২০১৭ সালে মোদি সরকার মোট পাঁচটি ধাপে পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) চালু করেছিল। এতগুলি ধাপে এবং অত্যন্ত চড়া হারে জিএসটি আদায় নিয়ে সরকারকে লাগাতার সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। সমালোচনার প্রধান দিক ছিল সরলীকরণের আশ্বাস দিয়ে বাস্তবে এক জটিলতর করব্যবস্থার মধ্যেই ফেলা হয়েছিল দেশকে। তাতে সমস্যা বেড়েছিল ক্রেতা, বিক্রেতা উভয়েরই। চড়া করহার বেশিরভাগ পণ্য ও পরিষেবাকে অগ্নিমূল্য করেছিল। তার ফলে বহু মানুষ ভোগব্যয় কমাতে বাধ্য হয়। অর্থনীতির সরল নিয়মেই এই পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব পড়েছিল ছোটো ও মাঝারি শিল্প-ব্যবসার উপর। এমএসএমই সেক্টর রুগ্ণ হয়ে পড়ছিল। তাতে উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও বড়ো আঘাত নামিয়ে এনেছিল। এই ‘তুঘলকি কর সংস্কার’ অবিলম্বে বদল করার দাবিতে সবার আগে সরব হন বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জিএসটি সংস্কারে তাঁর প্রধান দাবিগুলির মধ্যে ছিল—জীবনদায়ী ওষুধ এবং বিমার উপর থেকে জিএসটি প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এই দাবিতে কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত একাধিকবার আন্দোলন হয়েছে।
অবশেষে সাড়া দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একদিন তিনি ঘোষণা করেন যে, এবার তাঁর সরকার দীপাবলির বিরাট উপহার দেবে। কী সেই উপহার? ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ থেকে জিএসটিতে বড়ো মাপের রেহাই মিলবে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের ঘোষণা অনুসারে, জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমা দুটিই করমুক্ত হয়েছে। এছাড়া ৩৩টি জীবনদায়ী ওষুধ (ক্যানসারের তিনটি ওষুধও রয়েছে তার মধ্যে)-সহ ১৭৫টি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হ্রাসের প্রতিশ্রুতি ছিল ওই ঘোষণায়। এমনকি জিএসটি আর পাঁচ ধাপে নয়, নয়া ব্যবস্থায় আদায় করা হবে মাত্র দুটি ধাপে। বুঝিয়ে দেওয়া হল যে, সব মিলিয়ে দেশজুড়ে এক ফুরফুরে আর্থিক ব্যবস্থা আসতে চলেছে মোদি সরকারের বদান্যতায়। কিন্তু বাস্তবে কী পেলাম আমরা? সবই প্রকাশ্য হল ক্রমে! নাগরিকের লাভের গুড় সোজা পিঁপড়েয় খাচ্ছে। ওষুধে জিএসটি ছাড় বা হ্রাসের কোনো প্রভাব বাজারে এখন নেই। কমবেশি অধিকাংশ ওষুধেরই দাম দিন দিন চড়া হচ্ছে। সাধারণ পরিবারগুলির ক্রয়ক্ষমতার বাইরে প্রতিটি ওষুধ। তবু কি মানুষ ওষুধ কেনা বন্ধ করেছে? না। জীবন তো একটাই! অনেক খরচ মুলতুবি রেখেও মানুষ জীবনদায়ী ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এদেশে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কখনোই সব মানুষের সব প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম নয়। ফলে গরিব মানুষও বাধ্য হয় বেসরকারি ডাক্তারের চেম্বারে যেতে, নার্সিংহোমে এবং বেসরকারি হাসপাতালে ভরতি হতে। কিন্তু একটা সাধারণ অসুখেরও চিকিৎসার পর যে মোটা অঙ্কের বিল পেশেন্ট পার্টির হাতে ধরানো হয়, তা দেখে আত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ারই অবস্থা হয় তাদের। ঠেকে শিখে বহু পরিবার এখন নিজ উদ্যোগে স্বাস্থ্যবিমা কেনে। আর্থিক সামর্থ্য তাদের সীমিত, তবুও মধ্যবিত্ত, এমনকি নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও স্বাস্থ্যবিমা ক্রয়ের অভ্যাস বেড়ে চলেছে। বেসরকারি ক্ষেত্রে চিকিৎসার খরচ যত বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যবিমার চাহিদা।
আর এই সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করছে যেন কিছু বিমা সংস্থা। তাদের প্রিমিয়ামের চাপ মাত্রা ছাড়াচ্ছে ক্রমেই। স্বভাবতই নাভিশ্বাস ছুটেছে সাধারণ মানুষের। অথচ মোদিবাবুরা দাবি করেছিলেন, এবার স্বাস্থ্যবিমা কেনা সহজ হয়ে যাবে। স্বাস্থ্যবিমার আওতায় চলে আসবে আরও বেশি মানুষ। কারণ প্রিমিয়ামের উপর জিএসটি ১৮ শতাংশ থেকে নামিয়ে শূন্য (০) করেছে সংশ্লিষ্ট জিএসটি কাউন্সিল। কিন্তু বাস্তব যে উলটো সাক্ষ্যই দিচ্ছে! প্রিমিয়াম বাবদ খরচ কমার বদলে বেড়েই চলেছে! তার উপর ক্লেম পেতেও কালঘাম ছুটছে গ্রাহকদের। বহু ক্ষেত্রে পুরো ক্লেম মেটানো হচ্ছে না। এমনকি ১৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্লেমের পুরোটাই নাকচ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষত ডায়ালিসিস এবং কেমোথেরাপির মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে একাধিক বিমা সংস্থা পলিসি রিনিউ করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে প্রিমিয়ামে জিএসটি শূন্য হলেও নিয়মের কলকাঠিতে কোনো সুরাহাই হচ্ছে না বিমা ক্রেতা বা গ্রাহকের। কেন্দ্রীয় বিমা নিয়ামক সংস্থা আইআরডিএআইয়ের সাম্প্রতিক তথ্যেও এই সত্য ধরা পড়েছে। বঞ্চনার বিরুদ্ধে আইনমাফিক অভিযোগ জানিয়েও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুরাহা অধরা। তাই সংগত প্রশ্ন ওঠে, সরকার বাহাদুর কি শুধুই লেনেওয়ালা? বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াবার বেলা যে তারা অদৃশ্য! অথচ করদাতাদের অর্থেই সরকারের যত কাপ্তানি। তাই সুরাহাও তাদের অধিকার। চিকিৎসা পরিষেবা এবং স্বাস্থ্যবিমার সমস্যায় মানুষকে সুরাহা দিতে সরকারকে কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে মোদি সরকারকে।