সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: একদা বঙ্গ সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর কৃষ্ণনগরে পটচিত্রের ছিল বাংলাজোড়া নাম। কাগজ, কাপড় বা মাটির উপর রঙের আঁচড়ে ফুটে ওঠা এই শিল্পকর্ম নিছক বিনোদন ও নন্দনচর্চার গন্ডি ছাড়িয়ে পুরাণ, ইতিহাস আর সমাজজীবনের দলিল হয়ে উঠত। পুরাণকথা থেকে শুরু করে লোকজ গল্প, সবই ফুটে উঠত পটে। একসময় এই শিল্পের কদর ছিল গ্রামবাংলার আচার-অনুষ্ঠান থেকে বড় শহরের প্রদর্শনীতে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। অবহেলা, বাজারের অভাব আর বর্তমান প্রজন্মের অনাগ্রহে কৃষ্ণনগরের পটচিত্র আজ প্রায় বিলুপ্তপ্রায়।
একসময়ে দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে জগদ্ধাত্রী পুজো, বিয়ে, বাড়ির অন্দরসজ্জা হিসেবে এই শিল্পের কদর ছিল। শিল্পীরা সযত্নে হাতে আঁকতেন রামায়ণ-মহাভারত, শ্রীকৃষ্ণলীলা কিংবা লোকজ জীবনের নানা ছবি। গানের সুরে তাল মিলিয়ে ছবিগুলি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হতো। অর্থাৎ এটি ছিল একাধারে শিল্প, সঙ্গীত ও কাহিনির এক মেলবন্ধন। কিন্তু আধুনিকতার দাপট, প্লাস্টিক, প্রিন্টেড পোস্টার, ডিজিটাল ব্যানার ও সস্তা ওয়াল ডেকরের ভিড়ে পটশিল্প আজ মৃতপ্রায়। নতুন প্রজন্ম এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। কম দামের প্রিন্টেড পোস্টার বাজার দখল করেছে। পটচিত্র শুধু ছবি নয়, একসময় এটি ছিল লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত মাধ্যম।
স্থানীয় শিল্পীদের অভিযোগ, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং নতুন প্রজন্ম এই শিল্পে আগ্রহ হারানোয় পটচিত্র আজ প্রায় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। আগে যে হাতে আঁকা ছবিগুলি গ্রামীণ মেলা থেকে শুরু করে শহরের সংস্কৃতির আসরে বিশেষ স্থান দখল করত, এখন সেগুলির জায়গা দখল করেছে মেশিনে ছাপা পোস্টার ও ডিজিটাল প্রিন্ট। ফলে ঐতিহ্যবাহী শিল্পীরা রুজিরুটির অভাবে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন। এই শিল্পকে বাঁচাতে সরকারি উদ্যোগ ভীষণ প্রয়োজন। সরকারি স্তরে যদি পটচিত্র প্রদর্শনী আয়োজন করা যায়, তবে এই শিল্পের প্রচার হবে।
কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত প্রবীণ শিল্পী রেবা পাল বলেন, একসময় কৃষ্ণনগরের পটচিত্র দূরদূরান্তে খ্যাতি অর্জন করেছিল। এখন আর সেভাবে বিক্রি হয় না। আমি আজ ষাট বছরের বেশি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বিগত ১৫ বছর ধরে ক্রমাগত এই শিল্পের অবক্ষয় হতে হতে এখন তলানিতে ঠেকেছে। এখন আমি আর তেমন কাজ করতেও পারি না। নতুন কেউ এই কাজ আসে না। সরকার এবং বিভিন্ন পুজো কমিটি যদি এগিয়ে না আসে, তবে এই শিল্পকে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষরা বলেন, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলির উচিত এই শিল্পকে রক্ষার জন্য বিশেষ প্রকল্প নেওয়া, শিল্পীদের আর্থিক সাহায্য ও প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া। তবেই হয়তো কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্যবাহী
পটচিত্র আবারও নবজাগরণের মুখ দেখবে। -নিজস্ব চিত্র