নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: ছবির গ্ৰাম খোয়াব গাঁ। মাটির বাড়ির দেওয়াল এখানে ক্যানভাস। সেখানে ফুটে উঠেছে জঙ্গল, বনের পশুপাখি ও দেবদেবীর ছবি। গ্ৰামের লোধা-শবররা মনের আনন্দে বাড়ির দেওয়ালে ছবি আঁকেন। শিকারীর হাতে উঠেছে রং-তুলি। খোয়াব গাঁ দেখতে পর্যটকরা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন।
গ্রামের আসল নাম লালাবাজার। ঝাড়গ্রাম থেকে দূরত্ব চার কিলোমিটার। সেখানে লোধা-শবর উপজাতি ও জনজাতি পরিবারের মানুষজন বসবাস করেন। এদিকে, জঙ্গলের পরিসর ক্রমশ ছোট হয়ে এসেছে। জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠ, পাতা ও কন্দ পাওয়া যায় না। চিরাচরিত শিকারের জীবিকা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে গ্ৰামবাসীরা ধীরেধীরে খেতমজুর বা দিনমজুরের পেশা বাছতে বাধ্য হয়েছেন। তবে, তাঁরা বংশপরম্পরায় স্বাধীন জীবনযাপনের কথা ভুলতে পারেননি। গ্ৰামবাসীদের কথায়, এই গ্ৰামে দূর দেশ থেকে কিছু শিল্পী এসেছিলেন। মাটিলেপা সুন্দর দেওয়ালে তাঁরা ছবি আঁকতেন। গ্রামবাসীরা সেই শিল্পীদের থেকে ছবি আঁকা শিখে নেন। তার পাশাপাশি গ্ৰামের লোধা-শবররা মুখোশ ও বাঁশের নানা জিনিসপত্র বানাতে শুরু করেন। বাইরে থেকে আসা পর্যটকরা গ্ৰামে মাটির দেওয়ালে আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হন। তাঁরা লোধা-শবরদের তৈরি জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যান। ক্রমশ মুখে মুখে খোয়াব গাঁয়ের নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। জঙ্গল হারিয়ে গ্ৰামের বাসিন্দারা নিজেদের ভূমিকে চিনতে পারছেন। সেই গ্ৰাম এখন বহু মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানো, বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। বিদেশ থেকে পর্যটকরা এখানে আসছেন। রাজ্যের নানা শিল্প সংগঠনের তরফে গ্ৰামে নিয়মিত ছবি আঁকার কর্মশালার আয়োজন করা হয়। সেখানে শহরের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে লোধা-শবরদের ছোট ছেলে-মেয়েরাও অংশ নেয়। ভেঙে যায় সমস্ত বাধা। মাটির দেওয়ালে ফুটে ওঠে তাদের গাছপালা, বুনো ফুল, হাতির পালের ছবি। প্রশাসনিক স্তরে লোধা-শবরদের মূল স্রোতে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। ছবির গ্ৰাম খোয়াব গাঁ সেখানে সকলকে মিলিয়ে দিচ্ছে। জেলায় প্রবাদ বাক্য হয়ে উঠেছে– ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, খোয়াব গাঁয়ে লোধা-শবর’। গ্ৰামের বাসিন্দা ও শিল্পী ষষ্ঠী আহির বলেন, আমাদের খোয়াব গাঁয়ের প্রতিটি মাটির বাড়ির দেওয়াল ছবিতে ভরে উঠেছে। গ্ৰামে লোধা-শবর ও জনজাতি সম্প্রদায়ের বসবাস। জঙ্গলের মধ্যেই আমরা বড় হয়েছি। জঙ্গল ছোট হয়ে আসায় আমরা বাসভূমি হারাচ্ছি। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার যে আনন্দ, তা হারিয়ে গিয়েছিল। গ্ৰামের বাসিন্দারা ছবি আঁকার মধ্যে দিয়ে আবার মুক্ত জীবনের স্বাদ খুঁজে পাচ্ছেন। গ্ৰামের ছোট ছেলে-মেয়েরা ছবি আঁকায় দক্ষ হয়ে উঠেছে। আমাদের শুধু দাবি, গ্ৰামের সামনে বড় একটি গেট তৈরি ও বসার জায়গার ব্যবস্থা করা হোক। দাবি দু’টি পূরণ হলেই আমরা খুশি হব।
ঝাড়গ্রাম জেলা পর্যটন দপ্তরের আধিকারিক বিধান ঘোষ বলেন, খোয়াব গাঁকে পর্যটনস্থল হিসেবে গড়ে তোলা যায় কি না, দেখা হবে। পরিকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। জেলা পরিষদের সভাধিপতি চিন্ময়ী মারাণ্ডি বলেন, যাঁরা মুখোশ ও বাঁশের জিনিসপত্র তৈরি করছেন, তাঁদের যাতে আর্টিজেন কার্ড দেওয়া যায়, তা দেখা হবে। নিজস্ব চিত্র