নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: প্রতিমার পায়ে বেলকাঁটা ফুটিয়ে রক্ত বের করে চমকে দিয়েছিলেন সাধক কমলাকান্ত। সে বহু বছর আগের কথা। তারপর দামোদর দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গিয়েছে। জনপদের ছবিটাও বদলে গিয়েছে। কিন্তু এখনও বর্ধমানের বোরহাটে কমলাকান্ত কালীবাড়িতে কান পাতলে শোনা যায় নানা কাহিনী। কমলাকান্তের সেই কাঁটা ফোটানোর কথাও ভক্তদের মুখেমুখে ফেরে। মন্দির চত্বরের শান্ত পরিবেশ মনে যেন এক ভক্তিবোধ তৈরি করে। মায়ের রূপ দেখে ভক্তরা জোর হাত করে মনস্কামনা পূরণের প্রার্থনা করেন। ইচ্ছেপূরণ হওয়ায় মন্দির চত্বরে কালীপুজোর রাতে ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে। শুধু বর্ধমান শহর নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মন্দিরে আসেন। এমনকী, বাইরের জেলা থেকেও ভক্তরা এখানে এসে মায়ের পুজো দেন।
মন্দিরে পুজো দিতে এসেছিলেন পুলিশ লাইনের শর্মিলা সরকার। তিনি বলেন, সাধক কমলাকান্তের নানা অলৌকিক ঘটনার কথা সেই ছোট থেকে শুনে আসছি। তিনি এখানে সাধনা করেছিলেন। প্রতি অমবস্যায় তিনি নিজের হাতে মায়ের মূর্তি গড়তেন। মাগুর মাছের ভোগ মা’কে নিবেদন করা হতো। তাঁর সাধনা ছিল অন্যরকম। মা জীবিত প্রমাণ করতে তিনি মূর্তির পায়ে বেলকাঁটা ফুটিয়ে রক্ত বের করেছিলেন। তা দেখে বর্ধমানের মহারাজা অবাক হয়ে যান। আরেক পুণ্যার্থী শৈলেন সাঁতরা বলেন, মায়ের মাহাত্ম্য অনেক। এই মন্দিরে এসে অন্যরকম শান্তি পাই। কালীপুজোর দিন বা তার পরদিন বিভিন্ন জায়গায় যাই। তবে এই মন্দিরে আসা চাই-ই। মায়ের কাছে প্রার্থনা করে অনেক সমস্যা থেকে রেহাই পেয়েছি।
পূর্ব বর্ধমান জেলায় সাধক কমলাকান্তকে ঘিরে নানা কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। সাধকের জন্ম হয়েছিল পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ায়। পরে তিনি গলসির চান্না গ্রামে আসেন। এই গ্রামেই একসময় তৈরি হয়েছিল বিপ্লবীদের আখড়া। দেশবাসীকে স্বাধীনতার স্বাদ দিতে এই গ্রামে এসে বৈঠক করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। আবার চান্না গ্রামেই সাধনা করেছিলেন কমলাকান্ত। তাঁর কালী সাধনার কথা জানতে পেরে তাঁকে বর্ধমানে নিয়ে আসেন তৎকালীন বর্ধমানের মহারাজা। তাঁকে কালীপুজো করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
বোরহাটের লাকুর্ডিতে মহারাজা তাঁকে জমি দিয়েছিলেন। সেখানেই কমলাকান্ত সিদ্ধিলাভ করেন। জেলার বাসিন্দাদের কাছে এই মন্দিরের গুরুত্বই আলাদা। সারা বছরই এই মন্দিরে ভক্তরা আসেন। কালীপুজোর দিন দুপুরের পর থেকেই ভক্ত সমাগম বাড়তে থাকে। পরের দিনও মন্দির চত্বরে ভিড় উপচে পড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীরা লাইনে দাঁড়িয়ে মায়ের পুজো দেন। তাঁদের বিশ্বাস, মা এখানে জীবন্ত। তিনি ভক্তদের কথা শোনেন। সেই বিশ্বাসেই বছরের পর বছর ধরে কালীপুজোর দিন এখানে ব্যাপক ভক্ত সমাগম দেখা যায়।-নিজস্ব চিত্র