


নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: ‘দাদার মৃত্যুর সময়ও এতটা মানসিক চাপে পড়িনি। বাড়ির সামনে ১০০ জনের বেশি লোক জড়ো হয়েছে। সবাই জানতে চাইছে, কেন আমাদের নাম বিচারাধীন বলে লেখা হয়েছে? কী উত্তর দেব? আমার নিজের নামই তো বিচারাধীনের তালিকায়। আর পারছি না। মনে হচ্ছে সব ছেড়েছুড়ে কোথাও চলে যাই।’ শনিবার রাতে স্কুলের সহকর্মী মহম্মদ মকসুদ আলমকে প্রবল মানসিক অবসাদের মধ্যে কথাগুলি বলছিলেন কামারহাটির ৬৯ নম্বর বুথের বিএলও মহম্মদ তাহির (৫১)। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, রবিবার সকালে বাড়ির উঠোনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন তাহিরসাহেব। পরিবারের অভিযোগ, এসআইআরের কাজ করতে গিয়ে যে প্রবল মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল তাঁর উপর, তাতেই এই মর্মান্তিক পরিণতি।
কামারহাটি পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আনোয়ার বাগান এলাকার বাসিন্দা মহম্মদ তাহির। ওই এলাকায় স্বাধীনতার আগে প্রতিষ্ঠিত উর্দু প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তিনি। ৬৯ নম্বর বুথ তাঁর নিজের পাড়া। সেখানেই বিএলও ছিলেন তিনি। এছাড়া কামারহাটি এলাকার ৫৭ থেকে ৬৪ নম্বর বুথের বিএলও সুপারভাইজারও ছিলেন তিনি। তাহিরসাহেবের পরিবার উচ্চশিক্ষিত। তাঁর বড় দাদা অধ্যাপক ছিলেন। সেজো দাদা তৈয়ব নামানি ভৈরব গাঙ্গুলি কলেজের অধ্যাপক। এক ভাইঝি ডাক্তারি পড়ুয়া। পরোপকারি স্বভাবের জন্য সহকর্মী সহ বাকি বিএলওদের মধ্যেও জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। এক প্রবীণ বিএলও-কে এসআইআরের কাজে তিনি প্রভূত সাহায্য করেছিলেন। শনিবার ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, খসড়া তালিকায় থাকা প্রায় ৯৫০ ভোটারের মধ্যে প্রায় ২০০ ভোটারের নাম বিচারাধীন। এরপরই শুরু হয় তাঁর উপর অমানুষিক চাপ। মোবাইলে একের পর এক ফোন আসতে থাকে। বাড়ির সামনে জড়ো হন শতাধিক বিচারাধীন ভোটার। সব নথি জমা দেওয়ার পরও কেন তাঁদের নাম বিচারাধীন? তিনি মোবাইলে তাঁর নিজের নামও বিচারাধীন হিসেবে রয়েছে দেখিয়ে বিক্ষুব্ধদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলেছিলেন। রবিবার ভোর ৪টা নাগাদ পাশের মসজিদে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নামাজ পড়ে আসেন। এরপর বিশ্রাম নেন। সকাল ১০টা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আচমকাই বুকে হাত দিয়ে গড়িয়ে পড়েন তিনি। পাশে থাকা একজন তাঁকে ধরে নেন। দ্রুত তাঁকে সাগর দত্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। বিকেলে ঘরের উঠোনে শায়িত ছেলের দেহের পাশে চুপচাপ বসেছিলেন বৃদ্ধ হাজি মমতাজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা তো এই দেশের নাগরিক। আর আমার দেশের নির্বাচন কমিশনের অমানুষিক চাপে ছেলেটা শেষ হয়ে গেল। আমার ছেলেকে কমিশন ফিরিয়ে দিতে পারবে?’