নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: ঐতিহ্যের গন্ধ মিশে রয়েছে এই বাড়ির প্রতিটি ইট-কাঠে। ভক্তির আবেশে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত মুখর থাকে উঠোন। আর বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো এক বিশেষ দিনে এখানে ভিড় জমে হাজার হাজার মানুষের। কারণ শান্তিপুরের এই বিগ্রহ বাড়ি শুধু দেবসেবার কেন্দ্র নয়, বৈষ্ণব ইতিহাসের অমূল্য ধনভাণ্ডার। পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সযত্নে রক্ষিত রাধা ও শ্রীশ্রীমদনগোপাল জিউর দারুমূর্তি আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘কুঞ্জভঙ্গ’–ই এই বাড়ির পরিচয়কে করেছে অনন্য।
এখানকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিগ্রহবাড়ি হল মদন গোপাল বাড়ি। ঐতিহ্য অনুসারে, অদ্বৈতাচার্যের দ্বিতীয় পুত্র কৃষ্ণ মিশ্রের বংশধররাই আজও এই সেবার ভার সামলান। পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, অদ্বৈতাচার্য বৃন্দাবনে গিয়ে মদনগোপালের আদেশ পান এবং সেখান থেকে বিশাখা দেবীর আঁকা চিত্রপট নিয়ে আসেন শান্তিপুরে। প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে সেই চিত্রের সামনে রেখে নির্মিত হয় শ্রীকৃষ্ণের দারুমূর্তি। আজও সেই চিত্রপট বিগ্রহের সঙ্গে সংরক্ষিত, যা এই মন্দিরের নীরব ইতিহাস বয়ান।
এই বিগ্রহ অদ্বৈতাচার্যের সেবিত হিসেবে খ্যাত ছিল। পরে তিনি তা দিয়ে যান তাঁর দ্বিতীয় পুত্র কৃষ্ণ মিশ্রকে। প্রথম পুত্র সন্ন্যাস নেওয়ার কারণে কৃষ্ণ মিশ্রই সমস্ত দ্বায়িত্ব পান। তাঁদের রাধিকা মূর্তি রয়েছে দু’টি। এটির পিছনেও রয়েছে কাহিনি। শুরুর দিকে একটি রাধিকা মূর্তি ছিল। পরে সেটির অঙ্গহানি হওয়ায় দ্বিতীয় মূর্তি গড়া হয়। যদিও প্রথমটিকে জলে বিসর্জন দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না পরিবারের লোকজন। তাই দুই বিগ্রহই সমানভাবে পূজিত হন আজও।
এই বাড়ির অলঙ্কার হল ‘কুঞ্জভঙ্গ’। পুরাণ মতে, রাসলীলায় গোপিনীদের কাছে পরাজিত হন শ্রীকৃষ্ণ। রাধিকা ও গোপিনীরা তাঁর মোহনচূড়া অর্থাৎ মুকুটের উপর মাথার ময়ূরের পালক অর্ধনমিত করতে বলেন। এছাড়াও কৃষ্ণের বংশী দান করতে বলেন। সেই পরাজয়ের লীলাই এখানে উৎসবে রূপ পেয়েছে। ভগবানকে কোলে নিয়ে নৃত্য, মন্দির পরিক্রমা ভক্তিময় আবহে ভরে ওঠে সমগ্র বাড়ি। পাশাপাশি সাজানো হয় বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, যা পরে বের হয় নগর পরিক্রমায়। শহরের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে রাসলীলার শোভা।
বর্তমান প্রজন্মের প্রতিনিধি সুরজিৎ গোস্বামী বলেন, সাড়ে পাঁচশো বছর ধরে এই প্রথা চলছে। আমাদের কুঞ্জভঙ্গ খুব বিখ্যাত। সেই শুভক্ষণে ভগবানকে কোলে নিয়ে নাচানো হয়, করা হয় পরিক্রমা। বাইরে থেকেও অনেক মানুষ আসেন এই দৃশ্য দেখতে।
শতাব্দী পেরিয়ে আজও এই মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, শ্রীধাম শান্তিপুরের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের মূর্ত প্রতীক, যেখানে ইতিহাস, ভক্তি ও লোকাচার মিলিত হয়েছে পবিত্র স্রোতে।