Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

জুকু ভ্যালি

সে এক ঘোর বর্ষায় যাত্রা। সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজে কাকভোরে তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস উঠল তিস্তা নদীর সেতুর উপর। নীচে ভরা আষাঢ়ের যুবতী তিস্তা, মাথার উপর দামাল হওয়া, বাদল মেঘের ভীম গর্জন।

জুকু ভ্যালি
  • ২ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সে এক ঘোর বর্ষায় যাত্রা। সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজে কাকভোরে তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস উঠল তিস্তা নদীর সেতুর উপর। নীচে ভরা আষাঢ়ের যুবতী তিস্তা, মাথার উপর দামাল হওয়া, বাদল মেঘের ভীম গর্জন। এবার যাচ্ছি জুকু ভ্যালি। একদিকে মণিপুর, অপরপ্রান্তে নাগাল্যান্ড। মাঝখানে ঘন সবুজে মোড়া একফালি পাহাড়ি ভূখণ্ড। দুইপাশে দুই গরমাগরম প্রতিবেশীর মাঝে পড়ে স্যান্ডউইচ হয়ে যাওয়া জুকু ভ্যালির আসল সৌন্দর্য জুন-জুলাই মাসের বর্ষায়।

Advertisement

সকাল সকাল পৌঁছে গেলাম নিউ কোচবিহার স্টেশনে। যেতে হবে ডিমাপুর। কোচবিহার থেকে দুপুর ১.৩০ মিনিটে দিল্লি-ডিব্রুগড় ট্রেন ধরে প্রথমে গুয়াহাটি। সেখান থেকে আবার গুয়াহাটি-লেদো লাইনের ট্রেনে ডিমাপুর। সরাসরি কোচবিহার থেকে ডিমাপুরের ট্রেনে টিকিট না পাওয়ায় এত ঝামেলা। কোচবিহার থেকে দলে যোগ দিল একদল তরুণ সঙ্গী। জুকু ভ্যালির পুরো পরিকল্পনাটাই ওই তরুণ দলের অয়নের মস্তিষ্কপ্রসূত। ঝিপঝিপে বৃষ্টি আর ফিনফিনে ঠান্ডার মাঝে আলো আঁধারি পরিবেশ ভেদ করে ঘচাং শব্দে ট্রেন এসে দাঁড়াল ডিমাপুর স্টেশনে। কর্কশ গলায় চাওয়ালা হাঁক দেয় ‘গরম চায়ে’। এই প্রথম নাগাল্যান্ডের মাটিতে পা রাখা। প্ল্যাটফর্মে নেমেই চোখ আটকে যায় অন্যরকম কিছু দেখে। স্টেশন চত্বরটা সাজানো বাঁশ বেতের তৈরি অপূর্ব সব শিল্পসামগ্রী দিয়ে।
ইতিমধ্যে হোম স্টে-র পাঠানো গাড়িও হাজির। হইহই করে সবাই বসে পড়ি পছন্দের সিটে। আজ যাব নাগাল্যান্ডের প্রত্যন্ত এক গ্রাম কিগেমা পর্যন্ত। ভোরের ডিমাপুরের বুক চিরে গাড়ি ছুটছে দুরন্ত গতিতে। ডিমাপুর নাগাল্যান্ডের বেশ বড় শহর। বলা যায় বাণিজ্য রাজধানী। ডিমাপুর থেকে কোহিমা হয়ে কিগেমার দূরত্ব মোটামুটি ৮০-৮৫ কিমি হবে। এরকম সুন্দর রাস্তা হলে ঘণ্টা তিনেক লাগার কথা। কিন্তু সামনে রাস্তার মেরামতির কাজ চলায় সরু রাস্তা ধরতে হল।  গ্রামের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। রাস্তার দু’পাশে মরশুমি ফলের অস্থায়ী দোকানে প্রচুর তাজা ফল। বিশেষত তাজা আনারসের স্বাদ নিতে নিতে অবশেষে কিগেমা পৌঁছলাম দুপুর দুপুর।
গাড়ির রাস্তা থেকে একটু ভিতরে পিছনে খাড়া পাহাড়ের নীচে আমাদের বাড়ি। একদিকে হোম স্টে-র মালকিন রাভি দিদি সপরিবার বাস করে, আর একদিকে আমাদের থাকার জায়গা। তিনটে শোয়ার ঘর, সামনে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বসার জায়গা, ডাইনিং এরিয়া— সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ 
আলাদা ব্লক।
পরদিন সকাল ৭টার মধ্যে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জুকু এন্ট্রি পয়েন্টের উদ্দেশে। মাঝপথে বছর পঁচিশের আতো যোগ দিল। দিনপ্রতি দেড় হাজার টাকা হিসাবে আতো আমাদের পথপ্রদর্শকের কাজ করবে। জুকু ভ্যালিতে যাওয়া যায় দু’দিক দিয়ে। প্রথম রাস্তাটা গিয়েছে ভিস্বেমা গ্রাম থেকে, যে রাস্তা ধরে আমরা যাচ্ছি। অপর রাস্তাটা শুরু হয়েছে ভিস্বেমার কিছুটা আগে জাখামা নামক জায়গা থেকে। জাখামার পথের চড়াই খুব বেশি, রাস্তাও অত্যধিক জঙ্গলাকীর্ণ। পথ হারানোর সম্ভাবনাও আছে। তাই বেশিরভাগ ভ্রমণার্থী ভিস্বেমার রাস্তাটাই পছন্দ করেন। কিছু দূর গিয়েই জুকু ভ্যালি এন্ট্রি পয়েন্ট। মাথাপিছু প্রবেশমূল্য একশো টাকা। পরিচ্ছন্নতার জন্য অতিরিক্ত কুড়ি টাকা। সঙ্গে ক্যামেরা থাকলে আরও দুশো টাকা। সবার এন্ট্রি পাস জোগাড় করে আবার উঠে বসলাম ওই গাড়িতেই। এন্ট্রি পয়েন্ট থেকে গাড়ি (টাটা সুমো) যায় আরও ৮ কিমি। যেখান থেকে হাঁটা শুরু হয়। তবে এই রাস্তায় (নামেই রাস্তা) শুধু রিজার্ভড গাড়িই চলাচল করে। হোম স্টে-র ঠিক করে দেওয়া গাড়িতে এগিয়ে চললাম যতদূর যাওয়া যায়। অবশেষে একটা সমতল জায়গায় গাড়ি থামলে হাঁটা শুরু হল সকাল ৯.৩০টায়। প্রথমে কিছুটা হাল্কা চড়াই পেড়িয়ে শুরু হল একদম খাড়া রাস্তা। বড় বড় পাথরের চাঙর দিয়ে বানানো হয়েছে সিঁড়ি। প্রায় পেটের কাছে হাঁটু তুললে তবেই পরের ধাপের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে। চতুর্দিকে ঘন জঙ্গল। গায়ে শ্যাওলা ধরা বয়স্ক সব গাছ। মাঝে মাঝে গাছের গায়ে বেতের ঝুড়ি বাঁধা। প্লাস্টিকের প্যাকেট বা বোতল ফেলার জন্য। প্রচণ্ড বর্ষায় যেখানে সেখানে গাছ উপড়ে পড়ে রয়েছে। পচা পাতা, কাদা, ফার্ন চারায় ঢাকা সবুজ পিচ্ছিল পথ ধরে এগতে হচ্ছে। এদিকে মাথার উপর কালাহারি জলভর্তি মেঘ। মাঝে মাঝে গোলাগুলি চলছে। যে কোনও সময় জল বিস্ফোরণ ঘটবে মনে হয়।
অবশেষে একটা সমতল জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। নীচের রাস্তা সমেত গোটা জঙ্গলটা ঘন কুয়াশায় ঢাকা। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। এবার রাস্তা অন্যরকম। চড়াই শেষ হয়েছে। একদিকে পাহাড়ের গা ধরে মোটামুটি সমতল রাস্তা। সামনের পাহাড়ের ঢেউগুলো দেখা যাচ্ছে। পথের দু’পাশে মানুষ সমান সরু সরু বাঁশের জঙ্গল। কোথাও বা বাঁশের জঙ্গলের সুড়ঙ্গ পার হতে হচ্ছে। আবার মাঝে মাঝে পাহাড়ি ঝোরা পার হওয়ার মজা। আশঙ্কা মতো শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি। বর্ষাতি পরে বৃষ্টি থেকে বাঁচার প্রয়াস আমাদের। রাস্তায় গোড়ালি ডুবে যাওয়া কাদা। দু’দিকের বাঁশ গাছ ধরে দেহের ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে। দূরে মেঘ কুয়াশার মধ্যে দৃশ্যমান হয় দাবানলে পুড়ে যাওয়া সব গাছের নিঃসাড় কাঠামো। অবশেষে যখন জুকু ভ্যালির স্বাগত তোরণের সামনে পৌঁছলাম তখন সকলের গোরু হারানোর মতো অবস্থা।
জুকু ভ্যালিতে থাকার জায়গা অপ্রতুল। ‘দক্ষিণ অঙ্গামী যুব সংগঠন’- নামে সংস্থাটি পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার এবং অন্যান্য পরিষেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ওদেরই পরিচালনায় রয়েছে একটা বড়সড় ডর্মিটারি। সেখানে থাকা যায় মাথাপিছু একশো টাকা দিয়ে। তাঁবুতে থাকতে হলে গুনতে হবে জনপ্রতি পাঁচশো টাকা। কিগেমার হোম স্টে আমাদের জন্য আলাদা কটেজের ব্যবস্থা করেছে। ঘর লাগোয়া টয়লেট বিছানাপত্র সবকিছু থাকলেও পরিচ্ছন্নতার লেশমাত্র নেই। আর নেই সৌরশক্তি চালিত দু-একটা বাতিস্তম্ভ ছাড়া বিদ্যুৎ। পরিচ্ছন্নতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সবেমাত্র থিতু হয়ে বসেছি।  গাইড আতো ছেলেটি সবার জন্য গরম চা নিয়ে এসেছে। হঠাৎ আবার যেন প্রলয় শুরু হল। পাহাড় জুড়ে চমকানো মেঘ জমেছে। মেঘের বুক চিরে নীল শিরা জেগে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। গাছগুলো মাথা নাড়ছে খুব আস্তে আস্তে। একটা প্রলয়ের অপেক্ষা। হঠাৎ হইহই করে হাজার মেঘাসুর যেন আছড়ে পড়ল জুকুর মাথায়। গাছের ঝুঁটি ধরে উপড়ে ফেলতে চাইছে। মুর্হূমুহূ কামানের গোলার মতো বাজ পড়ছে। হাড় হিম করা ঠান্ডায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি প্রলয়কাণ্ড। গভীর রাতে বৃষ্টি থেমেছে। রাতের পতঙ্গের সঙ্গে আমিও জেগে উঠেছি। ঝিঁঝিঁ ডাকছে একটানা। চারদিক রহস্যময় হয়ে উঠেছে। রাত হয়ে ওঠে গভীর। আমরা ঘরে যাই।
সকালে উঠে দেখি আকাশ পরিষ্কার। চারদিক আলোয় ঝলমল করছে। সূর্যের হাল্কা আলোয় গতরাতের বৃষ্টির দানাগুলো হীরের অলঙ্কার হয়ে শোভা পাচ্ছে। দূরে পাহাড়ের মাথায় একটা সাদা ক্রস দেখা যাচ্ছে। সেইদিকে তাকিয়ে হেলিপ্যাড পেড়িয়ে ঢুকে পড়েছি জুকু উপত্যকার অন্দরেমহলে। চারদিকে সোনা রোদ্দুর সবুজ উপত্যকাকে ধুয়ে দিচ্ছে। চকিতে রোদ, চকিতে কালো মেঘের মাখামাখি দেখতে দেখতে একসময় পৌঁছে যাই গন্তব্যস্থলে। ভ্যালির ঠিক মাঝ বরাবর দিয়ে বয়ে গিয়েছে একটা সরু স্ট্রিম বা ঝর্ণা। তার দু’পাশে ফুলের মেলা। তবে জগদ্বিখ্যাত জুকু লিলির দেখা নাই। গভীর নিস্তব্ধতায় প্রাণ ভরে টেনে নিই সবুজ পৃথিবীর বাতাস। শীতল হয় শরীর মন। আসার সময় রাভী দিদি বলেছিল ‘জুকু’ শব্দের মানে ঠান্ডা জলের স্রোত। সার্থকতা খুঁজে পাই জুকু শব্দের। 
 কীভাবে যাবেন: বিমানে কিংবা ট্রেনে ডিমাপুর। সেখান থেকে গাড়িতে কিগেমা। হাঁটা শুরু হয় কিগেমা থেকে সামান্য দূরে ভিস্বেমা অথবা জাখামা ট্রেক পয়েন্ট থেকে। ঘোর বর্ষা বাদে সারা বছরই যাওয়া যায়। তবে জুকু লিলির দেখা পেতে হলে জুন-জুলাই নাগাদ যেতে হবে। কিগেমা বা ভিস্বেমাতে বেশ কয়েকটি হোম স্টে আছে।
রমেন ভট্ট

সম্পর্কিত সংবাদ