Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

যিশু দিবসে কলকাতা সফর

ক্রিসমাসে কলকাতা সেজে ওঠে নানাভাবে। গির্জা থেকে বিদেশি পাড়া সবই থাকে আলোয় আলোকময়। সেই সাজ দেখার আগাম পরিকল্পনা করে নিন।

যিশু দিবসে কলকাতা সফর
  • ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ক্রিসমাসে কলকাতা সেজে ওঠে নানাভাবে। গির্জা থেকে বিদেশি পাড়া সবই থাকে আলোয় আলোকময়। সেই সাজ দেখার আগাম পরিকল্পনা করে নিন।

Advertisement

প্রায় এক বছর আগে থেকেই পরিকল্পনা করছিলাম এবারের বড়দিনের সময়টা কীভাবে কাটানো যায়। ঠিক করেছিলাম এবার ‘যিশু দিবসে’ কল্লোলিনী তিলোত্তমার বুকেই সঁপে দেব নিজেকে। একটা দিন কীভাবে কাটাব তার পরিকল্পনা রইল।
শুরুতেই গির্জা
বড়দিনের প্রথম গন্তব্য সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল। ওই চত্বরে পৌঁছে যাব সকাল ন’টা নাগাদ। বিড়লা তারামণ্ডল ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল-এ র পাশে অবস্থিত এই গির্জাটি বড়দিনের আগে থেকেই নতুনভাবে সাজাতে শুরু করে। গির্জা চত্বরে যিশুখ্রিস্টের জীবনের নানা ঘটনা মূর্ত হয়ে ওঠে রঙিন প্রতিকৃতির মাধ্যমে।
গির্জার ভিত্তিপ্রস্তর থেকে জানা যায়, ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মিত হয়েছিল। পূর্ব বিশ্বের প্রথম এপিস্কোপাল চার্চ হিসাবে এই স্থাপত্যশৈলী স্বীকৃত। ফ্লোরেনটাইন নকশার দু’টি ফ্রেসকোর নয়নাভিরাম কাজ দেখে সত্যিই বিস্ময় লাগে। এছাড়াও একটি অলঙ্কৃত দেওয়াল, বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য ও স্মারক রয়েছে, যেগুলো সেন্ট পলের জীবনের অনেক অজানা ঘটনাবলি দিয়ে সাজানো। সেন্ট পলস হলঘরে বসে দু’দণ্ড সময় যে কাটাব সে তো আর বলার অপেক্ষাই রাখে না। নির্দিষ্ট কোনও ধর্মে বিশ্বাস থাক বা না থাক, চার্চের এক অদ্ভুত মহিমা আছে। তা মনকে শান্ত করে।
ফিটন গাড়ির জুরি নেই
এখান থেকে বেরিয়ে কাছেই ভিক্টোরিয়া। সেখানে সেদিন প্রবেশ করব না ঠিকই, তবে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে একটু ইতিউতি মন্দ নয়! সাদা ঘোড়ায় টানা ফিটন গাড়ির ফিক্সড রেট। আধ ঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট ঘোরাবে। তবে সুযোগ বুঝে সামান্য দরদাম চলে।  
উৎসবমুখর পার্কস্ট্রিট
সেন্ট পলস গির্জার কাছেই মেট্রো স্টেশন রবীন্দ্র সদন। সেখান থেকে মেট্রো ধরে যাব পার্ক স্ট্রিট। পার্ক স্ট্রিটের বড়দিনের সাজ দেখার মতো। কানে বাজবে ‘জিঙ্গল বেলস’-এর সুর। হাঁটার নেশায়, উৎসবের মেজাজে নিজেকে সেদিন হারিয়ে ফেলব পার্ক স্ট্রিটের রাস্তায়। 
নির্মল হৃদয়ের সন্ধানে
পার্ক স্ট্রিটের বর্তমান নাম মাদার টেরিজা সরণি। আর মাদার টেরিজার নাম স্মরণে আসতেই ‘নির্মল হৃদয়’-এর কথা মনে পড়ে। তাই পার্ক স্ট্রিট মোড়ে এসে উঠে পড়ব বাসে। টুক করে এ জে সি বোস রোডের ক্রসিংয়ে নেমে পড়ব আর তারপর বড়দিনে অন্যরকম ভাবে সেজে ওঠা এই সেবাকেন্দ্রে প্রবেশ করব।
এই তিলোত্তমা কলকাতা শহরের বুকে কত বছর আগে যুগোস্লাভিয়া থেকে ছুটে এসেছিলেন অ্যাগনেস, পরবর্তীকালের মাদার টেরিজা। কলকাতার পথেঘাটে আর্ত, নিপীড়িত, দরিদ্র, মৃত্যুপথযাত্রীদের যন্ত্রণায় ব্যথাতুর হয়ে উঠত তাঁর হৃদয়। তাই তিনি স্থির করেন যে, এদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য গড়ে তুলবেন সেবাকেন্দ্র। তাঁর প্রতিষ্ঠা করা মিশনারিজ অব চ্যারিটি।  
এইভাবেই বিভিন্ন ইতিহাসের অনুসন্ধান করতে করতেই ঘড়ির কাঁটায় সূর্যদেবের মধ্যগগনে অবস্থান করার কথা। রসনাবিলাসের প্রয়োজন। পার্ক স্ট্রিটের কোনও রেস্তরাঁতে প্রবেশ করে জমিয়ে দুপুরের ভূরিভোজ করা যেতে পারে। আবার বাজেট বুঝে সেদিন স্ট্রিটফুডেও জমতে পারে দুপুরের মজলিশ।
বিকেলের ঝোঁকে বো ব্যারাক 
খাওয়াদাওয়া শেষে ফুরফুরে মন নিয়ে পাড়ি দেব বো ব্যারাকে। বড়দিনের আগের রাত থেকে বো ব্যারাকের সারিবদ্ধ বাড়ি আর রাস্তা মোমবাতির আলোয় একসময় উজ্জ্বল হয়ে উঠত। বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থার কল্যাণে এখন সেখানে রঙিন আলোয় রাত নামে। এখানকার অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারগুলো বড়দিনে মেতে ওঠে খ্রিস্টীয় উৎসবে। কেক, ক্যারলের সুরে তখন বো ব্যারাক বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা আমেজে ধরা দেয়।
ধনুকের মতো বাঁকা নিজস্বতায় ভরপুর এক পাড়া এই বো ব্যারাক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লাল রঙের বাড়িগুলোয় মেস বানিয়ে মার্কিন সৈন্যদের রাখা হয়েছিল। কিন্তু পছন্দ না হওয়ায় তাঁরা চলে যান ফোর্ট উইলিয়ামে। পরে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারগুলো স্থায়ীভাবে এখানে বসতি স্থাপন করেন। বউবাজার থানার পিছনে এর অবস্থান। বড়দিনের সময় এখানে বিশাল উৎসব চলে।
নিউ মার্কেট ছাড়া ক্রিসমাস জমে!
শত মানুষের বড়দিনের কোলাহল মিছিলে শামিল হয়ে হগ মার্কেটে পৌঁছে কেকে কামড় দেব না তাও কি হয়! তখন সময় গড়িয়ে যাবে বিকেলে। নিউ মার্কেট থেকে ক্রিসমাস ট্রি আর কেক কিনব বাড়ির জন্য। আর তারপর সান্টাক্লজের টুপি মাথায় দিয়ে পৌঁছে যাব এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনে। সেখান থেকে অ্যাপবাইক ধরে বি বা দি বাগ।
শেষে বিকেলে সেন্ট জনস চার্চ
বি বা দি বাগে অবস্থিত সেন্ট জনস চার্চ কলকাতার প্রাচীনতম অ্যাঙ্গলিকান চার্চ। আজ যেখানে আমরা এই গির্জার দেখা পাই, সেখানে ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বারুদের গোডাউন। চারধারে ছিল পুরনো কিছু কবর। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল এই গির্জার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুন সেন্ট জনের জন্মদিনে এই গির্জার উদ্বোধন হয়। তাই এই গির্জার নাম সেন্ট জনস চার্চ।
চার্চের অভ্যন্তরে প্রার্থনা ঘর। গথিক স্থাপত্যের সাক্ষীবাহী হলঘরের প্রাচীনত্ব ঘিরে থাকবে আমাদের। পৌঁছে যাব অফিসঘরে। এর ডান দিকে রয়েছে ওয়ারেন হেস্টিংসের অফিসঘর। হেস্টিংস সাহেবের সই করা পোট্রেট, তাঁর ব্যবহৃত টেবিল-চেয়ার, ম্যান্টেল ঘড়ি, অজস্র পুরানো ছবি আর শংসাপত্র রয়েছে সেখানে। চার্চের বাঁদিকের দেওয়ালে তৎকালীন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জোহান জোফানির আঁকা তৈলচিত্র ‘দ্য লাস্ট সাপার’ অবশ্যই দেখব। ছবিটি দ্য ভিঞ্চির ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর সরাসরি অনুকরণ নয়। তারপর চলে আসব গির্জার বাইরের জমিতে। সেখানে অনেকগুলো স্মৃতিসৌধ, সমাধি সেদিন নীরবে শোনাবে তাদের ফেলে আসা অতীতের গল্প। হলওয়েল মনুমেন্ট, রোহিলা ওয়্যার মেমোরিয়াল, লর্ড ব্রেবর্ন, লেডি ক্যানিং, ভাইস অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসন, বেগম জনসন ও জোব চার্ণকের সমাধি সবই দেখে নেব।
দিনের শেষে এবার ফিরতে হবে বাড়ির পথে। ২৫ ডিসেম্বর সারাদিনের পরিকল্পনা করে আপনিও শহর ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ুন। বড়দিনের উৎসবে মাতোয়ারা কলকাতাকে দেখে যে কোনও দর্শনার্থীর মনে হতেই পারে, 
‘তারা কেবলই হাসে, কেবলই গায়, হাসিয়া খেলিয়া মরিতে চায়/ 
না জানে বেদন, না জানে রোদন, না জানে সাধের যাতনা যত।’
অরিন্দম ঘোষ
  ছবি: সায়ন চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ