সুখেন্দু পাল , বর্ধমান:
সুখেন্দু পাল , বর্ধমান:
মা কালী মানেই উগ্রচণ্ডা, রুদ্ররূপা নন। তিনি যেমন অশুভশক্তি বিনাশের প্রতীক, তেমনই প্রেম-ভালোবাসারও দেবী। তাই তাঁর আর এক রূপ রটন্তী কালী বা কৃষ্ণকালী। আবির্ভুত হয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানির প্রেমকে অক্ষয়-অমর করে রাখতে। সেই পৌরাণিক কিংবদন্তীর সঙ্গে যেন হুবহু মিলে যায় বিদ্যাসুন্দরী কালীর অ্যাখ্যান। অসহায় এক প্রেমিক যুগলের পাশে দাঁড়িয়ে এই কালী পূরণ করেছিলেন তাঁদের মনোস্কামনা। আজও সেই প্রেম কাহিনি অমর।
বর্ধমানের তেজগঞ্জে রয়েছে বিদ্যাসুন্দরী কালী। রাজ আমলে প্রেমিক, প্রেমিকার জীবন বাঁচিয়ে ছিলেন তিনি। মন্দিরে কান পাতলেই শোনা যায় সেই কাহিনি। আজও প্রেমিক-প্রেমিকারা মায়ের কাছে আসেন একসঙ্গে জীবন গড়ার আশায়। কালীপুজোর সকাল থেকেই যুগলদের ভিড়। সবার দৃঢ বিশ্বাস, মা বিদ্যা এবং সুন্দরের মতো তাঁদের প্রেমকে পূর্ণতা দেবেন। মায়ের আর্শীবাদ থাকলে কোনও শক্তিই তাঁদের আটকাতে পারবে না। ঠিক যেভাবে শ্রীকৃষ্ণ-রাধার প্রেমকে শত চেষ্টাতেও আটকাতে পারেননি জটিলা-কুটিলা।
বৃহস্পতিবার মন্দিরে এসেছিলেন অনুরাধা চৌধুরী। তিনি বলছিলেন, ‘এই মা কালীর মাহাত্ম্যের কথা বহুদিন ধরে শুনে আসছি। বিশেষ করে এই মন্দির ঘিরে যে প্রম কাহিনি ছড়িয়ে রয়েছে, তা বেশ মনোগ্রাহী।’ কি সেই কাহিনি? কথিত, রাজকুমারী ছিলেন বিদ্যা। আর মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন সুন্দর। বিদ্যা মায়ের জন্য মালা গেঁথে মন্দিরে পাঠাতেন। সেই মালা পুজো করার সময় মায়ের গলায় দিতেন সুন্দর। তিনি বয়সে ছিলেন তরুণ। একদিন রাজবাড়ির মালিনীর কাছে জানতে চান, মায়ের জন্য মালা কে গাঁথেন? মালিনী জানান, রাজকন্যা বিদ্যা। তাঁকে একবার দেখার জন্য সুন্দর আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু মালিনী জানিয়ে দেন, রাজকন্যার সঙ্গে দেখা করা অসম্ভব। সুন্দর জেদ ধরেন। অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি বিদ্যার সঙ্গে দেখা করেন। প্রথম দর্শনেই একে অপরকে ভালো লেগে যায়।
তারপর দু’জনের প্রেম চলে প্রেমের নিজস্ব গতিতে। কিন্তু, প্রকাশ্যে বিষয়টি জানাজানি হলে রাজরোষে পড়তে হতে পারে। তাই, মন্দির থেকে রাজবাড়িতে যাওয়ার গোপন সুড়ঙ্গে বিদ্যা ও সুন্দর দেখা করতেন। তবে, বেশিদিন তাঁদের প্রেম গোপন থাকল না। রাজবাড়ির অন্দরমহলে কানাঘুষোর পাশাপাশি রাজাও জেনে যান মেয়ের প্রেমের কথা। বামুন হয়ে চাঁদে হাত! অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন রাজা। পেয়াদাদের ডেকে শাস্তির বিধান দেন তিনি। তাতে ঠিক হয়, দু’জনকেই মায়ের সামনে হাঁড়িকাঠে বলি দেওয়া হবে। রাজার আদেশ অমান্য করার সাধ্যি কার? যথারীতি খাঁড়ায় শান দিতে রাজ পরিবারের নির্ধারিত লোক হাজির হয়ে যান। প্রস্তুতি শেষ। এবার বিদ্যা ও সুন্দরকে ধরে বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে হাঁড়িকাঠের সামনে। বলি দিতে যাওয়ার মুহূর্তে খড়্গহাতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। বিদ্যা ও সুন্দর মুহূর্তের মধ্যেই বিলীন হয়ে যান। কথিত, মা কালী তাঁদের প্রাণ বাঁচিয়ে প্রেমকে রক্ষা করেছিলেন। এদিন, মন্দিরে ঘুরতে এসেছিলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রণজিৎ মণ্ডল। তিনি বলছিলেন, ‘এই মায়ের কথা অনেকদিন ধরেই শুনে আসছি। কালীপুজোর দিন বর্ধমানে থাকতে পারব না। আমার বাড়ি বীরভূমের ইলামবাজারে। সেখানে চলে যাব। পুজোর আগে মায়ের দর্শন করে গেলাম।’ এরপরই রণজিতের সংযোজন—‘সুন্দরের মতো আমারও একই সমস্যা। প্রেমিকার বাড়ির লোকজন মানতে চাইছেন না। মা যদি মনোস্কামনা পূরণ করেন।’ পাশেই ছিলেন প্রেমিকা। তিনি বলেন, ‘আমাদের চাওয়া-পাওয়া পূরণ হলে পরের বছর মায়ের কাছে এসে পুজো দিয়ে যাবো। মা বিদ্যা ও সুন্দরকে রক্ষা করেছেন। আমাদেরও ইচ্ছেপূরণ করবেন।’