্তি থাকে ‘অদৃশ্য’ অ্যাডমিনদের হাতে। তারা গেমারদের বিভিন্ন কাজ (টাস্ক) দেয়। প্রথমদিকে সেগুলি খুব সহজ মনে হলেও, ধীরে ধীরে তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। একটা সময়ে এই গেমগুলি কিশোর মনকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেই সেই ‘প্যারালাল ইউনিভার্স’-এ পৌঁছানো যাবে। ‘সফট রোম্যান্টিসিজম’-এর নেশায় ডুবে যেতে যেতে তারা বুঝতেও পারে না, এই প্রিয় নামগুলির আড়ালে আসলে কলকাঠি নাড়ছে কোনো সাইবার অপরাধী বা কোনো বিপজ্জনক অ্যালগরিদম।
নিউরোলজিস্টরা এই গোটা বিষয়টিকে ‘ডিজিটাল হিপনোসিস’ হিসাবে ব্যাখ্যা করছেন। তাঁদের মতে, কিশোর মস্তিষ্কে যুক্তি ও আবেগের ভারসাম্য তৈরির জায়গাটি পুরোপুরি বিকশিত হয় না। এই সুযোগটাই নেয় এই ধরনের গেমগুলো। প্রতিটি টাস্ক শেষ করার পর মস্তিষ্কে যে ডোফামিন হরমোন ক্ষরিত হয়, তা এক ধরনের সাময়িক তৃপ্তি দেয়। আর যখনই কাউকে এই খেলায় বাধা দেওয়া হয়, তখনই শুরু হয় প্রবল ‘উইথড্রল সিম্পটম’। মাদকের নেশা কাটানোর সময় শরীর ও মন যেভাবে বিদ্রোহ করে, মোবাইলের নেশা কাটানোর সময়েও তেমনটা ঘটে। মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হলে তাদের কাছে এই পৃথিবীটা অর্থহীন বলে মনে হতে শুরু করে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে, এ থেকে মুক্তি পেতে হলে আত্মহত্যাই একমাত্র রাস্তা। কারণ আত্মহত্যা আসলে কোনো মৃত্যু নয়। এক ধরনের ‘টেলিপোর্টেশন’। সেই অলৌকিক পথ ধরে পৌঁছানো যাবে সিওলের কোনো সাজানো ক্যাফেতে, যেখানে অপেক্ষা করে রয়েছেন কে-ড্রামা বা কে-পপের সেই প্রিয় মুখগুলি।
আমাদের ঘরে ঘরে এখন ঢুকে পড়েছে এই ‘ডিজিটাল ড্রাগ’। আমরা হয়তো ভাবছি, সন্তান পড়ার ঘরে বসে মোবাইলে-ট্যাবে অনলাইন কোচিংয়ের ভিডিয়ো দেখছে। কিন্তু সে হয়তো ততক্ষণে তলিয়ে যাচ্ছে এক অতল গহ্বরে। সেখানে কয়েক হাত দূরে থাকা বাবা-মায়ের থেকে ফোনের স্ক্রিনের ওপারের এক অচেনা গেমারকে অনেক বেশি আপন মনে হয়। তার কথাই হয়ে ওঠে বেদবাক্য। আর সেই কারণেই বারবার সন্তানদের আচরণের উপর নজর রাখতে বলছেন নিউরোলজিস্টরা। সতর্ক করে জানাচ্ছেন, সন্তানদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখলে তা কোনোমতে এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ, ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখা, খাদ্যাভ্যাস বদলে যাওয়া বা পরিবারের প্রতি উদাসীনতা—এগুলি সবই ডিজিটাল ড্রাগে আক্রান্ত হওয়ার আগাম সংকেত।
প্রশ্ন জাগতে পারে, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কেন এত সহজে এই মরণফাঁদে পা দিচ্ছে? তার উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের বদলে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থায়। আগে আমরা একাকিত্ব দূর করতে মাঠে যেতাম, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম। আজকের শহুরে ফ্ল্যাটকেন্দ্রিক জীবনে শিশুরা প্রায় সবাই আসলে ভীষণ একা। সঙ্গে রয়েছে পড়াশোনার চাপ, প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড় আর বাবা-মা’র ব্যস্ততা। তাই এই প্রজন্ম একাকিত্ব দূর করতে হাতে স্মার্টফোন নেয়। তারা এমন একটা ভার্চুয়াল আশ্রয়ের খোঁজ করতে থাকে, যেখানে কেউ তাদের বিচার করবে না। কোরিয়ান ড্রামাগুলিতে দেখানো অতিরঞ্জিত প্রেম বা ফ্যান্টাসি তাদের বাস্তব জীবনের শূন্যতা পূরণ করতে সাহায্য করে। এই একাকিত্বের সুযোগ নিয়েই ‘ব্লু হোয়েল’ বা ‘কোরিয়ান লাভ’-এর মতো গেমগুলি তাদের মনে বাসা বাধে। সঙ্গে একটা ধারণা গেঁথে দেয় যে, এই বাস্তব জগতটা আসলে তাদের জন্য নয়। আর একবার নেশা ধরে গেলে ধীরে ধীরে এই গেমগুলি কিশোরদের ‘সেলফ হার্ম’-এর দিকে ঠেলে দেয়। যে পথ শেষ হয় আত্মহত্যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই বিপদ নিয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মস্তিষ্কের যে অংশ আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, অতিমাত্রায় মোবাইল ব্যবহারের ফলে সেই অংশগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে ধৈর্য কমছে, বাড়ছে হঠকারিতা। ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকিয়াট্রির সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্টের গোলকধাঁধায় আটকে পড়ে কিশোররা সোশ্যাল অ্যাংজাইটির শিকার হচ্ছে।
কয়েক বছর আগে অনলাইন গেমিংয়ের বাড়বাড়ন্ত সম্পর্কে চীনের সরকার একটি শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিল—‘ইলেকট্রনিক ড্রাগ’। তারা বুঝতে পেরেছিল, অনলাইন গেমিং শুধু সময় নষ্ট নয়, তা কিশোর মস্তিষ্কের গড়নও বদলে দিচ্ছে। তার পরেই চীনে শিশুদের গেমিংয়ের সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। আসন্ন বিপদ আঁচ করে ১৬ বছরের নীচে শিশুদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে অস্ট্রেলিয়া। ফ্রান্সের অনেক স্কুলে মোবাইল ফোন পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ব্রিটেনও সেই একই পথে হাঁটছে। কিন্তু ভারতে আমরা এখনও ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র রঙিন মোড়কে এই আসক্তিকে ঢেকে রাখছি।  যা অত্যন্ত আশঙ্কার।
সম্প্রতি সংসদে পেশ করা ২০২৫-২৬ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, মোবাইল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি মনসংযোগ কাড়ছে। পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে না। তা মনের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। পড়ুয়ারা মনোনিবেশ করতে পারছে না। কেন্দ্রের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরণ জানিয়েছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক ব্যবস্থার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। বিশেষজ্ঞদের একাংশ একধাপ এগিয়ে কিশোর মহলে জনপ্রিয় অ্যাপগুলি ব্যান করে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন। কিন্তু শুধু অ্যাপ নিষিদ্ধ করলেই বিরাট লাভ হবে না। কারণ যারা এই গেম খেলবে বলে মনস্থির করে, তাদের কাছে কোনো না কোনোভাবে ওয়েবসাইটের লিংক বা গেমের এপিকে ভার্সন চলেই আসে। ব্যান হওয়া অ্যাপে ব্যবহারের জন্য আছে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন)। এখন তো ফ্রি ভিপিএনের রমরমা। ‘নিষিদ্ধ’ গেমের খোঁজে ডার্ক ওয়েবেও ঢুঁ মারতে পারে অনেকে। সেক্ষেত্রে বিপদ কমার বদলে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সমস্যায় রাশ টানতে হলে আমাদের ডিজিটাল সংস্কৃতিকে আমূল বদলাতে হবে। শিশুদের ‘ডিজিটাল লিটারেসি’র পাঠ দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, ‘প্যারালাল ইউনিভার্স’ বলে কিছু নেই। স্ক্রিনের ওপারের রঙিন পৃথিবীটা আসলে একটা মরীচিকা। আর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে স্ক্রিন টাইম কমাতে হবে অভিভাবকদেরও। মা-বাবা নিজেরা যদি ডাইনিং টেবিলে বসে সোশ্যাল মিডিয়া ফিড স্ক্রল করতে করতে ছেলেমেয়েকে মোবাইল ব্যবহারের জন্য বকাঝকা করেন, তাহলে পরিস্থিতি বদলাবে না। 
প্রযুক্তির এই খাঁচা থেকে কিশোর প্রজন্মকে বের করে এনে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’-এর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে অভিভাবকদেরই। ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের পুরানো অভ্যাস। ছেলেমেয়েদের বোঝাতে হবে, মাঠে গিয়ে খেলা, গল্পের বই পড়া বা মানুষের সঙ্গে সরাসরি আড্ডা—এসবের কোনো বিকল্প নেই। হতে পারে না।

সম্পর্কিত সংবাদ