জ্যোৎস্নাস্নাত পাহাড় দেখব দোল পূর্ণিমায়; সেই উদ্দেশ্যেই বেরিয়ে পড়েছিলাম সপরিবার সিংভূম জেলার মেঘাহাতুবুরু। মেঘের দেশ। শাল গাছের অরণ্য। বুরু শব্দের অর্থ জঙ্গল। মেঘ আর গভীর জঙ্গলের সহাবস্থান; তাই মেঘাহাতুবুরু। মালভূমির শুরুতে শ্রীহীন প্রান্তর। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। ট্রেন থেকে নেমে ড্রাইভারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এগিয়ে গেলাম গাড়ি পার্কিংয়ের দিকে। কিছুটা রাস্তা বেশ খারাপ। ভালো রাস্তা আসতেই গাড়ি গতি বাড়িয়ে দিল। শালবনের বুক চিরে এঁকেবেঁকে চড়াই-উতরাই রাস্তায় ছুটে চলা গাড়িতে জানলা দিয়ে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। জঙ্গলের মেঘালয় গেস্ট হাউসের কাছেই দাদার কোয়ার্টার। সামনেটা শুকনো শালপাতা বিছানো। শনশন করে হাওয়া বইছে। আলো-ছায়া খেলা করছে শাল বনে। কিরিবুরু-মেঘাহাতুবুরু হোলি উৎসবের আলোয় সেজে উঠেছে। ব্যস্ত শহর থেকে বিচ্ছিন্ন আয়রন ও মাইনস-এর পদস্থ কর্মচারীরা সপরিবার অথবা একাকী যোগ দিয়েছেন বুড়ি পোড়ানোয়।
বিদ্যুতের ফটফটে আলোয় গৌর পূর্ণিমার আলোর স্নিগ্ধতা ম্রিয়মাণ। সন্ধ্যাকাশে রেড মুন শালগাছের ফাঁক বেয়ে ধরা দিল মোবাইলে। কুয়াশার আবরণে ঢাকা একটু দূরের পাহাড়। নির্জন শালের জঙ্গলে রাত্রিযাপন।
১৪ মার্চ। দিনের শুরুটা মেঘমুক্ত। সাত সকালেই রোদ বেশ কড়া। অতীতের মিনি কাশ্মীর এখন ইতিহাস। মেঘাহাতুবুরুতে মেঘদের আনাগোনা পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়েছে। অবশ্য জানা গেল, বর্ষার তিন-চার মাস রোদের মুখ দেখা যায় না। কুয়াশা আর মেঘে ঢাকা থাকে চারদিক। বুনো ফুল আর সবুজ ঝোপঝাড়ে প্রকৃতি হয়ে ওঠে অনন্য। এবছরও দু’মাস কড়া শীত পড়েছে। ইদানীং শিলাবৃষ্টি হচ্ছে।
কিরিবুরু-মেঘাহাতুবুরুতে দোলের উৎসবে এসে মনে হল বয়স একটা সংখ্যা মাত্র। পরিচ্ছন্ন, সুন্দর মেঘা ক্লাবের সাজ। একদঙ্গল বালক-বালিকা সদ্য নির্মিত সুইমিং পুলে সকাল ন’টা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত পিচকিরি রং নিয়ে মেতে রইল। পুলের জল রঙিন হয়ে উঠেছে। চলছে দোল উৎসবের শুভেচ্ছা বিনিময় ও আবির রঙে রাঙানোর আয়োজন। বাচ্চারা পুল খালি করার পর পুরুষরা সুইমিং পুলে নেমে রং খেলা শুরু করে দিল। কড়া রোদেই বসে গেল একদল মহিলা।
শালবনের মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোয়ার্টার। দুপুরটা নিঝুম হয়ে যায়। এদিকটাতে কোনও জলাশয় নেই। তাই বোধহয় পাখিও দেখা গেল না। মেঘা ক্লাবে যেতে কিছু পাখির কিচিরমিচির শোনা গিয়েছিল।
মেঘালয় গেস্ট হাউসের পাশে সানসেট পয়েন্ট। দুপুর পর্যন্ত কড়া রোদ। বিকেল হতেই মেঘের ঘনঘটা। একটু দূরের পাহাড় কুয়াশাচ্ছন্ন। প্রচুর লোক এসেছে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ অবসন্ন। নাছোড়বান্দার মতো মেঘ পশ্চিম দিগন্ত ঢেকে রাখল। সানসেট দেখা হল না। অগত্যা পায়ে হেঁটে শহর পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়লাম। শালগাছের ফাঁকে লাল চাঁদের অপূর্ব দৃশ্য। একটা বিষয় লক্ষ করলাম এখানে গোটা কয়েক শালগাছ বেষ্টন করে আছে বটগাছ। শালগাছের বাকলের মধ্যেই জন্মেছে, মাটি স্পর্শ করেনি। স্কুল, ব্যাঙ্ক, খেলার মাঠ, থানা, মন্দির, বাজার, কালীমন্দির রাস্তার দুই ধারে। পাহাড়ি রাস্তা । হাঁটা হয়ে গিয়েছে তিন কিলোমিটার। ফিরতেও হবে হেঁটেই। টোটো, অটো, রিকশা কিছুই নেই।
১৬ মার্চ সারান্ডার জঙ্গল সাফারি। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পারমিশনের কাগজপত্র রাতেই গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘর থেকে টিফিন বানিয়ে এবং দুপুরের খাবার প্যাক করে সকাল দশটা নাগাদ রওনা হলাম। কিরিবুরু ফরেস্ট অফিসের গেটে গাড়ি থামিয়ে সই-সবুদ করে নিল দাদা। গাড়ির জানালা খোলা যাচ্ছে না, ধুলোর ভয়ে। চলার পথে পড়ল ভাগীরথী পাম্প হাউস ও ওয়াটার ফলস। ঝুলন্ত সিঁড়ি ও ব্রিজ। এক কিলোমিটার তো হবেই। অতটা উঁচুতে ওঠার পরেও ঝর্ণার জল কোথা থেকে ঝরে পড়ছে দেখা গেল না। ৫০০ মিটার শূন্যে ঝোলা ব্রিজের উপর নিয়ে দুলতে দুলতে হেঁটে যাওয়া। কিছুটা কাঠের সিঁড়ি। আবার ঝুলন্ত ব্রিজ। মাঝামাঝি জায়গায় কিছু মানুষ নেমে পড়েছে ঝর্ণায় স্নান করতে। যাওয়া-আসায় প্রায় এক-দেড়ঘণ্টা লেগে গেল।
গাড়িতে ওঠার সময় বনবিভাগের লোকরা জানিয়ে দিলেন, ‘বেশি দেরি করবেন না। দুই দিন আগে হাতি বেরিয়ে ছিল। বেলায় বেলায় ফিরবেন।’ শালের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। স্বাভাবিক ভাবেই গাড়ির গতি ধীর। এই জঙ্গলে ভাটফুলের (ঘেঁটুফুল) গাছ প্রচুর। মাওবাদী অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়ায় স্থায়ী সিআরপিএফ ক্যাম্প হয়েছে। গজরাজদের জলপানের জায়গায় ড্রাইভার গাড়ি অল্প সময়ের জন্য থামিয়েছিল। দেখা দিলে সারান্ডার জঙ্গল সাফারি জমে যেত। বেশ কিছু পথ পেরিয়ে ফরেস্ট গেস্ট হাউসের একটা অতি প্রাচীন আমগাছের নীচে গিয়ে আমরা বসলাম। দু’টি ট্যুরিস্ট গাড়ি এল। আমরা যাব নিঘিরধা গুম্ফা দেখতে। সঙ্গে থাকবে গাইড। এই নিঘিরধা গুম্ফা ভল্লুকদের আস্তানা। এখানে এমন কিছু শালগাছ দেখা গেল; যা তিন চারশো বছর বয়সি। শাল গাছের বাকলে ধুনো হয়ে রয়েছে। কখনও দেখিনি এমন পরগাছা। আমরা কিরিবুরু থেকে ৩০ কিলোমিটার ভিতরে জঙ্গলের গভীরে চলে এসেছি।
নিঘিরধা গুম্ফা দেখানোর জন্য যে ছেলেটি গিয়েছিল, তার নাম বিকাশ। সে এ বছরে সিবিএসসি দিয়েছে। ছেলেটি প্রত্যেকদিন পঁচিশ কিলোমিটার দূরে স্কুলে পড়তে যেত। খুব শান্ত, ভালো ছেলে। গুম্ফা দেখার পর আমাদের ফেরার পালা একই রাস্তা দিয়ে। কিরিবুরু মাইনস-এ এসে গাড়ি থামল। মাইন থেকে উত্তোলিত আকরিক লোহা থেকে যেখানে লাম্ব ও ডাস্ট আলাদা আলাদা হচ্ছে সেখানে আমরা কিছুক্ষণ ছিলাম। দিনটা বেশ রোদ ঝলমলে। বিকেলেও মেঘের আনাগোনা তেমন না থাকায় সূর্যাস্ত দেখার সাধ মিটল।
পরের দিন ঝিকরা ফলস ও মুর্গামহাদেব দেখতে যাওয়ার পথে পড়ে গিরিরাজেশ্বরী মন্দির। খুব জাগ্রত। মানত করে ভাণ্ডারা দেন অনেকে। ঝিকরা ফলস ও মুর্গামহাদেব যেতে পড়বে বেশ কয়েকটি মাইন আর প্লান্ট। পিচের রাস্তা ছেড়ে মোরাম বিছানো রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর পায়ে হাঁটা রাস্তা। ঝর্ণার জল বয়ে যাচ্ছে পাথরে খাঁজ দিয়ে। পায়ে চলার এবড়োখেবড়ো পথে সাবধানে পা ফেলে এগতে হচ্ছে। অনন্ত পঞ্চাশ ফুট উঁচু থেকে ঝর্ণার জল ঝরে পড়ছে। মনোরম ঠান্ডা পরিবেশ। দশ ফুট দূর থেকেও বিন্দু বিন্দু জলকণা এসে স্পর্শ করবে। আরও কাছে গেলে আপাদমস্তক ভিজিয়ে দেবে। ঝর্ণার কাছাকাছি যেতে গেলে ভিজতে হবে। ইচ্ছে হলেই সেই হিমশীতল জলে স্নানও করে নেওয়া যায়। সাতরঙা রামধনু ঝর্ণার জলে স্পষ্টভাবে দেখা গেল। বেলা যত বাড়তে থাকে রামধনু পাহাড়ের গা বেয়ে উপর থেকে ঝরে পড়া জলে প্রতিফলন ঘটায়। জায়গাটি পিকনিক স্পট।
মুর্গামহাদেব মন্দির দেখার জন্য যেতে হবে আরও অনেকটা রাস্তা। দোকান বাজার, জনবসতি তেমন একটা নেই। রাস্তার পাশে কাঠ, গাছের ডাল দিয়ে বসার জায়গা। মন্দিরে ১২টা নাগাদ পৌঁছলাম। মন্দির চত্বরে ছায়া নেই কোথাও। সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে হবে। বারোটা বেজে যাওয়ায় মূল মন্দিরের গেট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। গাড়িতে টুকটাক খাওয়া হলেও খিদে পেয়েছিল বেশ। ফলে পরবর্তী গন্তব্য পেটপুজো।
১৭ মার্চ রাত সাড়ে দশটায় মনোহরপুর থেকে আমাদের ট্রেন। সারাটা দিন থাকা যাবে। ওই দিন দাদার সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলাম প্রাতঃভ্রমণে। শিবমন্দির দেখে এলাম লেক গার্ডেনে। লেক গার্ডেন পাখির কলতানে মুখরিত। প্রচুর মরশুমি ফুল।
ফেরার ট্রেন মনোহরপুর থেকে। দূরত্ব ৬০ কিমি, গাড়িতে এক ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম। ফেরার সময় মনটা বিষাদে ভরে গেল। জঙ্গলের সম্পদ আজ অনেকাংশেই ব্যবসাদারদের দখলে। আর আদিবাসীরা হাড়িয়া বা মহুয়ায় বুঁদ হয়ে অকালে ঝরে যায় আজও। এত অগ্রগতি, তবু এই চিত্র বদলায় না কখনও।



