Bartaman Logo
২০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

গল্পকথায় জামাইষষ্ঠী

জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে। এই উৎসবের গুরুত্ব ও ইতিহাস জানুন। বিস্তারিত পড়ুন।

গল্পকথায় জামাইষষ্ঠী
  • ২০ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পুরনো  দিনের পঞ্জিকার জামাইষষ্ঠীর ছবিতে ধুতি পাঞ্জাবি পরে বাবাজি বসে আছে কোঁচা দেওয়া ধুতি। পকেট থেকে ঝুলে আছে একটা ছোট্ট চেইন, অনেক পরে বুঝেছি ওটা পকেট ঘড়ি। আমার পকেটে ঘড়ি আছে, এইটা বোঝানোর জন্য চেইনটা একটু বেশিই  ঝুলছে। জামাইয়ের সামনে হাফ ঘোমটা পরা শাশুড়ি ঠাকুরানি। হাতে তালপাতার পাখা। জামাই বাবাজীবনের সামনে একটা থালা, তাতে কত রকমারি তরকারি মাছ মাংস সাজানো। বাটিতে মাছের মুড়োটা বেশ বড়ো। জামাইকে ঘিরে চার-পাঁচজন যুবতী মেয়ে। ছবিতে হাসির শব্দটা শোনা যাচ্ছে না। পিছনে পর্দার ফাঁক দিয়ে মুখ বেরিয়ে থাকা একটা মেয়ে, সম্ভবত সেই হচ্ছে এ বাড়ির মেয়ে। ‘বউ’ হয়ে গিয়েছে বলে লজ্জা। কোনো কোনো পঞ্জিকার ছবিতে দেখেছি জামাইয়ের কোঁকড়ানো চুল, মাঝখানে সিঁথি । গলায় উড়নি, মানে প্যাঁচানো চাদর। 

Advertisement

এরকম ছবির জামাই কিন্তু চোখে দেখিনি আমি। বাংলা ভাষার প্রথম সবাক চলচ্চিত্রটির নাম ‘জামাই ষষ্ঠী’। মুক্তি পায় ১৯৩১ সালে। এক কেপ্পন শ্বশুরের বোকাসোকা জামাই নিয়ে ম্যাডান থিয়েটারের মজার ছবি। পরিচালক অমর চৌধুরী। এই ছবির জামাই বাবাজি দেখতে কেমন ছিল আমি জানি না। সম্ভবত নাদুসনুদুস। আমার দাদুর তিনটি জামাই। মানে, আমার তিনজন পিসেমশাই। দাদুর এক জামাই এক্স মিলিটারি, কিন্তু ছাগল পোষেন। সেই সঙ্গে জুটে গেলে যজমানিও করেন। আবার মিলিটারি কোটার পানীয়র বোতলও আনেন। দেওয়ালে মিলিটারি পোশাকের ছবি। মেজো জামাইয়ের ভালো ব্যবসা। আর ছোটো জামাই পেটরোগা সরকারি কর্মচারী। জামাইষষ্ঠীতে দাদু জামাইদের নেমন্তন্ন করতেন ঠিকই কিন্তু পাঁচ রকমের তরকারি পাঁচ রকমের মাছ দই রাবড়ি কখনো দেখিনি। আর তিন জামাইকে জামাই-আদরে বসিয়ে তোয়াজ করাও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। আসলে জ্যৈষ্ঠ মাসের এই দিনটায় আমাদের বাড়িতে যে অনুষ্ঠান, সেটা ‘ষষ্ঠীপুজো’ বলে পালিত হত, ‘জামাই ষষ্ঠী’ বলে নয়। কারণ আমরা বাঙাল। পূর্ব বাংলার ঢাকা-বিক্রমপুর জেলায় জামাই তোয়াজ বা জামাইষষ্ঠী আগেই ঢুকে গিয়েছিল, কারণ বহুবিধ, এখানে ওসব থাক। এখন শহুরে জামাইষষ্ঠীগুলি হল বাবু কালচারের উপজাত পদার্থ। 
জষ্ঠি মাসের ষষ্ঠী পুজোটা আসলে ছিল একটি গ্রামীণ প্রথা বা উৎসব, যেটা মূলত শিশুদের মঙ্গলকামনার জন্য করা হত। শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলায় একজন দেবতা আছে তার নাম পঞ্চানন্দ আর একজন দেবী আছে, তার নাম ষষ্ঠী। আমরা যখন থাকতাম, আমার ঠাকুরমা ষষ্ঠী ঠাকুর গড়তেন নিজের হাতে। এঁটেল মাটি জোগাড় করতাম, একটা গোবদা মূর্তি তৈরি করতেন, বেশ মোটাসোটা। দুটো হাত তৈরি করলেও পা তৈরি করতে পারতেন না। মূর্তি অনেকটা রাস্তাঘাটে গাছতলায় যে সমস্ত লোকদেবীর বিগ্রহ থাকে, মুখ থাকে কিন্তু শরীর থাকে না, ওরকম দেখতে হয়। তারপরে অপেক্ষা  ছিল ওই কালো বিড়ালি আর ধলা বিড়ালির জন্য। আটার পিটুলি দিয়ে ঠাকুরমা বেড়াল বানাতেন। বলতেন বটে, বেড়াল, কিন্তু দেখতে মোটেও বেড়ালের মতো নয়। 
ধলা বেড়ালি ঠিকই আছে। কিন্তু কালো বেড়াল বানানো বেশ মুশকিল ছিল। আটার সঙ্গে কালো রংটং কিছু মিশিয়ে তৈরি করা হত। বেড়াল হল ষষ্ঠী দেবীর বাহন। আরও আছে, চার-পাঁচটা ছোটো বাচ্চাকাচ্চা মায়ের কাঁধে, কোলে। শিশু বানানো তো খুব সহজ। একটা মুণ্ডু বানাও, একটা ধড়, সরু সরু করে দুটো হাত দুটো পা। নাক চোখ কান না দিলেও চলে। কিন্তু মা ষষ্ঠীর চোখ তৈরি করতে হয়। মাটির টিপে একটা নাক আর গোলগাল মুখ। ষষ্ঠী ঠাকুরানি বানিয়ে একদিন রোদ্দুরে শুকাতে হত। তারপর পুজোর দিন অশোক, জোড়া করমচা, খেজুর গুচ্ছ, দুব্বোঘাস এই সমস্ত নিয়ে পিছনে রাখা হত। সামনে ফল ফলোজি দিয়ে গল্প বলতেন। সেই গল্পটাই হল আসল ব্রতকথা। ব্রতকথাটা হচ্ছে এক গ্রামে সেই বউয়ের। একদিন হল কী, তার প্রসব বেদনা হল। প্রসব করল একটা লাউ। তো লাউ দেখে বাড়ির লোকজন খুব ভয় পেয়ে গেল। তারপর সেই লাউ থেকে কিলবিলিয়ে বেরিয়ে এল ষাট ষাটখানা শিশু। 
কী আর করা যাবে, শিশুরা বড়ো হতে লাগল। ওদের বিয়ে দেওয়া হল। তার মধ্যে এক বউ খুব লোভী ছিল। রান্নাঘরে চুরি করে খেত, বিশেষ করে মাছটাছ খেয়ে নিত। খাবার কোথায় গেল? বিড়ালির নামে দোষ দিত, খেয়ে গিয়েছে। ষষ্ঠীঠাকুর, ইনি তো আবার অপবাদ সহ্য করতে পারেন না। ষষ্ঠী ঠাকুর বললেন, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা! তো বউয়ের ছেলেগুলো কোথায় হারিয়ে যায়, কী হয় কেউ কিছু বলতে পারে না। তখন সেই বউ মনের দুঃখে বনে চলে গেল। মা ষষ্ঠী বুড়ির ছদ্মবেশে হাজির হল।  বলল, কিরে বউ তুই কাঁদিস কেন? বউ বলল, আমার ছেলেগুলো একটা একটা হয় আর কোথায় হারিয়ে যায়। 
তখন মা ষষ্ঠী বললেন, ওই যে সামনে দেখ, কালো বিড়াল মরে পড়ে রয়েছে, আর মাছি ভনভন করছে, তুই জিভ দিয়ে চেটে ওর গা পরিষ্কার করে দে। 
এই অবধি পড়ে ঠাকুরমা আমাদের মুখের দিকে তাকাতেন।  
আমরা  তখন মুখ বেঁকিয়ে বলছি, এএএএ মা কী ঘেন্না...!
ঠাকুরমা বলছেন যেমন কাজ তেমন তো ফল পেতেই হবে। কী আর করবে বউ, জিভ দিয়েই চাটল আর বমি করল। ততক্ষণে বৃদ্ধা অদৃশ্য হয়ে গেছে, আর সাত ছেলেই তখন ফিরে এল। 
এই অবধি বলে, উলু, তিনবার শাঁখ। এবার হাতজোড় করে নমস্কার। মন্ত্র অনেকটা এরকম।
ষাট ষাট ষাট
মা ষষ্ঠীর পায়ে দিই হাত 
ছেলে হোক দুধ হোক 
রোগজ্বালা দূর হোক 
ওরা যেন থাকে দুধে ভাতে 
তোমার গড় করিয়া যেই প্রভাতে 
অনেকটা এরকম। সহজ সরল। 
পুরোহিত দর্পণ খুললাম। ষষ্ঠী দেবীর পূজাপদ্ধতি ওখানে দেখি সংস্কৃত মন্ত্র।
‘গৌরাভ্যাংদ্বিভুজাং নানালঙ্কারম ভূষিতাং পীনোন্নত পয়োধরাম
সপুত্রকাম, প্রসন্না বদনাং...।’
বোঝাই যাচ্ছে লোকদেবীকে হাইজ্যাক করে নিয়েছে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র।
বনে গিয়ে ঘরের বউ এই তিথিতে ষষ্ঠী ঠাকুরানির দেখা পেয়েছিল, তাই এর নাম ছিল অরণ্যষষ্ঠী।
শিশুমঙ্গলের জন্য এই অনুষ্ঠানটিতে সংযুক্ত হয়ে গেল জামাই। সংযুক্ত করে নিল লোকসমাজ। একটা কারণ আছে, একটা নিয়ম ছিল, মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরে মেয়ের বাবা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে  যেতেন না, যতদিন না মেয়ের কোনো সন্তান হচ্ছে। 
একান্নবর্তী পরিবারে বাড়িতে আরও তো সন্তানাদি আছে তাই অরণ্যষষ্ঠী ব্রতও হচ্ছে। গাছে আম কাঁঠাল পেকেছে, এই সুযোগে মেয়ে জামাইকেও নেমন্তন্ন করা যাক। মেয়েকে তো একবার চোখের দেখা দেখা যাবে। এভাবে জামাই ঢুকে গেল এই ব্রত পালনে। তারপর মেয়ের ঘরে সন্তানাদি হলে সন্তানসহ মেয়ে জামাই বাপের বাড়িতে এল। 
শহুরে জনারণ্যে অরণ্যষষ্ঠীর পুরনো ব্যাপারটাই হারিয়ে গেল। ব্যাপারটা শিশুকেন্দ্রিক ছিল, হয়ে গেল জামাইকেন্দ্রিক। কিন্তু সারা বাংলায় নয়। আগেই বলেছি, পুরো বাংলার সর্বত্র এই জামাইষষ্ঠী ছিল না, মেদিনীপুর জেলাতেও ছিল না বলে জানি। কলকাতা ও কলকাতার সান্নিধ্যধন্য এলাকাগুলিতে জামাইষষ্ঠীর এই রং লেগে ছিল। আবার এ নিয়ে রং তামাশাও কম ছিল না। মজার গল্প তৈরি হত। প্রথম সবাক চলচ্চিত্রর কথা তো বলেছি, প্রহসন ছিল। একটা প্রবাদ তৈরি  হয়ে গেল ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’। অষ্টাদশ শতকের কোনও রসিক পণ্ডিত বানিয়েছিলেন—
‘হবির্বিনা হরি যাতি বিনা পীঠেন মাধবঃ।
কদন্নেঃ পুণ্ডরীকাক্ষ প্রহারেণ ধনঞ্জয়ঃ।।’ 
মানে, চার জামাই, হরি, মাধব, পুণ্ডরিকাক্ষ, ধনঞ্জয় ষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়ি এসে আর যায় না। ঘি দেওয়া বন্ধ করাতে হরি চলে গেল, পিঁড়ি বিনা মাধব, খাবার আরও খারাপ হওয়া শুরু হলে পুণ্ডরী গেল, কিন্তু ধনঞ্জয় আর যায় না। শেষমেশ মেরে ভাগাতে হল।
এই গল্পের উৎপত্তিকালে জামাইরা পঞ্জিকার ছবির মতো ততটা বাবু হননি। চুনোট ধুতির কোঁচা, গিলে পাঞ্জাবির জামাইবাবু হয়ে ওঠেননি। জামাইবাবুদের এই রূপান্তর আরও পরের কথা।
জামাইষষ্ঠী যদি শিশুকেন্দ্রিক অরণ্যষষ্ঠীর রূপান্তর না হয়ে জামাইদের জন্যই হত, তবে জ্যৈষ্ঠ মাসের এই ঘেমো গরমে না হয়ে শীতকালেই হত। 
সেই অরণ্যষষ্ঠীর অবশেষ কিন্তু আজও টিকে আছে। ষষ্ঠীর আগে বাজারে বট অশ্বত্থ, অশোকের ডাল, জোড়া করমচা, খেজুর গুচ্ছ, কচি বাঁশের ডগা এসব বেশ ভালো দামেই বিক্রি হয়।  তালপাতার একটা মিনি পাখা। এসি চললেও নিয়ম তো আছে জামাইকে পাখার বাতাস দিতে হয়, আর বাঁশের ডগার অভাবে দূর্বা জলে চুবিয়ে মাথায় ছিটিয়ে বলতে হয়, ষাট ষাট।
হয়তো ‘স্বস্তি’ থেকে এই ‘ষাট’ শব্দটার উৎপত্তি। কিন্তু ষাট আছে কি না, তাই বান্ডিলে ষাট গাছি বাঁশের ডিগ বা দুব্বো। ষাটের বড্ড দাম, তাই ছ’টা অন্তত। 
শাশুড়িদের কত হ্যাপা ছিল। কী নতুন পাওয়া যাচ্ছে, কী মেনু হবে? পটলের দোলমার পুরে চিংড়ি থাকবে না ছানা? মাছের কালিয়া তো পুরনো হয়ে গিয়েছে। কে যেন বলেছিল মাছের একটা ভিয়েতনামি রেসিপির কথা, কী যেন নাম...। আধুনিক জামাইষষ্ঠীতে এসব বালাই নেই।  হোটেলে হয়। ওখানে এসব ষাট ষাট, পাখার ব্যজন, এসব চলে না। খাওয়াটাই আসল। আর কেতাটাও। কিন্তু পরবর্তী গ্যাস মোচনটা আবহমানের। গত দুশো বছরে পরিবর্তন হয়নি। ওটি জামাই স্পেশাল।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ