নিজস্ব প্রতিনিধি, চাপড়া (কলিঙ্গ): একনজরে দেখলে খুঁজে পাওয়া যাবে না সেই নদীকে। কোথায় সবুজ ঘাসের মাঠ। কোথাও আবার ধান চাষের জমিতে পরিণত হয়েছে নদী বক্ষ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে নদীর বিভিন্ন জায়গায় সামান্য জল জমে আছে। আল কেটে সেখানকার জল আনা হচ্ছে চাষের জমিতে। এমনই করুণ অবস্থা চাপড়ার কলিঙ্গ নদীর। চর দখল করে চাষবাসের কারণে তা হারিয়ে যেতে বসেছে। নদীর এই বেহাল দৃশ্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে পরিবেশকর্মীদের। কারণ, বিস্তির্ণ এলাকাজুড়ে এই নদীর চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। চাষের জমির পাশ দিয়েই কলিঙ্গ নদী সরু হয়ে ড্রেনে পরিণত হয়েছে। গ্রামবাসীদের কথায়, নদী চরের মাটি পলি পড়ে খুব উর্বর জমিতে পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সেই জমিতে ফসল খুব ভালো ফলে। বছরের এই সময়টা নদীর জল শুকিয়ে যায়। তাই নদীর চরেই চাষবাস করা হয়।
চাপড়া ব্লকের কলিঙ্গ গ্রাম পঞ্চায়েতের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে এই নদী। কয়েক মাস আগেও নদীতে বাঁধাল দিয়ে জল আটকে, তাতে মাছ চাষ করা হচ্ছিল। সম্প্রতি ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর অস্তিত্বটুকুও অবশিষ্ট নেই। শুধু পড়ে রয়েছে মাছ চাষের জন্য তৈরি করা বাঁশের বাঁধাল। পঞ্চায়েত সংলগ্ন কলিঙ্গ সেতুর উপর দাঁড়ালে দেখা যায়, দু’পাশে শুধুই ধান চাষের জমি। অনেক জায়গায় আবার নদী বক্ষে মাটি ফেলে উঁচু করে তারউপর চাষবাস করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে নদীর বক্ষের চাষের জমিগুলো ঘিরে দেওয়া হয়েছে জাল দিয়ে। কোথাও কোথাও নদীর উপর আড়াআড়িভাবে দুদিকে আল তৈরি করা হয়েছে। সেখানে নদীর জল ধরে রাখা হয়েছে। সেই জল দিয়েই চাষ করা হচ্ছে। গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, চাষের কাজে প্রয়োজনীয় জল আমরা পাইনা। মাটির নীচ থেকেও জল তোলা নিষেধ। তাই নদী উপর আল কেটে চাষের জলের যোগান মেটানো হয়। বর্ষাকালে নদীতে জল বাড়লে তখন আর চাষ করা হয়নি।
পরিবেশকর্মী শঙ্খ শুভ্র চক্রবর্তী বলেন, এইভাবে নদী দখল করে চাষ করা আইনত দণ্ডনীয়। কারণ নদীর গতিপথ এর ফলে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। নদীর উপর চাষবাস এইভাবে করলে নদীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। আগে কলিঙ্গ নদী নিয়ে অনেক জল যেত।ক্রমাগত বাধা পাওয়ার ফলেই নদীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। এইভাবে চলতে থাকলে গুরুত্বপূর্ণ এই নদীর আর অস্তিত্বই থাকবে না।
প্রসঙ্গত, চাপড়া ব্লকের অন্যতম নদী হলো এই কলিঙ্গ। গ্রামের উপর দিয়েই বয়ে চলা এই কলিঙ্গ নদীর উপরেই ভর করে বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহ করেন। চাপড়ার সীমানগরের কাছে জলঙ্গী নদী থেকে এই কলিঙ্গ নদী বেরিয়েছে। তারপর তা মাথাভাঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়েছে। গ্রামবাসী জনশ্রুতি রয়েছে, কলিঙ্গ গ্রামের আগে নাম ছিল সাধনি গ্রাম। একবার সেই গ্রামে নাকি ডাকাত পড়ে। ডাকাতদের হাতে থেকে গ্রামকে প্রতিহত করতে এক জোট হয়ে গ্রামের মৎস্যজীবীরা। গ্রাম বাঁচাতে মৎস্যজীবী মানুষেরা এক যোগে মাছ কাটার বটি নিয়ে নদীর বুকে নৌকা চালিয়ে অন্ধকারে ডাকাতদের উপর আক্রমণ করে। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ডাকাত দলের সর্দারকে হত্যা করে গ্রামবাসীর নদীর জলে ভাসিয়ে দেয়। সেই থেকেই এই গ্রাম ও নদীর নাম হয় কলিঙ্গ। যার অর্থ হল যোদ্ধা।