Bartaman Logo
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

কলকাতার প্রথম দুর্গা, ৫০০ বছরের প্রাচীন দেবী থাকেন চিৎপুরে

কলকাতার প্রথম দুর্গা থাকেন কোথায়? দুর্গা থাকেন গঙ্গার ধারে। কলকাতায় বারোয়ারি পুজো হয়। বনেদি বাড়ির পুজো হয়। বহু গৃহস্থ বাড়িতে পুজো হয়।

কলকাতার প্রথম দুর্গা, ৫০০ বছরের প্রাচীন দেবী থাকেন চিৎপুরে
  • ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: কলকাতার প্রথম দুর্গা থাকেন কোথায়? দুর্গা থাকেন গঙ্গার ধারে। কলকাতায় বারোয়ারি পুজো হয়। বনেদি বাড়ির পুজো হয়। বহু গৃহস্থ বাড়িতে পুজো হয়। এঁদের  সবার মধ্যে কে প্রথম? এ প্রশ্নটা নিশ্চয় বারবার মনে আসে। কেউ উত্তর জানেন। অনেকে হয়ত জানেনও না।

Advertisement

উত্তর, কলকাতার প্রথম দুর্গা হলেন ‘চিত্রেশ্বরী’। লোকমুখে, ‘চিত্তেশ্বরী’। নিবাস চিৎপুর। সেখানে উজ্জ্বল হলুদ রঙের মন্দির তাঁর। কথিত, দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্রেশ্বর (চিতে) ডাকাত। ‘বাংলার ডাকাত’ বইয়ে যোগীন্দ্রনাথ গুপ্ত জানিয়েছেন, ‘রঘু ডাকাতের পূর্বপুরুষ হলেন চিতে ডাকাত।’ 
ডাকাতি করতে বেরনোর আগে দুর্গার সামনে নরবলি দিতেন চিতে। ১৮৪৬ সালে ক্যালকাটা রিভিউয়ে রেভারেন্ড লংয়ের লেখা, ‘ইউরোপিয়ানরা একে চিত্রপুরের কালীমন্দির বলে চেনেন। এই সেই স্থান, যেখানে দেবীর সামনে সব থেকে বেশি সংখ্যক নরবলি হয়।’ প্রায় রোজই বলি হত বলে এবং ডাকাত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বলে অনেকে ভাবতেন চিত্তেশ্বরী আসলে কালী। কিন্তু তা নয়। চিতে ডাকাতের আরাধ্য দেবী আসলে দুর্গা। অনেকে মনে করেন, চিত্তেশ্বরী থেকেই ওই জনপদের নাম চিত্রপুর। সেখান থেকে চিৎপুর।
চিৎপুরে গঙ্গা যেখানে আচমকা বাঁক নিয়ে বাগবাজারের দিকে ঢুকেছে, সে বাঁক থেকে ডাঙায় উঠে সোজা রাস্তাটা ধরে বিটি রোডের দিকে গেলে বাঁ হাতে পড়বে চিত্তেশ্বরীর মন্দির। কাশীপুরের গান অ্যান্ড সেল ফ্যাক্টরির দু’নম্বর গেটের ঠিক উল্টোদিকে, ঠিকানা, ৯ নম্বর খগেন্দ্র চ্যাটার্জি রোড, কলকাতা ৭০০০০২। চিত্তেশ্বরীর সম্পত্তিতেই নাকি গড়ে উঠেছিল ফ্যাক্টরি।
আজকের কলকাতা আর চিতে ডাকাতের কলকাতা মোটেও এক নয়। তখন সুতানুটি, গোবিন্দপুর, কলকাতা-ভাগীরথির তীরে থাকা ছোট তিনটি গ্রাম। চিৎপুর-শোভাবাজার-বাগবাজার, হাটখোলা ইত্যাদি নিয়ে সুতানটি। বউবাজার, ধর্মতলা, জানবাজার ইত্যাদি নিয়ে কলকাতা গ্রাম। আর হেস্টিংস, ময়দান, ভবানীপুর প্রভৃতি নিয়ে গোবিন্দপুর। গঙ্গার ধার ধরে ‘পিলগ্রিম রোড’ নামে একটি মাত্র পায়ে চলা পথ। যেটি কালীঘাটের কালীমন্দির থেকে চিৎপুরের চিত্তেশ্বরী মন্দিরকে যুক্ত করেছিল। তীর্থযাত্রীরা গঙ্গার ধার ঘেঁষা সে পথ দিয়ে যাতায়াত করতেন। আর মাঝেমধ্যেই বাঘের আক্রমণে বা ডাকাতের হামলায় প্রাণ হারাতেন। জঙ্গলে ভরা সে জায়গা তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ডাকাত চিতে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মূর্তিটিই এখনও পুজো পাচ্ছে। সুধীরকুমার মিত্র তাঁর ‘দেব দেবীর কথা ও কাহিনী’ গ্রন্থে লিখছেন, ‘চিতু ডাকাতের চিত্তেশ্বরী দুর্গার দারুমূর্তি পুরাবস্তু হিসাবে বাঙলাদেশের প্রাচীন অন্যতম পুরাকীর্তি।’ গভীরভাবে ভাবলে গায়ে কাঁটা দেবে, প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর পুরনো একটি মূর্তি নগর কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে। এত প্রাচীন নিদর্শন কলকাতার বুকে আর একটাও আছে তো? 
বিনয় ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি বইতে লিখছেন, ‘চিত্তেশ্বরীর প্রাচীনতা অস্বীকার করার বিশেষ কারণ নেই যদিও মন্দির অর্বাচীন হতে পারে।’ সে মূর্তি চোখে দেখাটাও সৌভাগ্য। না দেখলে প্রাচীন বাংলার অসাধারণ একটি নিদর্শন ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...’ হয়ে থেকে যায়।
শোনা যায়, গঙ্গায় ভেসে আসা নিম গাছের গুঁড়ি দিয়ে দুর্গামূর্তি তৈরি করেছিলেন চিতে। মূর্তির গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল হলুদ। টানা টানা চোখ। পদতলে ঘোড়া আকৃতির সিংহ। পায়ের নীচে বাঘ। জঙ্গল এলাকা বলে দক্ষিণরায়ের দ্যোতক হিসাবে বাঘের মূর্তি রাখা। চিতে ডাকাতের মৃত্যুর পর মূর্তির খোঁজ ছিল না। ১৫৮৬ সালে তন্ত্রসাধক নৃসিংহ ব্রহ্মচারী হোগলা পাতার মন্দিরটি খুঁজে পান। পঞ্চমুণ্ডের আসন তৈরি করে পুজোআচ্চা শুরু করেন। অনেক পরে ব্ল্যাক জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র দুর্গামন্দির তৈরি করেন। ক্রমে বৈবাহিক সম্পর্ক সূত্রে জমিদার সাবর্ণ রায় চৌধুরীদের সঙ্গে ব্রহ্মচারীদের যোগস্থাপন। সেই বংশেরই কাশীশ্বর রায় চৌধুরী এখন মন্দিরের সেবায়েত। কাশীশ্বরবাবু বলেন, ‘কলকাতার প্রাচীনতম নিদর্শনটি নিয়ে কেউ খুব একটা ভাবিত নন। চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে রয়েছে মন্দির।’ পাশাপাশি তিনি জানান, এবারও ধুমধাম করে পুজো হবে। সকল ভক্তের জন্য মন্দিরের অবারিত দ্বার। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ