দুর্গাপুজো মিটলেই ফের ভোটের দামামা পশ্চিমবঙ্গে। ভোট নেওয়া হবে কলকাতা, হাওড়া, বালি, হলদিয়া, ধূপগুড়ি, কালিম্পং ও কার্শিয়াং পুরসভায়। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এই সাত জায়গায় ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। ভোটযন্ত্র (ইভিএম) সরানোর প্রস্তুতি চলছে। ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে কলকাতা পুরভোটের প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু প্রসঙ্গ শুধু আসন্ন ভোটের নির্ঘণ্টের মধ্যে নিহিত নয়, আসল প্রশ্ন—এই ভোট আগেই, যথাসময়ে নেওয়া হল না কেন? মানুষের সঙ্গে বঞ্চনার পিছনে কার, কোন স্বার্থ কাজ করেছিল? হাওড়ায় শেষবার পুরভোট হয় ২০১৩ সালে। আর লাগোয়া বালিতে তার দুবছর বাদে। অর্থাৎ টানা প্রায় একদশক পুরপ্রতিনিধি নেই। সাংবিধানিক অধিকার ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ নাগরিককে। প্রশাসক বসিয়ে পুরসভা চালানো গণতন্ত্রের কাজ নয়। কোনো ভয়ানক সংকটজনক পরিস্থিতিতে প্রশাসক বসানোর আইনি সংস্থান থাকলেও তা নিতান্তই সাময়িক ব্যবস্থা। অথচ সেই ‘জরুরি’ ব্যবস্থাই বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্তের রূপ নিয়েছে। নির্বাচিত কাউন্সিলার এবং পুরবোর্ড নেই, অথচ নাগরিকের কাছ থেকে পুরকর নেওয়া হচ্ছে! কিন্তু পুর পরিষেবার যে বেহাল দশা চলছে তা নিয়ে দ্বিমত সম্ভবত কারও নেই। হায় রে স্থানীয় স্বশাসন!
এই প্রসঙ্গেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের তিক্ত কিছু অভিজ্ঞতা। ভোটাধিকার কোনো কাগুজে বিষয় নয়, তার সার্থকতা বাস্তবে প্রয়োগে। ছাব্বিশের এসআইআর-এ বাংলার ২৭ লক্ষাধিক নরনারীর নাম বাদ পড়েছিল বলে শীর্ষ আদালতে জানিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। যাঁরা দুর্ভোগের শিকার তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষাধিক মানুষ ভোটার তালিকায় ফের নাম তোলার জন্য আবেদন করেছেন। একইসঙ্গে কমিশন জানিয়েছে, ভোটের আগে নাম ফের নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১,৬০৭ জনের। ফলে আসন্ন পুরভোটের আগে সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত, পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত একটি ভোটার তালিকা তৈরি করা। কোনো যোগ্য ব্যক্তি যেন আর বঞ্চনার শিকার না হন, তা সবরকমে নিশ্চিত করতে হবে। অনাবশ্যক প্রশাসনিক জটিলতা রুখতেই হবে। একইভাবে নিশ্চিত করতে হবে যে, ভোটার লিস্টে একজনও বিদেশি বা অন্যভাবে অযোগ্য ব্যক্তির নাম শোভা পাবে না। মৃতদের মধ্যে কেউ কেউ যেন হঠাৎ জেগে না ওঠে ভোট দেওয়ার আনন্দে! এবংবিধ শর্তাদি পূরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের ওয়েবসাইটে এসাইআর-এর ফাইনাল লিস্ট, সংযোজন-বিয়োজনের তালিকা এবং আপিল-সংক্রান্ত তথ্যাদি প্রকাশিত রয়েছে। অতএব পুরভোটের ক্ষেত্রেও অস্বচ্ছতার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। বিধানসভা ভোটের ক্ষত শুকোনোর আগেই—পুরভোটের ময়দানে একই সংশয়, একই অভিযোগ, একই প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা ফিরে এলে আস্থা হারাবে আমাদের বহু কষ্টার্জিত গণতন্ত্র। ভোট করানোই যথেষ্ট নয়, প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোট প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত করাটাই অগ্নিপরীক্ষা।
তাই দেখা জরুরি, সাত পুরসভার ভোট যেন কোনোভাবেই কেবল দলীয় শক্তিপ্রদর্শনের মহড়া হয়ে উঠতে না-পারে। অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক পুরসভার ভোট ‘ডিউ’ রয়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই কয়েকটি। আগামী মার্চ-এপ্রিলে আরও ১১৭টিতে। অর্থাৎ সরকারের সামনে সুযোগও যেমন, দায়ও বিরাট। প্রশাসকের খপ্পরে আর কোনো পুরসভা রাখা রাখা চলবে না। সবগুলিতেই নির্বাচিত বোর্ড ফিরিয়ে দিতে হবে দ্রুত। নির্বাচনের নির্ঘণ্ট নিয়ে টালবাহানা বন্ধ করতে হবে এখনই। ভোটার তালিকা সংক্রান্ত যাবতীয় ধ্যাষ্টামির অবসান হোক এইবেলা। পর্যাপ্ত ইভিএমের জোগান নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনকে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না-হয়, ধুলোয় লুণ্ঠিত না-হয় তার সাংবিধানিক মান-মর্যাদা। ইভিএম-সংকট নিয়েও কমিশনের উদ্বেগ প্রকাশ্যে এসেছে, যদিও ২১,১৮৪টি ব্যালট ইউনিট এবং ১৯,৫৬৪টি কন্ট্রোল ইউনিট ইসিআই দিয়েছে। এই ভোটগ্রহণে খরচ ধরা হয়েছে ৩৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু গণতন্ত্রের দাম অর্থাঙ্কে মাপা সম্ভব নয়। নাগরিকের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়াটাই চূড়ান্ত দায়িত্ব, কর্তব্য ও লক্ষ্য। বেনজির বিতর্ক সঙ্গী করে রাজ্যে সরকার বদলেছে পাঁচমাস আগে। এবার স্থানীয় গণতন্ত্রের চরিত্রটা বদলাবে কি না, সেটাই মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন। পুরসভা বা পুরবোর্ড কোনো শাসক দলের দয়ার দান নয়, নাগরিকের নিজের প্রতিষ্ঠান। তাই নির্বাচন নিছক ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ না-হয়ে—স্বচ্ছ, অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন সূচিত করুক।