Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কসবা কাণ্ড ও বিজেপির ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং

ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম। বাংলা অর্থ, অনুসন্ধানকারী দল। বিজেপির এই টিমের কী কাজ, কতটা গুরুত্ব জানা নেই। কিন্তু উদ্দেশ্য পরিষ্কার, রাজনৈতিক ফায়দা লোটা

কসবা কাণ্ড ও বিজেপির ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং
  • ৫ জুলাই, ২০২৫ ১৪:০৭
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম। বাংলা অর্থ, অনুসন্ধানকারী দল। বিজেপির এই টিমের কী কাজ, কতটা গুরুত্ব জানা নেই। কিন্তু উদ্দেশ্য পরিষ্কার, রাজনৈতিক ফায়দা লোটা। তাই আর জি করের ঘটনার সময়ে না এলেও কসবা কাণ্ডের অনুসন্ধান করতে চলে এসেছে। একথা সবাই মানবে, কসবার চেয়েও আর জি করের ঘটনা ছিল অনেক মর্মান্তিক, অনেক পৈশাচিক। ‘মিডিয়া ট্রায়ালে’র জেরে বিভ্রান্ত হয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ। আবেগ ও যুক্তির সংঘাত উঠেছিল চরমে। তবুও তখন বিজেপি ‘ফ্যাক্ট’ অনুসন্ধান করেনি। অথচ কসবা কাণ্ডে এফআইআর হওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হয়েছে। কী ঘটেছিল, তা স্পষ্ট। তাও বিজেপির টিম এল। অনেকে বলছেন, কসবা নয়, ধোঁয়াশা যদি কিছু থাকে তা রয়েছে কার্তিক মহারাজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ঘিরে। তাই ফ্যাক্ট অনুসন্ধানের জন্য বিজেপি সাংসদদের যাওয়া উচিত ছিল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায়। তাতে কার্তিক মহারাজ ভরসা পেতেন, আর ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম’ নামটাও সার্থক হতো। 

Advertisement

যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, খুন ডাকাতি ধর্ষণ বন্ধ হবে, এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। আবার এই ধরনের ঘটনা ঘটলে চুপ করে বসে থাকাও যায় না। তাই আন্দোলন, প্রতিবাদ হবে। তবে নেতাদের এমনটা ভাবার কারণ নেই যে গলার শিরা ফুলিয়ে ভাষণ দিলেই ভোটাররা তাঁদের কথায় প্রভাবিত হবেন। বরং সাধারণ মানুষ দেখে, প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন দল অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, নাকি রয়েছে তার শাস্তির পক্ষে। তার উপর ভিত্তি করেই মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়।
একথা ঠিক, ক্ষমতায় থাকলে শাসক দলে বেনোজল ঢুকবেই। জল ঘোলা করাই বেনোজলের কাজ। বেনোজলের দাপটে দলের স্বচ্ছতা নষ্ট হয়। তাই শাসক দল ‘বেনোজলে’র ব্যাপারে সতর্ক না থাকলে দিতে হয় খেসারত। কসবা ল কলেজের ঘটনার দায় রাজ্যের শাসক দল এড়াতে পারে না। বিশেষ করে স্থানীয় নেতৃত্ব। তাদের প্রশ্রয়েই মনোজিৎ-রা এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটানোর সাহস পেয়েছে। তবে, এই ঘটনার জন্য বিরোধীরা যেভাবে রাজ্য সরকার বা পুলিস প্রশাসনকে কাঠগড়ায় তুলতে চাইছে, তাতে খুব একটা সুবিধে হবে না। 
আর জি কর ও কসবার ঘটনার প্রকৃতি প্রায় এক হলেও প্রেক্ষিত ভিন্ন। আর জি করের ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। বাংলার চিকিৎসক কন্যার ধর্ষক ও খুনির শাস্তির দাবিতে রাজ্যবাসী সোচ্চার হয়েছিল। কিন্তু ক্ষোভ চরমে উঠেছিল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের ভূমিকায়। তিনি ছিলেন আর জি করের একচ্ছত্র সম্রাট। ভেবেছিলেন, গোটা বিষয়টাকে নিজেই ‘ম্যানেজ’ করে ফেলবেন। আর তাতেই মানুষের মনে নানান সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল। এমন সব তথ্য প্রচার করা হয়েছিল যাতে অভয়ার বাবা, মায়ের পক্ষে বিভ্রান্ত হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। তাঁরা মনে করেছিলেন, কলকাতা পুলিস তদন্ত করলে মেয়ের খুনি ও তার মদতদাতারা ছাড়া পেয়ে যাবে। তাই তাঁরা সিবিআই তদন্তের আর্জি জানিয়েছিলেন। কিন্তু, কসবা কাণ্ডে সেই বিভ্রান্তির জায়গাটা নেই।
কসবা কাণ্ডে পুলিস প্রথমেই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে। দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছে। শাসক দলের দু’একজন নেতার আলটপকা মন্তব্যে বিতর্ক তৈরি হলেও তৃণমূল কংগ্রেস দলীয়ভাবে এই ঘটনার নিন্দা ও দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, নির্যাতিতার পরিবার প্রথম থেকেই রাজ্য পুলিসে আস্থা রেখেছে। তাঁর পরিবার মনে করছে, রাজ্য পুলিসই দোষীদের শাস্তি সুনিশ্চিত করতে পারবে। তাই বিজেপি সহ বিরোধীরা সিবিআই তদন্তের দাবি জানালেও নির্যাতিতার পরিবার সেটা চাইছে না। কসবা কাণ্ড থেকে বিরোধীদের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্যাতিতার পরিবার। 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আর জি করের ঘটনায় গোটা দেশ উত্তাল হল, কিন্তু বিজেপি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম পাঠাল না। অথচ কসবা কাণ্ডে পাঠাল। কিন্তু কেন? তার প্রধান কারণ অবশ্যই বাংলার আসন্ন বিধানসভা ভোট। নির্বাচন এলেই দিল্লির নেতাদের বাংলায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি শুরু হয়ে যায়। পাশাপাশি কোনও ইস্যু পেলেই তাকে আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করে। ফলে কোনও ইস্যুই সেভাবে দানা বাঁধে না।
আর জি করের ঘটনাকে সামনে রেখে শাসকবিরোধী হাওয়া তোলার মরিয়া চেষ্টা হয়েছিল। তাতে মানুষ সাময়িক বিভ্রান্ত হলেও বিরোধীরা শেষপর্যন্ত সফল হয়নি। তার অন্যতম কারণ শাসকদলও দোষীর চরম শাস্তির দাবি জানিয়েছিল। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফাঁসির দাবিতে পদযাত্রা করেছিলেন। সিবিআই তদন্তভার নেওয়ায় অভয়ার পরিবারকে বিচার পাইয়ে দেওয়ার যাবতীয় দায় গিয়ে পড়েছিল তাদেরই উপর। তাতে জাস্টিসের দাবিতে বিজেপির বাজার গরম করার রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার উপর কেন্দ্রীয় এজেন্সি অভয়ার পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় আক্রমণের অভিমুখ তাদের দিকেই ঘুরে গিয়েছিল।
আর জি কর আন্দোলনের পিছনে ছিল বাম এবং অতি বামেদের মদত। তারজন্য প্রথম থেকেই তারা আন্দোলন ‘অরাজনৈতিক’ দাবি করে বিজেপির সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছিল ‘নো এন্ট্রি’ বোর্ড। তবে, অভয়ার পরিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাঁরা সেই সুযোগ পাননি। কারণ বিজেপি নেতৃত্ব বুঝে গিয়েছিল, আর জি কর ইস্যু থেকে তারা রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে পারবে না। উল্টে বামেরা পায়ের তলায় মাটি পাবে। তাতে ভোটের অঙ্কে ক্ষতি বিজেপিরই। তাই কথায় কথায় কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম পাঠাতে অভ্যস্ত বিজেপি ছিল নীরব।
আর জি কর আন্দোলনকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল ‘রাত দখল মঞ্চ’। তাদের ডাকেই শহরগুলিতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। সেই মঞ্চ কসবা ইস্যুতে মাঠে নামতেই বিজেপি তাদের ‘শাসক দলের দালাল’ আখ্যা দিয়েছে। এমনকী, মারামারিতে জড়িয়েছে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। কারণ উভয়েরই দাবি এক। ধর্ষকের কঠিনতম সাজা নিশ্চিত করতে হবে। তাতে তো লড়াইটা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে করারই কথা। কিন্তু সংঘাত কেন? 
বিজেপি বুঝেছে, এই আন্দোলনে রাত দখল 
মঞ্চ ঢুকে গেলে তাদের সামনে রাজনৈতিক ক্ষীর খাওয়ার যেটুকু সুযোগ রয়েছে, সেটাও হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই তারা ‘এ স্বাদের ভাগ হবে না’ থিওরি নিয়েছে। তবে বিজেপির রাগের একটা বড় কারণ আছে। তা হল, রাত দখল মঞ্চ কসবা কাণ্ডের প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি বিলকিস বানো, হাতরাসের মতো ঘটনাকেও সামনে এনেছে। তারা স্থান, কাল, পাত্র, রাজনৈতিক রং না দেখে সমস্ত ধর্ষককে একই সারিতে বসিয়েছে। তারা বিজেপির সামনে প্রশ্ন রেখেছে, যারা বিলকিস বানোর সাজাপ্রাপ্ত 
ধর্ষকদের পার্টি অফিসে বসিয়ে ফুলের মালা পরিয়ে সংবর্ধনা দেয় তাদের এই আন্দোলন করার অধিকার আছে কি না! এই প্রশ্নটা শুধু রাত জাগা মঞ্চের নয়, আম জনতারও।
বাম আমলেও বড় কোনও ঘটনা ঘটলে বাংলায় কেন্দ্রীয় টিম আসত। তা নিয়ে তখন বেশ হইচই পড়ে যেত। সেই টিমের রিপোর্টের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার কোনও কড়া পদক্ষেপ নেবে কি না, তা নিয়ে চলত জোর চর্চা। কিন্তু মোদি সরকারের আমলে বাংলায় কেন্দ্রীয় টিম আসাটা জলভাত হয়ে গিয়েছে। বঙ্গ বিজেপি নালিশ করলেই হল। চার্টার্ড প্লেন রেডি। চলে আসছে বিজেপির টিম। তাতে সাময়িক বাজার গরম হচ্ছে, কিন্তু লাভ হচ্ছে না। একই অস্ত্র বহুল ব্যবহারে হয়ে যায় ভোঁতা, কথাটা মনে রাখলে লাভ বঙ্গ বিজেপিরই। 
ধর্ষণ, খুনের মতো জঘন্যতম ঘটনাকে কোনও দিন সাধারণ মানুষ সমর্থন করেনি, করবেও না। কিন্তু রাজনীতির কারবারিরা দলীয় স্বার্থে তাদের পাশে দাঁড়ায়। তাতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পাপের ঘড়া পূর্ণ হলে নেমে আসে শাস্তির খাঁড়া, আছড়ে পড়ে জনরোষ। মনোজিতের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে বলেই আজ তার এই অবস্থা। তবে, শুধু মনোজিৎ বা তার সাগরেদদের শাস্তি দিলেই হবে না, সামনে আনতে হবে তাদের ‘গডফাদার’দেরও। তবেই শাসক পাবে প্রশাসকের মর্যাদা। আর মানুষ এটাই চায়। সেই কারণে এই চরম অবক্ষয়ের যুগেও ‘ভাবমূর্তি’ শব্দটি আজও অত্যন্ত মূল্যবান।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ