বাড়ির সামনে সিসি ক্যামেরা বসাতে চাইছেন? কোন কোন আইন জানতে হবে? জানালেন বিশিষ্ট সাইবার আইনজীবী রাজর্ষি রায়চৌধুরী।
বাড়ির সামনে সিসি ক্যামেরা বসাতে চাইছেন? কোন কোন আইন জানতে হবে? জানালেন বিশিষ্ট সাইবার আইনজীবী রাজর্ষি রায়চৌধুরী।
নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা লাগিয়েও শান্তি নেই! প্রতিবেশীর অভিযোগের জেরে আদালতে হয়রানির মুখে পড়তে হল মধ্য কলকাতার প্রৌঢ়কে। কেন? আসলে, বাড়িতে একাধিক মূল্যবান জিনিস থাকায় সিসি ক্যামেরা বসাতে বাধ্য হয়েছিলেন অনিমেষবাবু (নাম পরিবর্তিত)। কিন্তু সেই ক্যামেরা কেবল তাঁর বাড়ির পরিসরেই আটকে ছিল না। তা রেকর্ড করত প্রতিবেশী মনোতোষবাবুর বাড়ির দরজার চিত্রও। একদিন সেটাই জেনে ফেলেন মনোতোষবাবু। অনিমেষবাবুর বাড়িতে গিয়ে সেটা জানাতে তিনিও বেঁকে বসলেন। জানালেন, ওই অ্যাঙ্গলেই লাগাতে হবে সিসি ক্যামেরা। নইলে আর লাভ কী! শুরু হল নিত্য অশান্তি। আদালতে মামলা ঠুকলেন মনোতোষ। অভিযোগ, অনিমেষবাবুর সিসি ক্যামেরার জন্য তাঁর গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে। নিরাপত্তা ও বাড়িতে মূল্যবান জিনিস থাকার কথা বলে আদালতে সওয়াল করলেন অনিমেষবাবুর আইনজীবীও। তবে বিচারপতি রায় দিলেন মনোতোষবাবুর পক্ষেই। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির পর্যবেক্ষণ ছিল, নিরাপত্তার খাতিরে বসানো সিসি ক্যামেরা কোনোভাবেই যেন কারও গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দেশজুড়ে এমনই নানা উদাহরণ রয়েছে। সেখানে সিসি ক্যামেরা বসানোর জন্য হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। কেবল নির্দিষ্ট কিছু আইন ও নিয়ম না জানার জন্য। কী সেই আইন ও নিয়ম?
ভারতে সিসি ক্যামেরা ইনস্টল করার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই। তবে অন্য কয়েকটি আইনকে মাথায় রেখে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়। মূলত দু’ভাবে সিসি ক্যামেরা ইনস্টলেশন হতে পারে।
সরকারিভাবে।
ব্যক্তিগতভাবে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রেই কয়েকটি নিয়ম মাথায় রাখার প্রয়োজন।
সরকারিভাবে সিসি ক্যামেরা বসানো হয় পাবলিক প্লেসের নিরাপত্তার খাতিরে। রাস্তাঘাটে সর্বক্ষণের নজরদারি, রাতের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন সহ নানা কারণে সিসি ক্যামেরা বসায় প্রশাসন। হাসপাতাল, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, থানা চত্বর সহ আরও নানা জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো হয়।
ব্যক্তিগতভাবে সিসি ক্যামেরা বসানোকে দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়— ক) আবাসিক এলাকা (যেমন বাড়ি, ফ্ল্যাট), খ) বাণিজ্যিক এলাকা (যেমন অফিস, শপিং মল)।
আবাসিক এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসানোর জন্য পুলিশি অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তবে কয়েকটি নিয়ম মাথায় রাখতে হয়। নইলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এমনভাবে সিসি ক্যামেরা বসানো যাবে না, যাতে প্রতিবেশীর এলাকার ভিডিয়ো রেকর্ড হয়। এতে প্রতিবেশী ভবিষ্যতে গোপনীয়তা লঙ্ঘন হওয়ার অভিযোগ করতে পারেন। ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি বাড়ির বাইরে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছেন। এবার সেই ক্যামেরা প্রতিবেশীর বাড়ির জানলা, বাথরুমের ছবিও তুলছে। সেটা কিন্তু বেনিয়ম। একে ভোয়ারিজম (গোপনীয়তা লঙ্ঘন) বলা হয়। বিএনএস-এর ৭৭ নম্বর ধারায় এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই আইন বলছে, কোনো ব্যক্তির (বিশেষত নারীর) ব্যক্তিগত মুহূর্ত দেখা, রেকর্ড করা ও তা ছড়িয়ে দেওয়া অপরাধ। সে কারণে সিসি ক্যামেরা বসানোর সময় কোনোভাবেই যেন তা অন্যের পরিসর রেকর্ড করতে না পারে, তা খেয়াল রাখতে হবে। যদি গোপনীয়তা লঙ্ঘন হয়, তাহলে ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারেন প্রতিবেশী। আবাসনে ফ্ল্যাটের বাইরে সিসি ক্যামেরা লাগানো হলে তো এই বিষয়টি আরও ভালোভাবে মাথায় রাখতে হবে। কারণ ফ্ল্যাটগুলি একদম পাশাপাশি থাকে। সেক্ষেত্রে প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে নেওয়াই শ্রেয়। তিনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে ভবিষ্যতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অনেক আবাসনের প্রবেশদ্বার ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো হয়। এক্ষেত্রেও আবাসিকদের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।
আবাসিক হোক বা বাণিজ্যিক এলাকা, যেখানে সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে, সেখানে একটি নোটিস লাগানো বাধ্যতামূলক। নোটিসে লিখতে হয়, আপনি সিসি ক্যামেরার অধীনে রয়েছেন। আপনার ক্যামেরা যদি কণ্ঠস্বর রেকর্ড করার ক্ষমতা রাখে, সেক্ষেত্রে সেটিও নোটিসে লিখতে হবে। এমন জায়গায় এই নোটিসটি লাগাতে হবে, যাতে সকলের নজরে পড়ে।
বাথরুম, ড্রেসিং রুমে সিসি ক্যামেরা লাগানো যায় না। কেবল শপিং মল, অফিসেই নয়, বাড়ির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য।
সিসি ক্যামেরা ইনস্টল করার সময় সেই মডেলটি যেন ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস মেনে তৈরি হয় তা খেয়াল রাখতে হয়। সমস্ত অ্যানালগ ক্যামেরা, আইপি ক্যামেরা, ডিভিআর এবং এনভিআর-এর ক্ষেত্রে এই স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
সিসি ক্যামেরা থেকে যে ফুটেজটি পেলেন সেটি সংরক্ষণ করার দায়িত্বও আপনার। বর্তমানে অনেক সময় সাইবার প্রতারকরা সিসি ক্যামেরা হ্যাক করতে পারে। ফলে সহজেই তাদের কাছে পৌঁছে যায় আপনার ব্যক্তিগত পরিসরের নানা ফুটেজ। ফলে সিসি ক্যামেরা লাগালে, সেটি রক্ষণাবেক্ষণ এবং ফুটেজের খেয়াল রাখা প্রয়োজনীয়। তবে একটা বিষয় মনে রাখবেন, রেকর্ড কতদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখবেন, এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই। এটি সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। ভারতে ডেটা গোপনীয়তা ও সুরক্ষার জন্য ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ২০২৩ (বা সংক্ষেপে ডিপিডিপি অ্যাক্ট) রয়েছে। এটি ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে। তবে সিসি ক্যামেরার ক্ষেত্রে এখনও কোনো নির্দেশিকা নেই।
পুলিশ চাইলে কি আপনি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দিতে বাধ্য?
বাধ্যবাধকতার বিষয় নেই। তবে পুলিশ বা প্রশাসন চাইলে দেওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। যদি কোনো ব্যক্তি ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ উল্লেখ করে না দিতে চান, তাহলে পুলিশ হয়তো প্রাথমিকভাবে জোর করবে না। আদালত যদি মনে করে, সমন জারি করে ফুটেজ চাইতে পারে। আর যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাস্থলে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংরক্ষণ না হয়, সেক্ষেত্রে মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম নেই। তবে ফুটেজ নষ্ট করলে শাস্তি হতে পারে। কারণ সিসি ক্যামেরা ফুটেজ অপরাধের প্রধান ডিজিটাল প্রমাণ হিসাবে গণ্য হয়।
শান্তনু দত্ত