সংবাদদাতা, রঘুনাথপুর: বংশে পরপর ১৯ কন্যার জন্ম। স্বপ্নাদেশ পেয়ে মা জগদ্ধাত্রীর আরাধনা করার পর বংশে এক পুত্রের জন্ম হয়। পঞ্চকোট রাজসভার পণ্ডিত হারাধন আচার্য দেবীর কৃপাতেই পুত্রের জনক হন বলে কথিত। তারপর থেকেই পুরুলিয়ার কাশীপুর ব্লকের মণিহারা গ্রাম পঞ্চায়েতের শিয়ালডাঙা গ্রামে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু হয়। বর্তমানে জেলা ছাড়িয়ে গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এই পুজোর খ্যাতি। চলতি বছর সেই পুজো ১৫৫ বছরে পড়ল। পারিবারিক পুজো হলেও এখন তা সর্বজনীন রূপ ধারণ করেছে। পুজো দেখতে জেলা সহ পাশের জেলা বাঁকুড়া থেকেও বহু মানুষ আসেন। চাকরি ও বিভিন্ন কাজের সূত্রে বাইরে থাকা গ্রামের বাসিন্দারা পুজোর সময় বাড়ি ফিরে আসেন। পুজো উপলক্ষ্যে গ্রামে মেলা বসে।
জানা গিয়েছে, এখানে পাঁচদিন ধরে শাক্ত মতে পুজো হয়। পুজোর মূল আকর্ষণ হল নবমীর অন্নভোগ। এখানে নবমীর দিন গোলাকার একটি উনুনে ২৩টি হাঁড়ি বসিয়ে অন্নভোগ রান্না হয়। এবছরও প্রায় তিন হাজার মানুষ অন্নভোগ খেয়েছে। মহানবমীর অন্নভোগের প্রস্তুতি বুধবার অষ্টমীর দিন থেকেই শুরু হয়েছিল। অন্নভোগে ছিল ভাত, কুমড়োর তরকারি, মুগের ডাল, দেশি মাছের ঝোল। পাশাপাশি নবমীর দিন ছাগ বলি দেওয়া হয়।
পুজো কমিটির সদস্যরা জানান, গ্রামের হারাধন আচার্যর প্রপিতামহ দীনমণি গঙ্গোপাধ্যায় হুগলির হামাটা থেকে শিয়ালডাঙা গ্রামে এসেছিলেন। পাণ্ডিত্যের কারণে কাশীপুরের পঞ্চকোটের রাজা তাঁকে আচার্য উপাধিতে ভূষিত করেন। দীনমণিবাবুর পৌত্র হারাধনবাবুর স্ত্রী পরপর ১৯ কন্যার জন্ম দেন। স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুত্রসন্তানের আশায় ১৮৭১ সালে হারাধনবাবু জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন। দু’বছর পরই তাঁর স্ত্রী পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। প্রথা মেনে আজও আচার্য বংশের উত্তরসূরিরা পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন।
একচালা মাতৃ প্রতিমার দুই পাশে থাকেন জয়া ও বিজয়া। ঋষি মার্কণ্ডেয় ও দেবর্ষি নারদ থাকেন সঙ্গে। সবার উপরে থাকে দুই পরি। দেবী এখানে চতুর্ভুজা। সমস্ত নিয়ম মেনেই মায়ের পুজো হয়। এখানে একাদশীতেও পুজো পান দেবী। গ্রামের মানুষ সকলে পুজোয় শামিল হন। গ্রামের মেয়েরা পুজোর সময় বাপেরবাড়ি আসেন।
পুজো কমিটির সভাপতি বামাপদ আচার্য বলেন, প্রথমে একটি মাটির ঘরে পুজো শুরু হয়। তারপরে একটি একতলা বাড়ি মধ্যে পুজো হয়ে আসছিল। মায়ের নতুন মন্দির নির্মাণ হয়েছে। এবছর সেই মন্দিরে মায়ের পুজো হল। নবমীর দিন মূল পুজো হয়। তিনটি সন্ধিতে(সকাল, দুপুর, রাতে) তিনবার ছাগ বলি হয়।
পুজো কমিটির সম্পাদক সুকুমার গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, আচার্য পরিবারের পুজো হলেও সকল গ্রামবাসী পুজোয় অংশগ্রহণ করেন। বর্তমানে পুজো সার্বজনীন রূপ ধারণ করেছে। পুজোয় অষ্টমী ও নবমীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। দশমী ও একাদশীতে দুই দিন ধরে গ্রামীণ দলের যাত্রাপালা হয়।