ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: আমার কি এই কাজটা করা উচিত? যখনই এই প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করবে তখন তিনটি আরও প্রশ্ন নিজের মনকেই করতে হবে। কেন আমি সেটা করছি? এর ফল কী হতে পারে? আর আমি সাফল্য পাব তো? এই তিন প্রশ্নের উত্তর আপনি নিজেই জানেন। এর উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তাহলে এগিয়ে যান। দীর্ঘ জীবনে এমন সিদ্ধান্ত আমাদের সকলকে বার বার নিতে হয়। আর সেই সিদ্ধান্ত থেকে যাতে পিছু না হটি, সে জন্যই কয়েক হাজার বছর আগেই কিছু নির্দেশিকা দিয়ে গিয়েছিলেন চাণক্য। যাঁকে আমরা চিনেছি ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’-র জন্য। অবশ্য তাঁর সেই শাস্ত্র আমার আপনার মতো সাধারণের জন্য ছিল না। তৎকালীন ভূ-ভারতে প্রথম কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্য গড়ে তোলার জন্য তাঁর সেই নীতি অবলম্বন করেছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। অর্থশাস্ত্র শুধু অর্থনীতিকেই সুদৃঢ় করেছিল এমন নয়। তার থেকেও সেই পুঁথির গুরুত্ব ছিল রাজনৈতিক। সাধারণ এক দাসির ছেলে থেকে চন্দ্রগুপ্ত হয়ে উঠেছিলেন মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট। ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে প্রথম সাম্রাজ্য। যার বিস্তার ছিল আফগানিস্তান থেকে দক্ষিণের কর্ণাটক পর্যন্ত। তবে এই সাম্রাজ্য গড়ে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা। যা আজকের ভারতবর্ষও মেনে চলছে।
মৌর্য সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পিছনে ছিলেন চাণক্য তথা বিষ্ণুগুপ্ত। বলা যেতে পারে, নিজের লেখা অর্থশাস্ত্রের প্রথম প্রয়োগ তিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উপরই করেছিলেন। তরুণ বিদ্রোহী এক যুবককে হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন কীভাবে ক্ষমতা দখল করতে হয়। শুধু বীরত্ব থাকলেই হয় না। তার সঙ্গে দরকার বুদ্ধির। ঠিক কোন সময় সেই বীরত্ব দেখালে তা বিফলে যাবে না, সেটা ঠিক করে বুদ্ধি। আর সেটাই সাফল্যের পথকে আরও প্রশস্ত করে, তার অনুকূল পরিকাঠামো তৈরি করে।
খ্রিস্টপূর্ব প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর। শক্তিশালী মগধে তখন নন্দ বংশের রাজত্ব। তবে ব্যাভিচারী বিলাসপ্রিয় রাজা ধননন্দের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল নিতান্তই এক তরুণ চন্দ্রগুপ্ত। দাসির ছেলে, কূলের বিচারেও শূদ্র তথা নগণ্য। তাই তাঁর প্রতিবাদের কোপে চন্দ্রগুপ্তকে মগধের রাজধানী পাটলিপুত্র (অধুনা পাটনা) থেকে বিতাড়িত করা হল। অন্যদিকে শিক্ষিত ব্রাহ্মণ বিষ্ণুগুপ্ত তক্ষশিলায় থাকতেন শাস্ত্রচর্চা নিয়ে। এক রাজা কীভাবে তাঁর এই সাম্রাজ্যের শাসনকালকে আরও শক্তিশালী করে তুলবেন, তা নিয়েই অর্থশাস্ত্র লিখলেন চাণক্য তথা বিষ্ণুগুপ্ত। অত্যাচারী ধননন্দ যাতে পুনরায় সঠিক রাস্তায় ফেরেন, সেই জন্য চাণক্য চেয়েছিলেন যে তিনি মহারাজকে তাঁর সেই শাস্ত্র উপহার দেবেন। বোঝাবেন যে সফল রাজা হতে গেলে কী করতে হয়। সেইমতোই মগধ অধিপতির দরবারে সাধারণ ভিক্ষুক হয়ে কৃপাপ্রার্থনার জন্য যান চাণক্য। বিলাসপ্রিয় ধননন্দ চাণক্যে কথায় কর্ণপাত না করে নাচ-গান নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। সেইসময় শাস্ত্রজ্ঞানের কথা উঠতেই রেগে যান ধননন্দ। দরিদ্র ব্রাহ্মণ হয়ে একজন রাজাকে নীতিজ্ঞান! ধননন্দ সভা থেকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন চাণক্যকে। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মগধের শক্তিশালী রাজা হয়ে কোনও ভিক্ষুক ব্রাহ্মণের কাছ থেকে তাঁর পরামর্শ নেওয়ার দরকার নেই। এমনকী চাণক্যের এই দুঃসাহসের জন্য তাঁকে তীব্র ভর্ৎসনাও করেন। সেই অপমানই আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে বিষ্ণুগুপ্তকে। ঠিক করেন যে, নন্দ বংশকে ধ্বংস করবেন। আর হাতের কাছে পেয়ে যান চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মতো একজন শিষ্যকে। চন্দ্রগুপ্ত শূদ্র হলেও স্বপ্ন দেখতেন রাজা হওয়ার। তাঁর সেই স্বপ্নকেই সার্থক করার সংকল্প নেন চাণক্য বিষ্ণুগুপ্ত। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে এই দুই ব্যক্তির দৌলতেই শুরু হয়েছিল রাজনীতির কুটিল খেলা। ক্ষমতা দখলের পিছনে বীরত্বের সঙ্গে রাজনীতির কৌশল আসলে যে কী, তা হাজার দুয়েক বছর আগেই দেখিয়ে গিয়েছিলেন চাণক্য।
আজ এত বছর পরও যখন ক্ষমতাসীন কোনও দলকে কৌশলের গেরোয় রাজ্যের শাসক দল থেকে বিরোধীর আসনে নেমে যেতে হয়, তখন আমরা ভেবে নিই যে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা দখলকারী দলের বুদ্ধি ও টাকার কী জোর। বলার অপেক্ষা রাখে না গোয়া, অসম, মণিপুর বা মহারাষ্ট্র — ক্ষমতা দখলের খেলায় বিজেপি যেভাবে বিরোধী দলের বিধায়কদের হাত করে শাসক দলকেই গদিচ্যুত করেছিল, তা শুধু টাকা নয়, সঙ্গে ছিল বুদ্ধিরও খেলা। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী বিধায়কদের সঙ্গে সৌহার্দ বজায় রেখে এটা বোঝানো, যে দলে তাঁরা রয়েছেন তার কোনও ভবিষ্যৎ নেই। বরং বিজেপিতে এলে তবেই লাভ। সে আর্থিক দিক থেকে হোক বা রাজনৈতিক। ক্ষমতা দখলের এই যে কুটিল কারিগরি, তা আদতে কৌটিল্যেরই অবদান।
পাটলিপুত্র থেকে তখন দু’জনেই বিতাড়িত। শুরু হল ধননন্দের অত্যাচার ও ব্যাভিচার নিয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা। তাঁদের এটা বোঝানো যে এই রাজা মগধের সিংহাসনে থাকলে সেদিন খুব দূরে নয়, যখন আলেকজান্ডার গোটা ভূ-ভারতই দখল করে নেবে। এদিকে সেই সময় উত্তরের আফগানিস্তান, কাশ্মীর হয়ে পূর্বে মগধের দিকে অগ্রসর হচ্ছে আলেকজান্ডারের বাহিনী। গ্রিক মহানের লক্ষ্যই ছিল একের পর এক জনপদ দখল করা। চাণক্য করলেন কী, আলেকজান্ডারের সঙ্গে হাত মেলালেন। ধননন্দকে পরাস্ত করতে গ্রিকদের সবরকম সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তবে এর জন্য শর্ত হল, মগধের রাজা হবেন চন্দ্রগুপ্ত আর আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাসের মেয়ের সঙ্গে মগধের নয়া সম্রাটের বিয়ে দিতে হবে। চাণক্যের অভিসন্ধি আলেকজান্ডার বুঝতে পেরেছিলেন। তবে বিশ্বজয়ের নেশায় বুঁদ দিগ্বিজয়ী সেই প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। বরং চাণক্যকে তাঁর এই বুদ্ধির জন্য প্রশংসাই করেছিলেন। একদিকে সাধারণ মানুষের সমর্থন, অন্যদিকে গ্রিক সেনার বীরত্ব, দুয়ে মিলে মগধ জয় খুব বেশি দূর ছিল না। তবে বাধ সাধছিল ছোট ছোট রাজ্যগুলির বহু রাজাই। তাঁদের সেভাবে পাত্তা না দিলেও দক্ষিণ প্রান্তের সারিপুত্রর সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হন চাণক্য। প্রথম থেকেই চাণক্য চেয়েছিলেন যে, আর কোনও ছোট রাজ্য নয়। শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে হলে কেন্দ্রীয় শাসন আবশ্যক। তাতে যেমন বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াই করা যাবে, সেরকমই গৃহযুদ্ধও ঠেকানো সম্ভব। কারণ মগধরাজের দৌরাত্ম্য থাকলেও নানা প্রান্তের বিভিন্ন গণ বা রাজ্যের নিয়মকানুন ছিল স্বশাসিত। চাণক্য চেয়েছিলেন সবাইকে একই ছাতার তলায় নিয়ে আসতে। সারিপুত্রকে তিনি আশ্বাস দেন, মগধ দখলের পর তাঁর রাজ্যের দিকে কোনওভাবেই চন্দ্রগুপ্ত হাত বাড়াবেন না। এমনকী চন্দ্রগুপ্তের মতো তাঁকেও সমমর্যাদা এবং দ্বিতীয় রাজা হিসেবে মেনে নেওয়া হবে।
নির্দিষ্ট সেই দিন এল। মগধ দখল করলেন চন্দ্রগুপ্ত। মহল ছেড়ে পালানোর সময় খুন হলেন ধননন্দ। আর রাজ্যাভিষেকের দিন মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজা হলেন চন্দ্রগুপ্তই। কারণ চুক্তি অনুযায়ী দ্বিতীয় রাজা যাঁর হওয়ার ছিল, সেই সারিপুত্র প্রাসাদের ভিতরেই এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন। এর মাঝেই আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়েছে। আর ভারতীয় ভূখণ্ডে তাঁর যে সেনাবাহিনী ছিল তাঁরা নিজেদের মধ্যে লড়াইয়েই ব্যস্ত। যদিও আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাস ফের বিশ্বজয়ের খেলায় মেতেছিলেন। তবে মগধের দিকে তাকালেন না। কারণ মগধের সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গেই তিনি নিজের মেয়ে হেলেনার বিয়ে দিয়েছেন। সফল রাজা হতে গেলে যে কাঠখড় পোড়াতে হয়, তা সবই হাতে ধরে চন্দ্রগুপ্তকে শিখিয়েছিলেন চাণক্য। শুধু বীরত্ব থাকলে চলে না। চাই বুদ্ধি। আর শুধু বুদ্ধি থাকলেই চলে না। কখন, কোথায়, কীভাবে তার ব্যবহার করতে হবে সেটাই সাফল্যকে নিশ্চিত করে। চাণক্যের সেই শাস্ত্রের গুণেই দেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল প্রথম শক্তিশালী এক কেন্দ্রীয় শাসন।
চাণক্য পরবর্তী সময়ে ভূ-ভারতে একের পর শাসক এসেছে। ক্ষমতা দখল করেছে। চলেও গিয়েছে। তবে রাজনীতির সেই পাঠ হয়তো আজও বদলায়নি। সফলভাবে ক্ষমতা দখল করে টিকে থাকতে হলে চাণক্যনীতি অর্থাৎ বুদ্ধির জোরে কুটিলতার ব্যবহার সঠিক সময়েই প্রয়োজন। আজকের দিনে চাণক্যের মতো কেউ হয়তো নেই। তবে ক্ষমতা দখল এবং কেন্দ্রে টিকে থাকার জন্য যে যে পদক্ষেপ দরকার তা করে চলেছে বিজেপি। প্রথমে কোনও রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিরোধী দলের বিধায়কদের সমর্থন অর্জন। তা সে ইডি-সিবিআই করে হোক বা বিপুল অর্থের টোপ। নির্দিষ্ট সংখ্যায় সেই সমর্থন পৌঁছতেই বিধায়কদের নিয়ে কোনও গোপন আস্তানায় চলে যাওয়া। তারপর সুযোগ বুঝে সেইসব বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিরোধী ক্ষমতাসীন দলকে উৎখাত করে নিজে সে রাজ্যের শাসক হয়ে ওঠা। শুধু এটাই নয়। চাণক্যের রাজনৈতিক কৌশলের সবটাই প্রয়োগ করে চলেছে বিজেপি। গোটা দেশজুড়েই নানা রাজ্যের ক্ষেত্রেই চলছে সেই কৌশল। বিজেপি-বিরোধী শাসক দলকে চাপে রেখে অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করা, তারপর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশ্বাস দিয়ে বিরোধী বিধায়কদের সমর্থন অর্জন। আর ভোটের সময় হলে একইভাবে ভোটারদের মগজধোলাই। কখনও হিন্দুত্বের ধুয়ো তুলে বিভাজন নীতি তো কখনও ডাবল ইঞ্জিন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। যদিও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেটা এখনও করে উঠতে পারেনি গেরুয়া শিবির। আইন-শৃঙ্খলার ব্যর্থতার প্রশ্ন হোক বা দুর্নীতি। দেখা গিয়েছে সেই ২০১৪ থেকেই তৃণমূলের শক্তিশালী নেতাদের গরাদের পিছনে পাঠানো হয়েছে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এখনও অবধি পেরে ওঠেনি গেরুয়া আগ্রাসন। পাশের রাজ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন দল বিজেডি এবং নবীন পট্টনায়ককে পর্যন্ত উৎখাত করেছে বিজেপি। বাংলাতেও তারা কম খেলা খেলছে না। তবে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য চাণক্য প্রথমে মানুষের সমর্থন পেয়েছিলেন। তারপর এগিয়েছিলেন বিভিন্ন গণ অর্থাৎ রাজ্যের স্বশাসিত প্রধানদের সমর্থন কুড়োতে। গড়ে উঠেছিল এক সাম্রাজ্য। আজকের দিনে যাকে আমরা দেশ বলে চিহ্নিত করি। বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় দেশের শাসন ক্ষমতায় বিজেপি থাকলেও সব রাজ্যে তারা এখনও ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। সেই জন্যই হয়তো সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে রাজ্যগুলিকেও অস্থির করে তুলতে চাইছে। তবে আসল খেলা মানুষই খেলছে। বাংলার ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, শাসক দলকে যতই চাপে রাখার চেষ্টা চলুক না কেন, মানুষ কখনও গেরুয়া আগ্রাসনের বশবর্তী হবেন না। তাই চাণক্য পারলেও বিজেপির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।