Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মেঘ কুয়াশায় মোড়া লাভা লোলেগাঁও

লাভা লোলেগাঁও, উত্তরবঙ্গে দু’টি যমজ গ্রাম। নিরালা প্রকৃতি, সহজ সরল মানুষের হাসিমুখ আর শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখে মুগ্ধ হননি এমন পর্যটক মেলা ভার।

মেঘ কুয়াশায় মোড়া লাভা লোলেগাঁও
  • ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

লাভা লোলেগাঁও, উত্তরবঙ্গে দু’টি যমজ গ্রাম। নিরালা প্রকৃতি, সহজ সরল মানুষের হাসিমুখ আর শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখে মুগ্ধ হননি এমন পর্যটক মেলা ভার।

Advertisement

পাইন, দেবদারু আর ওক গাছের মাথায় ঘন কুয়াশা আর মেঘেদের গলা জড়ানো বন্ধুত্ব দেখতে দেখতে চলেছি। পাহাড়ি গ্রামের চারপাশ সবুজে সবুজ। কালিম্পং থেকে মাত্র চৌত্রিশ কিলোমিটার দূরে হিমালয় পর্বতমালার শেষ প্রান্তে অবস্থিত লেপচা গ্রাম লাভা। একেবার দূষণহীন, কোলাহলমুক্ত নিরুপদ্রব অবকাশ কাটানোর আদর্শ জায়গা এই পাহাড়ি গ্রাম। নীরবতার এক অদ্ভুত সৌন্দর্য থাকে, যা কানের, চোখের ও মনের আরাম এনে দেয়। সেই নিশ্চিন্ত আরামের ঠিকানার নামই লাভা। লাভার আর একটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ পরিযায়ী পাখি। পাখি পর্যবেক্ষক তো বটেই, সাধারণ পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় এই লেপচা গ্রাম। সহজ ও সরল গ্রামবাসীর হাসিমুখ, গরম মোমো, ম্যাগির সুঘ্রাণ, অল্প কিছু দোকানের বিকিকিনি দেখেই সময় কেটে যাবে।

এছাড়া লাভায় দেখার জন্য আছে নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক, লাভা মনাস্ট্রি, ছাঙ্গে জলপ্রপাত, লাভা ভিউ পয়েন্ট ইত্যাদি।

লাভা বিখ্যাত নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের জন্য। নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক বৈচিত্র্যময় দুষ্প্রাপ্য গাছ, বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল। দেখার জন্য ছুটে আসেন উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণপ্রেমীরা। এখানকার মিউজিয়ামের সংগ্রহ দেখার মতো। ৮৮ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে তৈরি হওয়া এই ন্যাশনাল পার্ক ভারতের প্রাচীনতম সংরক্ষিত বনভূমিগুলোর অন্যতম। দুর্গম পাহাড়ি অরণ্যভূমিতে ঘুরে বেড়ানো এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। গাইড পাওয়া যায় এখানে এবং নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্যও রয়েছে। এখানে গভীর বনপথে ট্রেকিং করতে চাইলে বনবিভাগের অনুমতি প্রয়োজন।

লাভা মনাস্ট্রিতে বৌদ্ধ আরাধনাস্থলের নির্জন, নির্মল ও শান্ত পরিবেশ মনকে শুদ্ধ করে। এটি লাভা গ্রামের একেবারে প্রবেশদ্বারে। অনেকটা বড় জায়গা জুড়ে এই মনাস্ট্রি। পুরোটা ঘুরে দেখতে গেলে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। লাভা মনাস্ট্রিতে রয়েছে বুদ্ধ মূর্তি ও সুপ্রাচীন তিব্বতি স্থাপত্যের নিদর্শন।

ছাঙ্গে জলপ্রপাত লাভা থেকে বারো কিলোমিটার দূরে। একেবারে নিস্তব্ধ জায়গায় পাহাড় ছুঁয়ে ঝরে পড়া তীব্র শব্দে জলধারার উচ্ছ্বাস দেখার মতো। এই জলপ্রপাত চাক্ষুষ করাও এক অন্য ধরনের অনুভূতি। জলপ্রপাতের নীচে পাথরের বোল্ডার রয়েছে। পাথুরে পাহাড়ি সংকীর্ণ পথ পেরিয়ে ছাঙ্গে ঝরনায় পৌঁছানো যায়। লাভা ভিউ পয়েন্ট লাভার আরেকটি আকর্ষণীয় জায়গা। এখান থেকে লাভার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুরোটা আপনি উপভোগ করতে পারেন। এখানে বেড়ানোর জন্য প্রবেশমূল্য লাগে। সবুজ বনভূমি, মেঘেদের অবাধ আনাগোনা, বিচিত্র সব ফুলের সমাহার, দূর থেকে ভেসে আসা নাম না জানা বিচিত্র পাখির সুরেলা ডাকে আপনি এই গ্রামকে ভালোবাসতে বাধ্য। আপনার কৌতূহলী চোখ পাখির ডাকের উৎস খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ দেখতে পাবে ব্লু রবিন বা রেন ব্যাবলার-এর দল।

লাভা ভিউ পয়েন্ট থেকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ রূপ। তবে বেশিরভাগ সময়েই কুয়াশার আস্তরণে ঘেরা থাকে। মেঘ আর কুয়াশার চাদর সরিয়ে অর্কদেব যেদিন স্বমহিমায় পরিক্রমা শুরু করেন, পর্যটকদের ভাগ্য সেদিন সুপ্রসন্ন। কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোমুগ্ধকর রূপ দেখে মোহিত হননি এমন পর্যটক মেলা ভার। সরলতায় ঘেরা পাহাড়ি পরিবেশে সূর্যের আলোয় আলোকিত কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দর্শন আপনার বেড়ানোর পরম প্রাপ্তি হয়ে থাকবে।

লাভা থেকে মাত্র চব্বিশ কিলোমিটার দূরে আরেকটি নির্জন গ্রাম লোলেগাঁও। অনেকে পায়ে হেঁটে ট্রেক করেও লোলেগাঁও পৌঁছন। কেউ বা যান গাড়িতে। লোলেগাঁও শব্দের অর্থ ‘সুখী গ্রাম’। নামের অর্থের সঙ্গে যথার্থই মিল।

মেঘের দল এখানে ঘুরে বেড়ায় যত্রতত্র। ইচ্ছে হলেই ছোঁওয়া যায়। আর বৃষ্টিও যখন তখন শুরু হয়।

লোলেগাঁওতেও সাইট সিইংয়ের অনেক জায়গা রয়েছে। মাত্র দশ মিনিটের দূরত্বে রয়েছে ঝাণ্ডিদারা সানরাইজ পয়েন্ট। রয়েছে হেরিটেজ ফরেস্ট আর  ক্যানোপি ওয়াক। সারি সারি পাইন গাছ ও অন্যান্য গাছের ঘন বন। জঙ্গলের ভেতরে কিছুটা চলার পর  কাঠের ঝুলন্ত সেতু আর একটা দুটো বসার জায়গা। লোলেগাঁও বেড়ানোয় ক্যানপি ওয়াক বা কাঠের ঝুলন্ত সেতুতে হাঁটা কিন্তু এক মস্ত আকর্ষণ। কাঠের পাটা, খুঁটি, লোহার তার দু’পাশের গাছের সঙ্গে বেঁধে তৈরি হয়েছে একশো আশি কিলোমিটার দীর্ঘ ঝুলন্ত এই ব্রিজ। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। বেশি মানুষের একসঙ্গে ওঠা বারণ।

হাঁটার সময় মেঘের শামিয়ানার নীচে হেলেদুলে দু’পাশের তারের রেলিং ধরে নির্জন নিস্তব্ধ অরণ্যের রূপ দেখা, সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। লোলেগাঁওয়ে হেরিটেজ ফরেস্টের পাশেই রয়েছে ইকোপার্ক। এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারাবৃত শৃঙ্গ দেখা যায়। আমাদের শহুরে লোকদের বিস্তীর্ণ সবুজ আর রকমারি ফুলের মেলায় বসে থাকতে বেশ লাগে। মেঘেদের দৌরাত্ম্যে পাশের মানুষকেও চিনতে না পারা, মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা, সেও লোলেগাঁও ভ্রমণের এক দুরন্ত আনন্দ।

লাভা এবং লোলেগাঁও এই দুটো ছিমছাম লেপচা গ্রামের আবহাওয়া একই ধরনের। এই কারণে স্থানীয় লোকেরা গ্রাম দুটোকে যমজ বলে থাকে। বছরের বেশিরভাগ সময়েই এইসব জায়গায় ঠান্ডা থাকে।

বর্ষায় প্রচুর বৃষ্টি এবং জোঁকের উপদ্রব হয়। বছরের যে কোনও সময় লাভা লোলেগাঁও বেড়াতে গেলে জোঁকের উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে নুনের ব্যবস্থা অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন।

তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চরক

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ