শব্দজব্দের আইনকানুন
  • ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভ্রুউউউউউউউউ.....! বাড়ির সামনে দিয়ে বিকট শব্দে চলে গেল মোটরবাইক। এসব শব্দে ভীষণ অস্থির লাগে মনোজবাবুর। গভীর রাত পর্যন্ত ডিজে বেজেছে পাড়ায়। ভোরেও শান্তি নেই। বাইকের শব্দে ঘুমের দফারফা হয়েছে। কেবল তিনি নন, পাড়ার অনেকের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই আওয়াজ। মনোজবাবু ভাবেন, অভিযোগ জানাবেন। কিন্তু কোথায়? তা বুঝতে পারেন না তিনি। জানেনও না। অথচ শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক আইন ও বিধি রয়েছে আমাদের দেশে। শব্দের নির্দিষ্ট মাত্রা লঙ্ঘন করলে অভিযোগ জানানো যায় পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে। কী সেই আইন? চলুন জেনে নেওয়া যাক—

Advertisement

শব্দদূষণ
যে শব্দ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, ঘুম, স্বাচ্ছন্দ্য ও পরিবেশের ক্ষতি করে বা ক্ষতি করার সম্ভাবনা তৈরি করে, তাকে শব্দদূষণ বলে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট আইন নয়, একাধিক আইন ও বিধি রয়েছে। সেখানে শব্দদূষণের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা, প্রতিরোধের উপায় এবং আইন লঙ্ঘন করলে কী ধরনের শাস্তি হতে পারে, তার উল্লেখ রয়েছে। মূলত শব্দদূষণের উৎস চার ধরনের। প্রথমত, শব্দবাজি। দ্বিতীয়ত, যানবাহনের শব্দ ও হর্ন। তৃতীয়ত, লাউডস্পিকার, মাইক, ডিজে এবং অন্যান্য যন্ত্র। চতুর্থত, শিল্পাঞ্চল ও নির্মাণকাজের শব্দ। লোডিং-আনলোডিং কিংবা বড়ো যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলেও শব্দদূষণ হতে পারে।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের আইন
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন হল পরিবেশ সুরক্ষা আইন, ১৯৮৬। পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এই আইনের গুরুত্ব রয়েছে। এই আইনের অধীনে জারি হয়েছে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধি। ২০০০ সালে তৈরি হয় নয়েজ পলিউশন রেগুলেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল রুলস। এই বিধিতে বিভিন্ন এলাকার জন্য শব্দের নির্ধারিত মাত্রা, লাউডস্পিকার ব্যবহারের নিয়ম ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ২৭০ নম্বর ধারা, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা ও মোটর ভেহিকলস অ্যাক্টের বিভিন্ন নিয়মের মাধ্যমে শব্দদূষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আবার ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত। শব্দদূষণের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব পড়লে সেই অধিকারও প্রাসঙ্গিক।

কোন এলাকায় কত ডেসিবেল 
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিধি অনুযায়ী এলাকাকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—
১. শিল্পাঞ্চল: দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ৭৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৭০ ডেসিবেল।
২. বাণিজ্যিক এলাকা: দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ৬৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৫৫ ডেসিবেল।
৩. আবাসিক এলাকা: দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল।
৪. সাইলেন্ট জোন: হাসপাতাল, স্কুল-সহ নির্ধারিত সাইলেন্ট জোনে দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দ করা যায়।
উল্লেখ্য, সাধারণভাবে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দিনের সময় ও রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত রাতের সময় হিসাবে ধরা হয়।

মাইক, লাউডস্পিকার ও ডিজে বাজানোর নিয়ম  
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিধিতে মাইক, লাউডস্পিকার বা ডিজের জন্য সর্বত্র প্রযোজ্য একটি নির্দিষ্ট ডেসিবেল নির্ধারণ করা নেই। বরং সংশ্লিষ্ট এলাকার জন্য নির্ধারিত শব্দসীমা মেনে চলতে হয়। ফলে লাউডস্পিকার, ডিজে বক্স কিংবা অন্য কোনো শব্দযন্ত্র থেকে নির্গত আওয়াজ নির্ধারিত মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে তা আইন লঙ্ঘন হতে পারে। তাহলে অনুষ্ঠানের জন্য কী ব্যবস্থা? অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় থানার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তবে মনে রাখবেন, অনুমতি থাকলেও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিধি লঙ্ঘন না করাই শ্রেয়।

শব্দবাজি ফাটানোর নিয়ম 
কালীপুজোর সময় শব্দবাজির আওয়াজে অসুস্থ মানুষ ও প্রবীণ নাগরিকদের সমস্যা হয়। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে অনেক পোষ্য কুকুর-বিড়ালও। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, কালীপুজোর রাতে বাজি ফাটানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা রাত ৮টা থেকে ১০টা। এই সময়ের বাইরে বাজি ফাটানো হলে পুলিশে অভিযোগ জানানো যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাজি ফাটানো হলেও শব্দের মাত্রা ও অন্যান্য বিধি মানতে হবে। কারও বাড়ির সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে বাজি ফাটিয়ে অসুস্থ মানুষের সমস্যা তৈরি করা হলে, কিংবা শব্দের কারণে জনজীবন বিঘ্নিত হলে, পুলিশকে জানানো যেতে পারে। প্রয়োজনে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বা স্থানীয় পুলিশ কমিশনারেটের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়।
নির্মাণকাজ ও গাড়ির বিকট শব্দের ক্ষেত্রে
বাড়ির পাশে নতুন ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। এর জেরে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলছে হাতুড়ি পেটা, যন্ত্রপাতির আওয়াজ কিংবা লোডিং-আনলোডিং— এই শব্দ নির্ধারিত শব্দসীমা অতিক্রম করলে পুলিশ বা দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের কাছে অভিযোগ জানানো যায়। প্রয়োজনে যে যন্ত্র থেকে শব্দ উৎপন্ন হচ্ছে, তা বাজেয়াপ্ত করতে পারে পুলিশ। অন্যদিকে, অনেক সময় মোটরবাইক থেকে বিকট শব্দ তৈরি হয়। এই ধরনের ঘটনা মোটরযান সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের আওতায় পড়ে। এমন কোনো গাড়ির শব্দ কানে এলে, তার নম্বর লিখে স্থানীয় ট্রাফিক ডিপার্টমেন্ট, ট্রাফিক সার্জেন্ট বা থানায় অভিযোগ জানানো যায়।

আইন লঙ্ঘনে শাস্তি
১৯৮৬ সালের পরিবেশ সুরক্ষা আইনের ১৫ নম্বর ধারায় আইন লঙ্ঘনের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। আইন লঙ্ঘিত হলে জরিমানা হতে পারে ১০ হাজার থেকে ১৫ লক্ষ টাকা। আবার ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ২৯২ নম্বর ধারায় জনউপদ্রবের শাস্তি সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৫২ ও ১৬৩ নম্বর ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জনউপদ্রব প্রতিরোধে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগ জানাবেন কীভাবে
শব্দদূষণে সমস্যা হলে প্রথমেই স্থানীয় পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো উচিত। যানবাহনের শব্দের ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশকে জানানো যায়। নির্মাণকাজ বা অন্য কোনো উৎস থেকে শব্দদূষণ হলে পুলিশ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। শব্দবাজি বা ডিজের আওয়াজ নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে পুলিশকে ফোন করে পরিস্থিতির কথা জানানো যায়। অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনার স্থান, সময় এবং শব্দের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। অনেকক্ষেত্রেই ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে হবে ভেবে অনেকে অভিযোগ জানাতে ভয় পান। তাঁরা থানায় লিখিত অভিযোগ বা জিডি করে রাখতে পারেন। 
জনজীবন ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি হলে প্রশাসনকে জানানো নাগরিকের অধিকার। শব্দদূষণ কেবল একজনের সমস্যা নয়, এর প্রভাব পড়ে আশপাশের মানুষের উপরেও। তাই আইন মেনে চলার পাশাপাশি, শব্দদূষণের ঘটনা ঘটলে তার খবর প্রশাসনের কাছে পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে শব্দদূষণ নিয়ে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। ফলে অভিযোগ জানানো হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারছে পুলিশ।
শান্তনু দত্ত