নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও ঢাকা: ভক্তদের কাছে তাঁর পরিচয় ‘নগর বাউল’ হিসেবে। খ্যাতি বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, পৌঁছে গিয়েছে মুম্বইতেও। অথচ ‘নতুন’ বাংলাদেশে মৌলবাদীদের রোষ থেকে রেহাই পেলেন না রক গায়ক জেমস। ফরিদপুরের স্কুলে তাঁর কনসার্টে ঢুকে তাণ্ডব চালাল মৌলবাদীরা। সঙ্গে চলল অবাধে ইটবৃষ্টি। তার ফলে মঞ্চে পৌঁছোতেই পারলেন না গায়ক। ইটের আঘাতে জখম হয়েছে স্কুলের অন্তত ৩০ জন বর্তমান ও প্রাক্তন পড়ুয়া। তবে জেমসের কোনও আঘাত লাগেনি। তিনি গেস্ট হাউস থেকেই ঢাকায় ফিরে যান। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছে, লাঠি হাতে অনুষ্ঠান মঞ্চে দাপাদাপি করছে মৌলবাদীরা। জেমসের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন দুই বাংলার শিল্পীরাই। জেমসের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন এপার বাংলার ‘লক্ষ্মীছাড়া’ ব্যান্ডের গৌরব চট্টোপাধ্যায়। তিনিও এই ঘটনায় উদ্বিগ্ন। বলেছেন, ‘খুবই খারাপ লাগছে। আর কিছু বলার নেই। একটা সময় তো অনেক শো করেছি। এখন আর ডাক আসবে বলে মনেও হয় না।’ ঢাকায় ফিরে এ নিয়ে মুখ খুলেছেন স্বয়ং জেমস। বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ আয়োজকদের অব্যবস্থা ও ব্যর্থতা।’
ফরিদপুর জেলা স্কুলের ১৮৫তম বর্ষপূর্তি ও পুনর্মিলন উপলক্ষ্যে শুক্রবার রাতে জেমস ও তাঁর ব্যান্ডের অনুষ্ঠান ছিল। আয়োজকদের দাবি, স্কুলের অনুষ্ঠান হওয়ায় বাইরের কোনও দর্শককে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তবে জেমসের জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে সাধারণ মানুষের জন্য স্কুলের বাইরে দু’টি প্রোজেক্টর লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কনসার্ট শুরুর আগেই ছন্দপতন। স্কুলের গেটে হামলা চালায় একদল ‘বহিরাগত’। তাতে লাভ না হওয়ায় পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢুকে পড়ে তারা। প্রথমে স্কুলের পড়ুয়া ও প্রাক্তনীরা বহিরাগতদের আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ক্রমশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশে কনসার্ট বাতিল করে দিতে বাধ্য হন আয়োজকরা।
প্রায় ৩০ বছর ধরে গানবাজনার সঙ্গে জড়িত জেমস। একাধিক জনপ্রিয় গানের গীতিকার তিনি। লাইফ ইন আ মেট্রো, গ্যাংস্টারের মতো বলিউডের বেশ কয়েকটি সিনেমাতেও গান গেয়েছেন। উল্লেখজনক বিষয় হল, গত বছর শেখ হাসিনা বিরোধী বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়েছিলেন জেমস। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ‘রিবিল্ডিং দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ারও কথা ছিল তাঁর। পরে অবশ্য নিরাপত্তার কারণে সেই অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে যায়। এর পরেও জেমসকে মৌলবাদীদের তাণ্ডবের শিকার হতে হল। লেখিকা তসলিমা নাসরিনও এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘ছায়ানট, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে। উদীচীকেও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ জিহাদিরা খ্যাতনামা শিল্পী জেমসকেও মঞ্চে উঠতে দিল না।’ কনসার্ট বাতিলের পিছনে অবশ্য রাজনৈতিক বা অন্য কোনও কারণ নেই বলে জানিয়েছে ফরিদপুর জেলা প্রশাসন। তাদের দাবি, নিরাপত্তাজনিত কারণেই অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।
জেমসের কনসার্টে হামলা
ক্ষুব্ধ এপার বাংলার শিল্পীরা
বাংলাদেশের শিল্পী ও শিল্পের উপর বারবার আঘাত আসছে। এই ধরনের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এমন পরিস্থিতি চললে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসর আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।
সিধু
এই বাংলাদেশকে আমি চিনি না। জেমসের মতো একজন শিল্পী কনসার্ট করতে পারলেন না! এর থেকে বেদনাদায়ক কিছু হতে পারে?
রাঘব চট্টোপাধ্যায়
শিল্প প্রচণ্ড সংকটে। অবক্ষয়ের দিকে এগচ্ছে। এভাবে কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, এটা ভাবাই যায় না। আর যে কতখানি খারাপ দিকে যাবে? অত্যন্ত ন্যক্করজনক ঘটনা।
মনোময় ভট্টাচার্য
যে কোনও পরিস্থিতিতে এমন ঘটলে তা শিল্পের ক্ষতি করে। এটা কারা করেছে, জানা নেই। জেমস অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ, ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা উচিত ছিল। তবে এই ধরনের ঘটনা সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না।
সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়