প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: ভাষা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল জঙ্গলমহলের মানুষ। পা মেলালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিছিলে। জঙ্গলমহলবাসীর এমন স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেখে তৃপ্ত তৃণমূল সুপ্রিমো। দীপ্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন—‘মানুষের অধিকার রক্ষায় কলিজা ও রক্ত দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এক ইঞ্চি জমি ছাড়ব না।’
ক’দিন আগে কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের জেলা বাংলা ভাষা রক্ষা আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন মমতা। সেই আন্দোলনকে জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার বার্তাও ছিল তাঁর গলায়। বুধবার ঘোষিত কর্মসূচির তালিকায় ছিল ঝাড়গ্রাম। মেদিনীপুরের সার্কিট হাউস থেকে এসেই মুখ্যমন্ত্রী যোগ দেন মিছিলে। শহরের সারদা বিদ্যাপীঠ মোড় থেকে দুপুর আড়াইটায় মিছিল শুরু হয়। গোটা জঙ্গলমহল উজাড় করে কাতারে কাতারে মানুষ তাতে যোগ দেন। ভাষা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঝাড়গ্রামবাসীর এমন অভুতপূর্ব সাড়া দেখে অভিভুত মমতা। তাঁর এক হাতে বীরসা মুন্ডা, অন্য হাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি। মিছিলের অগ্রভাগে হাঁটা শুরু করলেন তিনি। প্রথম সারিতে মন্ত্রী অরুপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম, মানস ভুঁইয়া, ভূমিকন্যা বীরবাহা হাঁসদা, জেলা সভাপতি দুলাল মুর্মু। পিছনে হাঁটছেন হাজার হাজার মানুষ। চোখ যতদূর যায়, শুধু কালো মাথার সারি। শহরের রাস্তার দু’পাশে প্রচুর সংখ্যক লোক দাঁড়িয়ে জানান দিয়ে গিয়েছে—‘আমরাও শামিল বাংলা ভাষা বাঁচাও আন্দোলনে।’
দীর্ঘ মিছিলের মাঝে মাঝে আদিবাসী সংস্কৃতির কোলাজ। ধামসা মাদলের আওয়াজ। সেই আওয়াজের সঙ্গে মিশছে ভাষা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জঙ্গলমহলবাসীর গর্জনও। বারবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। যেতে যেতে বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি। সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিজের গলায় থাকা হলুদ উত্তরীয় পরিয়ে দিলেন মূর্তিতে। ‘বর্ণ পরিচয়’-এর শ্রষ্ঠার চরণতলে শ্রদ্ধায় মাথা নত গোটা মিছিলের।
মিছিল শেষ হয় শহরের প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথা মোড়ে। সেখানে বাঁধা হয়েছিল মঞ্চ। সেই মঞ্চকেই এদিন ভাষা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে পুরোদস্তুর ব্যবহার করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, জঙ্গলমহলের সামগ্রিক বিকাশ নিয়েও আত্মতৃপ্তির সুর শোনা গিয়েছে তাঁর গলায়। বলেছেন, ‘একদা সন্ত্রাস কবলিত এই জেলায় বারবার এসেছি। এখন শান্তি ফিরে এসেছে। এখানকার বাসিন্দাদের পিঁপড়ের ডিম, গাছের শিকড় সেদ্ধ করে খেতে দেখেছি। জেলার মানুষ এখন ভালো রয়েছেন। এটাই আমার পাওনা।’
মন্ত্রমুগ্ধের মতো মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে বাংলা ভাষা বাঁচাতে সংকল্প নিলেন ঘাটালের বাসিন্দা অরুণ দাস। তিনি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী আমাদের জন্য লড়ছেন। তাই তাঁর হাত আরও শক্ত করতে ঝাড়গ্রামে এসেছি। বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। তাকে রক্ষা করার দায়-দায়িত্ব আমাদের।’ মিছিলে হাঁটছিলেন বিনপুর-২ ব্লকের সিঙ্গাডোবার বধূ তাপসী মুর্মু। তিনি বলছিলেন, ‘দিদি আমাদের জীবন বদলে দিয়েছেন। তাঁকে দেখার ইচ্ছে ছিল বহুদিনের। আজ তা পূরণ হল।’ লালগড় থেকে আসা বছর পঞ্চাশের এক বাসিন্দা কথায়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই জেলায় শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। মাওবাদীরা মূল স্রোতে ফিরেছে। ঢালাও উন্নয়ন হয়েছে। এটা আমাদের বড় প্রাপ্তি।’
এদিন মিছিলের বহর দেখে অক্সিজেন পেয়েছে ঝাড়গ্রামের তৃণমূলও। জেলা সভাপতি দুলাল মুর্মু বলেন, ‘মিছিলে জেলার সাধারণ মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান আগে আমরা দেখিনি। অভিভাবকের মতো জঙ্গলমহলের মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা নিজের করে নিয়েছেন আমাদের দলনেত্রী। অরণ্য ভূমির মানুষও তাঁকে আপন করে নিয়েছেন।’