মানুষের ভালোবাসায় বন্য জন্তুও পোষ মানে। অর্ধ শতাব্দী আগে তানজানিয়ার জঙ্গলে গিয়ে কীভাবে এক ব্রিটিশ মহিলা শিম্পাঞ্জিদের পোষ মানিয়েছিলেন, সেই গল্পই শোনালেন মৃণালকান্তি দাস।
মানুষের ভালোবাসায় বন্য জন্তুও পোষ মানে। অর্ধ শতাব্দী আগে তানজানিয়ার জঙ্গলে গিয়ে কীভাবে এক ব্রিটিশ মহিলা শিম্পাঞ্জিদের পোষ মানিয়েছিলেন, সেই গল্পই শোনালেন মৃণালকান্তি দাস।
শিম্পাঞ্জিরাও মানুষের মতো করে ভাবতে পারে! মানুষের মতো কৌশল রপ্ত করতে পারে! এটি প্রথম যিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন, তিনি গোটা জীবন কাটিয়েছেন শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে গবেষণা করে। এই প্রাণীটির প্রতি তাঁর আত্মিক টানের জন্য তিনি ‘শিম্পাঞ্জিদের মা’(মাদার অব শিম্পাঞ্জিস) নামেই পরিচিত। তিনি ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ ভ্যালেরিন জেন মরিস গুডঅল।
তখন বয়স মাত্র ২৬। তাঁর একমাত্র ডিগ্রি ছিল সেক্রেটারিয়াল স্কুলের একটি সার্টিফিকেট। বিখ্যাত জীবাশ্মবিদ লুই লিকি ভেবেছিলেন, নতুন চোখ আর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বন্য শিম্পাঞ্জিদের রহস্যভেদ করা সম্ভব হতে পারে। তাই তিনি জেন গুডঅলকে পাঠান পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়ার গম্বে স্ট্রিম জঙ্গলে। এই ধারণা যে একেবারেই ভুল ছিল না, তা খুব দ্রুতই প্রমাণিত হয়। ওই সময়ে গুডঅলের কোনও আগাম প্রশিক্ষণ ছিল না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিও ছিল না। ছিল শুধু পশুদের প্রতি ভালোবাসা। গলায় দূরবিন ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াতেন জাতীয় উদ্যানে। দিনের পর দিন, ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতেন জঙ্গলে জঙ্গলে। লক্ষ্য একটাই, শিম্পাঞ্জিদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করা। তিনি দূরে বসে নীরবে নোট করতেন। অপেক্ষা করতেন, মানুষকে তারা মেনে নেয় কি না।
গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে তিনি গবেষণা শুরু করেন। বন্য প্রাণীদের বিভিন্ন সাংকেতিক নাম বা নম্বর দিয়েই চিহ্নিত করার চল ছিল। ধারণা ছিল, আলাদা নামকরণ করলে নাকি আবেগ জড়িয়ে পড়ে নিরপেক্ষতা নষ্ট হবে। তবে সে পথে হাঁটেননি গুডঅল। প্রত্যেক শিম্পাঞ্জির আলাদা আলাদা নামকরণ করেছিলেন। প্রথম কয়েক মাস শিম্পাঞ্জিরা তাঁকে এড়িয়ে চলত। তানজানিয়ার ওই জাতীয় উদ্যানে দুই শিম্পাঞ্জিকে খুব কাছ থেকে লক্ষ করেন গুডঅল। যা শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে গোটা বিশ্বের ধারণা বদলে দেয়। তিনি দেখেন, দু’টি শিম্পাঞ্জি একটি গাছের সরু ডাল ভেঙে, পাতাগুলি ছিঁড়ে ফেলে, ডালটা বাঁকিয়ে ভেঙে একটি উইয়ের ঢিবি খুঁচিয়ে তার ভিতর থেকে উই বের করে মুখে ফেলছে। বেশ কিছু দিন ধরে শিম্পাঞ্জিদের এই কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে গুডঅল এই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছন যে, উন্নত মেধার পশুরা যে শুধু কোনও বস্তুকে নিজেদের কাজের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করতে পারে তা-ই নয়, তারা প্রয়োজনে সেই সামগ্রী তৈরিও করে নিতে পারে। তাঁর এই ‘তত্ত্ব’ সাড়া ফেলে দেয়।
ধীরে ধীরে কয়েকটি শিম্পাঞ্জি গুডঅলের ক্যাম্পের ভিতর পর্যন্ত চলে আসত। তিনি এদের কলা খাওয়াতেন। তিনি শিম্পাঞ্জিদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেন। পরিচয় যত গভীর হতে লাগল, ততই তিনি এদের কাছের একজন হয়ে উঠলেন। এদের নাম দিলেন ডেভিড গ্রেবিয়ার্ড, মিস্টার ম্যাকগ্রেগর, লর্ড ড্রাকুলা, ফ্লো, মেলিসা। বছর পেরতে পেরতে জেন গুডঅল যখন বিশ্বের সবচেয়ে খ্যাতিমান শিম্পাঞ্জি বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠলেন, নামের তালিকাও দীর্ঘ হল। বিঠোফেন, ফ্রয়েড, গ্রাউচো, মিডজ— নামের আর শেষ নেই। পরবর্তী ৬৫ বছর তিনি শিম্পাঞ্জিদের জীবন নথিবদ্ধ করার কাজ করে যান। দশকের পর দশক শিম্পাঞ্জি-পর্যবেক্ষণের কাজের ফসল ‘ইন দ্য শ্যাডো অব ম্যান’, ‘দ্য শিম্পাঞ্জি’র মতো প্রামাণ্য সব বই। পেয়েছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এর মধ্যে আছে রাষ্ট্রসংঘ শান্তির দূত উপাধি, কিয়োটো পুরস্কার, টাইলার পুরস্কার ও ডেম কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার পুরস্কার।
তাঁর সবচেয়ে যুগান্তকারী আবিষ্কার ছিল শিম্পাঞ্জিরা মাংস খায়, এরা নিজের হাতে সরঞ্জাম বানায় এবং ব্যবহার করে। ক্যামেরা জঙ্গলে পৌঁছনোর আগেই তিনি এসব আবিষ্কার করেছিলেন। বই, প্রবন্ধ, ছবি আর চলচ্চিত্র তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। ১৯৬৫ সালে সিবিএসে প্রচারিত তথ্যচিত্র ‘মিস গুডঅল অ্যান্ড দ্য শিম্পাঞ্জিস’ দেখেছিল প্রায় আড়াই কোটি মানুষ।
জেনের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৩ এপ্রিল, লন্ডনের হ্যাম্পস্টেডে। এরপর মা-বাবার সঙ্গে চলে আসেন দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বোর্নমাউথে। সেখানেই কেটেছে আজীবন। তবে বছরের ৩০০ দিন কাটাতেন পৃথিবী পরিক্রমা করে। শিম্পাঞ্জিদের ভাষা অনুকরণ করে দেখিয়ে তিনি সবাইকে মুগ্ধ করতেন। খাবারের গর্জন, সতর্কতার ডাক, আর্তচিৎকার ফুটিয়ে তুলতেন। বিভিন্ন দেশের মানুষকে শোনাতেন তাঁর কাজের কথা। বোঝাতেন, কীভাবে পৃথিবীকে ধ্বংসের খাদ থেকে ফিরিয়ে আনা যায়। নতুন প্রজন্মের জন্য আমরা কোন পৃথিবী রেখে যাচ্ছি, বারবার তুলতেন সেই প্রশ্ন। গুডঅল বলতেন, ‘মানুষ মেধাবী হতে পারে, কিন্তু বুদ্ধিমান নয়। বুদ্ধিমান হলে এ ভাবে নিজের বাসস্থানকে ধ্বংস করে ফেলত না।’
তাঁর লেখায় শিম্পাঞ্জিদের সমাজের জটিলতা ফুটে উঠেছে। যা হিংসা, দলবদ্ধ হওয়া, বিভক্তি, বিশ্বাসঘাতকতায় ভরা। শিম্পাঞ্জিরা একে অন্যের সঙ্গে খুনসুটি করে। এদের ঠান্ডা লাগে, পছন্দের খাবার খায়, বেবুনদের ভেজা ডাল নেড়ে বিরক্ত করে। বৃষ্টিতে এরা নাচে, মৃতদের জন্য শোক করে।
জেন গুডঅল আমাদের শিখিয়েছিলেন প্রাণীর চোখের ভাষা কীভাবে পড়তে হয়। গত বছর ১ অক্টোবর পৃথিবী হারায় প্রকৃতির এই অকৃত্রিম বন্ধুকে। যিনি জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট ও রুটস অ্যান্ড শুটস প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন। রাষ্ট্রসংঘের শান্তির দূত হিসেবে গোটা জীবন ভ্রমণ করে বার্তা ছড়িয়েছেন।