


আর দিন দশেক পর বিশ্বকর্মা পুজো। বিশ্বকর্মা পুজো আর ঘুড়ির লড়াই সমার্থক। এইদিনটিতে কীভাবে আনন্দ করবে, জানাল পূর্ব বর্ধমান জেলার নবগ্রাম-ময়না পুলিনবিহারী উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। ছবিও আঁকল তারা।
রঙে রঙে আকাশ রঙিন
ঘুড়ির মেলা আমাদের কাছে একটা আনন্দ উৎসব। বিভিন্ন রঙের ঘুড়িতে আকাশ ছেয়ে যায়। রঙে রঙে আকাশ রঙিন হয়ে ওঠে। এমনই একটি ঘুড়ির উৎসব দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেখানে দেখি, সারি সারি ঘুড়ির দোকান। পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, ময়ূরপঙ্খী নানা ধরনের ঘুড়ি। আমি তো ঘুড়ির নাম জানি না। বাবা আমাকে বলে দিলেন। মাঠে দেখি সবাই ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। এমনকী, মেয়েরাও অংশ নিয়েছে। মেলার মাঠে খাবারেরও অনেক স্টল ছিল। বাবা আমাকে নানা রকম খাবার কিনে দিলেন। প্রতিযোগিতার শেষে দেখলাম, বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হল। সে বছর বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটি অন্য রকম কেটেছিল।
—অনুষ্কা সাধুখাঁ, অষ্টম শ্রেণি
শেষ পর্যন্ত পরাজয়
বিশ্বকর্মা পুজোর দিন নয়, দিনটা ছিল পয়লা মাঘ। প্রতিবছর ওই দিনটিতে সালানপুরে দামোদর নদের তীরে অনুষ্ঠিত হয় ঘুড়ির প্রতিযোগিতা। দু’জন করে একটি দল। আমি আর আমার বন্ধু শান্তনু গতবছর ওই কম্পিটিশনে যোগ দিয়েছিলাম। প্রায় চল্লিশটি দল অংশ নিয়েছিল। প্রতিযোগিতার নিয়ম যে দলের ঘুড়ি শেষ পর্যন্ত আকাশে উড়বে, তারা জয়ী। প্রতিযোগিতার শেষে মাত্র দু’টি ঘুড়ি ছিল আকাশে। একটা আমাদের, আর দ্বিতীয়টি অন্য দলের। শান্তনুর হাতে লাটাই আর সুতো আমার হাতে। দুটো ঘুড়িতে প্যাঁচ লাগল, আমি যেই সুতো ধরে টান দিলাম, আমাদের ঘুড়ি কেটে গেল। দ্বিতীয় স্থান পেয়ে আমরা প্রতিযোগিতা শেষ করলাম।
—বর্ষণ দত্ত, দশম শ্রেণি
মামার বাড়িতে মজা
বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটি বর্ধমানে মামার বাড়িতে কাটে। এবছরও তার অন্যথা হবে না। মামাদের সঙ্গে হইহই করে ছাদে ঘুড়ি ওড়াব। দুপুরে থাকবে মাংস-ভাত। একেবারে উৎসবের মেজাজ। এদিন ঘুড়ির লড়াই একেবারে যুদ্ধের রূপ নেয়। চাঁদিয়াল বনাম সিঁদুরমুখীর লড়াই, বগ্গা বনাম মোমবাতির লড়াই। একেবারে জমজমাট যুদ্ধ। লড়াই করতে গেলে যেমন অস্ত্র লাগে, এই লড়াইয়ে অস্ত্র মাঞ্জা সুতো। আগে মামারা নিজেরা মাঞ্জা দিত। এখন অবশ্য অত ঝঞ্ঝাট না করে ঘুড়ির সুতো কিনে নেওয়া হয়। আমি সবসময় লাটাই ধরার কাজটা করি। এবার নিজের হাতে ঘুড়ি ওড়ানোর ইচ্ছা আছে।
—প্রীতম ঘোষ, অষ্টম শ্রেণি
জোর প্রতিযোগিতা
বিশ্বকর্মা পুজো শুনেই গত বছরের কথা মনে পড়ে গেল। নবগ্রাম বল গ্রাউন্ডে আয়োজন করা হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা। ওইদিন সকাল থেকেই বন্ধুদের সঙ্গে আমি মাঠে হাজির ছিলাম। আশপাশের ময়না, ধুলুক, জৌগ্রাম, ঝাঁপানডাঙা থেকেও প্রতিযোগীরা অংশ নিয়েছিল। নবগ্রাম কমিউনিটি হলের তরফে প্রতিযোগীদের ঘুড়ি ও লাটাই দেওয়া হয়। শুরুতেই ধুলুক ও জৌগ্রামের মধ্যে টরেটক্কা লড়াই শুরু হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিতে যায় ধুলুকের প্রতিযোগীরা। নবগ্রাম প্রথমদিকে খুবই খারাপ ঘুড়ি ওড়ালেও মাঝে প্রতিযোগিতায় ফিরে আসে। অবশ্য, সেই লড়াই শেষপর্যন্ত কাজে আসেনি, ভোকাট্টা হয়ে যায় নবগ্রামের প্রতিযোগীরা। সেই টান টান প্রতিযোগিতার কথা সারা জীবন মনে রাখব।
—অনুভব দাঁ, দশম শ্রেণি
লাট খেয়ে পড়ে গেল
ঘুড়ি আমি ওড়াতে পারি না। কিন্তু ঘুড়ি ওড়া দেখলে খুব ভালো লাগে। আকাশের গায়ে ঘুড়ি উড়তে দেখলে মন কেমন হয়ে যায়। মনে হয়, ঘুড়ির মতো আমিও উড়ে যাই। যাইহোক, গত বছর বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটা ছিলাম মামার বাড়িতে। মামা তার বন্ধুদের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল। দেখে আমারও খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ হল। মামাকে বলতেই সুতো আমার হাতে ধরিয়ে দিল। মাটি থেকে ঘুড়ি ওড়াব কী! বার বার তো লাট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। শেষে রেগেমেগে আমি হাল ছেড়ে দিলাম। আমার আর ঘুড়ি ওড়ানো হল না।
—ভাস্বতী পাল, নবম শ্রেণি
ঘুড়ি কাটলেই মনখারাপ
আমি তো ঘুড়ি ওড়াতে না পারলেও বন্ধুদের সঙ্গ দিই। আমাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে এক কাকিমার বাড়ির ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। সেখানে আমার বন্ধুরা ঘুড়ি ওড়ায়। গত বছর বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ওই কাকিমার বাড়ি গিয়েছিলাম। আকাশে রংবেরঙের ঘুড়ি দেখে খুব ভালো লাগছিল। আমার দুই বন্ধুর ঘুড়িতে প্যাঁচ লেগে গেল। যথারীতি একজনের ঘুড়ি কেটে গেল। যার ঘুড়ি কেটে গেল, তার এত মনখারাপ হয়ে গেল কী বলব! ‘আজ ও জিতেছে, কাল হয়তো তুই জিতবি’— এই বলে সেই বন্ধুকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম।
—সাবানা মোল্লা, পঞ্চম শ্রেণি
ঘুড়ি লুটতে ছুট
ভোকাট্টা শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাটা ঘুড়ির পিছনে ছুট। ঘুড়ি লুটতে কে না ভালোবাসে। আমার পিসিবাড়ি যে গ্রামে সেখানে ঘুড়ির রমরমা খুব বেশি। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ঘুড়িতে ঘুড়িতে আকাশ ঢেকে যায়। সবাই বাড়ির ছাদ থেকে ঘুড়ি ওড়ায়। আবার অপরের ঘুড়ি কাটতে পারলে ভোকাট্টা চিৎকারের সঙ্গে কাঁসরঘণ্টা বাজাতে শুরু করে। পিসির বাড়ির এলাকায় ঘুড়ির লড়াই দেখে আমার খুব মজা লেগেছিল। বিশ্বকর্মা পুজো এসে গেলে মনে হয় দুর্গাপুজো দরজায় কড়া নাড়ছে। এবছর তো পুজোও অনেকটা এগিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে মাঠে কাশফুল সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে হাজির হয়েছে।
—শাশ্বত ঘোষ, ষষ্ঠ শ্রেণি
প্রধান শিক্ষকের কলমে, নবগ্রাম-ময়না পুলিনবিহারী উচ্চ বিদ্যালয়
চারদিকে শুধু সবুজ। তারই মাঝে উঁকি দিচ্ছে শরতের কাশ আর পদ্মফুল। প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা একটি ছবি। পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর ব্লকের একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম— নবগ্রাম। আগে এই জায়গার নাম ছিল শ্যামসুন্দরবাটী। এখানেই রয়েছে চারশো বছরের পুরনো রাধাগোবিন্দ মন্দির। যা এখানকার বৈষ্ণব ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। বর্ধমানের মহারাজা মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
প্রায় ১০৯ বছর আগের কথা। এই এলাকার নিরক্ষরতার অন্ধকার ঘোচাতে এগিয়ে এলেন কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী মানুষ। তাঁদের হাত ধরলেন গ্রামবাসীরাও। ১৯১৬ সালের ২ জানুয়ারি শুরু হল পথচলা। নামকরণ হল— নবগ্রাম-ময়না পুলিনবিহারী মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়। প্রথম থেকেই স্কুলটি কো-এড। ১৯৬১ সালে মাধ্যমিক এবং ২০০২ সালে কলা ও বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে শুরু হয় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পঠনপাঠন। আছে ভোকেশনাল নানা কোর্স। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নবগ্রাম, ময়না, মুশুণ্ডা ও ধুলুক গ্রামের মানুষজন বিদ্যালয়ের নতুন ভবন তৈরিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১ হাজার ২০০।
ঝাঁ চকচকে স্কুলটি ২০২২ সালে পেয়েছে নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কার। বিদ্যালয়ের দেওয়াল জুড়ে আছে শিল্পকলার অপূর্ব ছোঁয়া। শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখতে রয়েছে শিশু সংসদ। পড়ুয়াদের জন্য রয়েছে কমন রুম ও পরিস্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা। রয়েছে মিড ডে মিলের সুন্দর ব্যবস্থা। স্কুলে ড্রপ আউট সংখ্যা শূন্য। বাল্য বিবাহ রোধেও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীরা সদা তৎপর। খেলাধুলো থেকে সংস্কৃতিচর্চা সবক্ষেত্রেই এখানাকার পড়ুয়ারা পারদর্শী।
শতবর্ষ প্রাচীন এই বিদ্যালয়ে বহু গুণী মানুষের পদধূল্যি ধন্য। তাঁদের মধ্যে অন্যতম— সঙ্গীত সাধক শান্তিদেব ঘোষ, সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা, স্বামী দিব্যানন্দ মহারাজ। শিক্ষাঙ্গনটি সুন্দরভাবে পরিচালিত হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে প্রত্যেকের নিরলস পরিশ্রম। তবে, বর্তমানে কিছু সমস্যা রয়েছে। কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষকের অভাব রয়েছে। কয়েকটি ক্লাস রুমের ছাদের অবস্থা ভালো নয়। খেলার মাঠটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা প্রয়োজন। আশা করি, সমস্যা কাটিয়ে এই স্কুল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
—মিলনকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রধান শিক্ষক
সংকলক: শম্পা সরকার
ছবি: দীপেশ মুখোপাধ্যায়