Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কাজের নামে জুমলার হ্যাটট্রিক

কেনাকাটার বাজারে এখন প্রায় সারা বছর ধরেই ‘অফার’ বা ‘ছাড়’-এর কথা শোনা যায়।

কাজের নামে জুমলার হ্যাটট্রিক
  • ২০ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কেনাকাটার বাজারে এখন প্রায় সারা বছর ধরেই ‘অফার’ বা ‘ছাড়’-এর কথা শোনা যায়। ক্রেতারাও সেইসব লোভনীয় অফার বেশ উপভোগ করেন। পণ্যের বাজারে এই অফার দেওয়ার বিষয়টি বোধহয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও যথেষ্ট আকৃষ্ট করেছে। তাই বছর পাঁচেক আগে দেশের বেকারদের জন্য রোজগারের দরজা খুলে দিতে জোড়া অফার বাজারে এনেছিলেন তিনি। এমনিতেই গোটা দেশে কাজের বাজার যে তলানিতে ঠেকেছে, তা বোঝার জন্য বিশারদ হওয়ার দরকার নেই। দেশের উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা কাজ না পেয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অনেকে কাজের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন— এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। ভাবছেন বিকল্প হিসেবে ব্যবসার ভাবনাও। অনেক বেকারের মাথায় বহু পরিকল্পনা কিলবিল করছে। কিন্তু ব্যবসা করতে তো পুঁজির দরকার। কোথায় পাওয়া যাবে সেই অমূল্য রতন? অতঃপর শিক্ষিত তরুণ সমাজকে ব্যবসায় প্রয়োজনীয় মূলধন জোগাতে ‘জোড়া অফার’ নিয়ে হাজির হলেন প্রধানমন্ত্রী। যার কেউ নেই, তার মোদি আছে— অনেকটা এমন প্রচারের তুফান ছুটিয়ে ২০২১-২২ সালের অর্থবর্ষে বাজারে আনা হল নতুন প্রকল্প। পোশাকি নাম ‘প্রধানমন্ত্রী এমপ্লয়মেন্ট জেনারেল প্রোগ্রাম’, সংক্ষেপে পিএমইজিপি, সহজ বাংলায় প্রধানমন্ত্রী রোজগার যোজনা। প্রকল্পের সুবিধা পেতে শর্ত বিশেষ নেই। যে কোনও ভারতীয় নাগরিক, বয়স ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে এবং ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ— এমন যে কেউ একা বা সমবায় তৈরি করে কোনও উৎপাদন ভিত্তিক বা পরিবেশ নির্ভর ব্যবসা করার জন্য সাহায্যের আবেদন করতে পারেন। আবেদন মঞ্জুর হলেই মিলবে সেই লোভনীয় জোড়া অফার। একদিকে ব্যাঙ্কের ঋণ, অন্যদিকে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি বা ইনসেনটিভ। ঘোষণা ছিল, টানা পাঁচ বছর এই প্রকল্প চালু রেখে রোজগারের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল, আরও অনেক প্রকল্পের মতো এক্ষেত্রেও তিন বছর পর প্রকল্পটির ‘গঙ্গা প্রাপ্তি’ ঘটেছে। 

Advertisement

অথচ কৃষিকাজের বাইরে ব্যবসা করার জন্য প্রকল্পটি শুরু থেকেই যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিল। স্বনির্ভর হওয়ার এমন সুযোগ বহু বেকার যুবক-যুবতী হাতছাড়া করতে চাননি। এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে আবেদন করেছিলেন। এই ব্যবসা নির্ভর প্রকল্পের ইউএসপি ছিল, মোট বিনিয়োগের সিংহভাগ অর্থই ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে। নিজস্ব পুঁজি হিসেবে দিতে হবে সামান্য একটা অংশ। একটা অংশ ভর্তুকি হিসেবে দেবে কেন্দ্রের মাঝারি ও ছোট শিল্পমন্ত্রক। বেকারত্বের অপবাদ ঘোচাতে মোদি সরকার কতটা আগ্রহী তা বোঝাতে ২০২১-২২-এর প্রথম অর্থবর্ষেই পরপর পাঁচ বছরের জন্য ভর্তুকি বাবদ সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বরাদ্দ করে। প্রথম তিন বছর ঋণ এবং ভর্তুকির টাকাও পান যোগ্য আবেদনকারীরা। তারপরই এক অজানা কারণে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। ফলে পাঁচ বছরের প্রকল্পটির মাঝপথেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে। অথচ ঋণ ও ভর্তুকির জন্য এখনও লক্ষাধিক আবেদনপত্র ব্যাঙ্কে জমা রয়েছে। এদের আবেদন যে আর দিনের আলো দেখবে না তা পরিষ্কার। কেন এমন হল তার কোনও উত্তরই নেই মন্ত্রকের কাছে। অথবা উত্তর থাকলেও তা গোপন করা হচ্ছে। 
কর্মসংস্থানের প্রশ্নে ২০১৪-তে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। শিক্ষিত বেকারদের নিয়ে সেটা ছিল মোদির প্রথম ‘জুমলা’। এর রেশ না মেলাতেই প্রধানমন্ত্রী রোজগার যোজনার নামে দ্বিতীয় ‘জুমলা’টিরও সাক্ষী থাকল দেশ। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ, ২০২৪-এ তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে কর্মসংস্থানের নামে তৃতীয় ‘জুমলা’টির জন্ম দেন তিনি। এবারেও প্রকল্পের ভরপুর চমক ছিল। পোশাকি নাম— এমপ্লয়মেন্ট লিঙ্ক ইনসেনটিভ স্কিম। সংক্ষেপে ইএলআই। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই প্রকল্পে বেসরকারি সংস্থায় প্রথমবার চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের প্রথম মাসের বেতনের ১৫ হাজার টাকা ভর্তুকি হিসেবে দেবে সরকার। দেশের বেহাল কর্মসংস্থানের হাল ফেরাতে এই নতুন জুমলা শুরুর বছর না ঘুরতেই জানা গেল ঘোষিত প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় পাঠানোই হয়নি। ফলে এই প্রকল্পের জন্য ২০২৪-২৫-এর অর্থবর্ষে যে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল তা ফেরত চলে যায় কোষাগারে। এই প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের মতে, সদ্য চাকরিপ্রাপ্তদের প্রথম মাসের বেতনের একটি অংশ সরকার দিয়ে দিলে তাতে আখেরে লাভ হবে বেসরকারি মালিকদেরই। কারণ, ওই ১৫ হাজার টাকা তাঁদের কম দিতে হবে। তার মানে, ভর্তুকি আসলে কর্মীদের স্বার্থে নয়, কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্যও নয়। পরোক্ষে বেসরকারি সংস্থাকে সরকারি অর্থ পাইয়ে দেওয়ার জন্যই এই প্রকল্পটি আনা হয়েছিল। যাই হোক, মোদি জমানায় কাজের সুযোগ বৃদ্ধির নামে বেকারদের নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলা চলছে তো চলছেই। তাঁদের মনে আশা জাগিয়ে হতাশায় ঠেলে দেওয়ার এমন ধাষ্টামি বন্ধ হওয়া জরুরি। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ