মুম্বই: তিনি দিলীপ কুমার ছিলেন না। কিন্তু স্বপ্ন ছিল তাঁর দু’চোখে... দিলীপ কুমার হওয়ার। ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে নয়, বড় পর্দায় দেখা যাবে তাঁকে। তাই বাবা কেওয়াল কৃষাণ সিং দেওলের মতো শিক্ষকের গণ্ডিতে বেঁধে রাখেননি নিজেকে। ‘আজাদ’ হয়ে ছুটেছিলেন... স্বপ্নের পিছনে। রাত কাটিয়েছেন গ্যারাজে। কাজ করেছেন ড্রিলিং ফার্মে। আর যতটুকু সময় পেয়েছেন, ছুটেছেন পরিচালকদের দরজায়। সুযোগ যতই বালির মতো হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, ততই চোয়াল শক্ত হয়েছে তাঁর। গ্রিক দেবতার মতো খোদাই করা মুখে ধরা দিয়েছে ‘প্রতিজ্ঞা’। দু’হাত মুঠো করে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন বোম্বে শহরকে... একদিন আসবে, তখন আমি ‘চুন চুন কে...’। আমার নাম ধরম সিং দেওল।
মুম্বইয়ের ভিলে পার্লের পবন হংস শ্মশানের হাওয়াটা যে বড্ড ভারী। শীতের আনাগোনায় সোমবারের এই দুপুরটাও যেন চাইছে না আসতে। একটা শরীর শুধু নয়, এ যে যুগের অবসান! ওই যে ঢুকছে অ্যাম্বুলেন্সটা। পিছনে গাড়িতে সানি, ববি, এষা। তারপরই ঢুকলেন হেমা মালিনী। হাওয়াটা যে বারবার পাক খেয়ে চলে যাচ্ছে পাঁচের দশকে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রকাশ কাউরের সঙ্গে বিয়ে। বোম্বে শহর। স্ট্রাগল। আর ১৯৬০ সালের অভিষেক... ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’। পারিশ্রমিক? তিনজন প্রযোজক দিয়েছিলেন ১৭ টাকা করে। সব মিলিয়ে মাত্র ৫১ টাকা। আর আজ সাড়ে তিনশো কোটির সাম্রাজ্যের মালিক। সঙ্গে অমূল্য কিছু অভিনয়, অ্যাকশন, আর লেগাসি। ওই যে শ্মশানঘাটে ঢুকছেন আমির খান, শাহরুখ খান। আর জয়... অমিতাভ বচ্চন। ভিড় বাড়ছে আশপাশে। সবার চোখে অবিশ্বাস। এই তো ১৩ দিন আগে যাবতীয় রটনা উড়িয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। এবার কি সত্যিই...? মানতে পারছে না তাঁর ভক্তকুল। চোখের সামনে স্লাইড শোয়ের মতো ভাসছে ‘অনুপমা’, ‘সত্যকাম’, ‘জুগনু’, ‘শোলে’র দৃশ্যগুলো। ৯০ হওয়ার কথা ছিল আগামী মাসে। ৮ ডিসেম্বর। জাঁকজমকে সেলিব্রেট করার পরিকল্পনা করেছিল দেওল পরিবার। কিন্তু আজ... পাক খেয়ে ধোঁয়াটা উঠে যাচ্ছে আকাশপানে। তাকিয়ে রয়েছেন হেমা। শূন্যদৃষ্টি। মনে পড়ছে কি তাঁর সেই প্রেম? গোটা দেশের হট টপিক হয়ে গিয়েছিল। দ্রুত। সালটা ১৯৭২। বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা? হেমা নিজেও মানতে পারছিলেন না। কিন্তু ধর্মেন্দ্রকে ইগনোর করার মতো শক্ত মনও ছিল না তাঁর। জিতেন্দ্রর সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ ভাঙল। সঞ্জীব কুমারও ফ্যাকাশে হয়ে গেল তাঁর প্রেম-জীবন থেকে। ১৯৮০ সালে বিয়ে। তাঁর স্বপ্নের হিরো ধর্মেন্দ্রর সঙ্গেই। শোনা যায়, এই বিয়ের জন্য ধর্মান্তরিতও হয়েছিলেন। আজ সেই মানুষটাই আর নেই!
মন খারাপ হেমার। মন খারাপ মুম্বইয়ের। মন খারাপ বাংলার। হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়, অসিত সেন... একের পর এক হিট যে তাঁর বাঙালির হাত ধরেই। তাই বাংলাকে সবসময় মুকুটের মতো মাথায় রেখেছিলেন ধর্মেন্দ্র। আর স্বপ্নের নায়ক দিলীপ কুমারের সঙ্গে তাঁর অভিনয় যে প্রথম বাংলা ছবিতেই—‘পাড়ি’। মন খারাপ আজ বিকানিরেরও। ২০০৪ সালে ধূ ধূ মরুপ্রান্তর বেয়ে তাঁর জিপ যখন ছুটে চলেছে, আশপাশের গ্রাম থেকেও ছুটে আসছে কাতারে কাতারে মানুষ। ধর্মেন্দ্র যে তাঁদের কেন্দ্র থেকে ভোটে লড়ছেন! সবাই ঘিরে ধরেছিল তাঁকে। একবার মরুরাজ্যের আকাশে ছুড়ে দিতে হবে ‘শোলে’র ডায়ালগ। তারাও যে গগন কাঁপিয়ে গলা মেলাবে তাদের স্বপ্নের নায়কের সঙ্গে। জয়ের বন্ধুর সঙ্গে। গব্বরের প্রতিপক্ষের সঙ্গে। বাসন্তীর বীরুর সঙ্গে।
ধর্মেন্দ্র চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। নায়কের সংজ্ঞা বদলেছেন। একটি বছরে সাতটি হিট দিয়েছেন। রাজনীতিতে নেমেছেন। আবার সাক্ষী হয়েছেন জীবনের নানা ওঠাপড়ারও। অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁকে বুঁদ করেছিল। শ্যুটিংয়ে তাঁর মুখে পেঁয়াজের গন্ধ পেলে আশা পারেখের মতো নায়িকারা বুঝতেন, ধরম পা-জি আবার একটু টালমাটাল হয়ে গিয়েছেন। কাউকে না বলতে পারতেন না। তাই কাজ করতেন তিন শিফটে। কখনও চার। তারপরও সেরা অভিনেতার সম্মান অধরাই থেকে যেত। তাও তিনি যেতেন অ্য্যাওয়ার্ড সেরিমনিতে। স্যুটেড বুটেড হয়ে। বসে থাকতেন দর্শকাসনে। হয়তো তখন মঞ্চে পুরস্কার নিচ্ছেন অমিতাভ বচ্চন। আজ ভিলে পার্লেতে দাঁড়িয়ে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যানে’র চোখেও যে শূন্যতা! শুধু যুগের নয়, এ এক বন্ধুত্বেরও অবসান... ‘ইয়ে কাহানি ভি আধুরি রহ গয়ি’।



