সুকান্ত বসু, কলকাতা: আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বছর ১৯-এর তরুণী সুপ্রিয়া মণ্ডল। একটু আগেই তাঁকে অপরাধের সাজা শুনিয়েছেন বিচারক। কাঁদতে কাঁদতে সুপ্রিয়ার আকুতি, ‘কেউ একটু দেখবেন, কোর্টের বাইরে সুজয় দে বলে কোনও যুবক অপেক্ষা করছে কি না?’ এমন আবদার শুনে নিরাপত্তারক্ষী, আদালতের কর্মীদের ভ্রূ কুঞ্চিত হল বটে, কিন্তু কোনও হেলদোল দেখা গেল না। কথা শেষ হতে না হতেই তাঁকে নিয়ে জেলে যাওয়ার জন্য রাখা গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন পুলিসকর্মীরা। যাওয়ার পথে তরুণী সামনের জটলার দিকে তাকিয়ে রইলেন শূন্য দৃষ্টিতে—সে কি তবে আসেনি! কোথাও সুজয়কে দেখতে না পেয়ে গাড়িতে ওঠার আগে তরুণী বলে গেলেন, ‘ও (সুজয়) এলে বলবেন, আমার চার বছর জেল হয়েছে। ও যেন জেলে গিয়ে একবার দেখা করে। বিয়ে যদি করতে হয়, তাহলে ওকেই করব।’ কোনও জমজমাট সিনেমার ক্লাইম্যাক্স নয়! বনগাঁ আদালতের সাম্প্রতিক ঘটনা। তরুণী আদতে বাংলাদেশের খুলনার সোনাডাঙার বাসিন্দা। তাঁর প্রেমিক সুজয় দে থাকেন কলকাতায়। আদালত সূত্রে খবর, রায়দানের পরের দিনই কলকাতার ওই যুবক বনগাঁ আদালতে এসে তাঁর প্রেমিকার খোঁজখবর নেন। তবে তিনি জেলে গিয়ে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করেছিলেন কি না, জানা যায়নি।
কিন্তু বাংলাদেশের বাসিন্দা সুপ্রিয়া মণ্ডলকে ভারতের আদালত কেন জেলের সাজা দিল? বনগাঁ আদালত সূত্রে খবর, সোশ্যাল মিডিয়ায় আলাপ হয়েছিল কলকাতার যুবক সুজয়ের সঙ্গে খুলনার তরুণী সুপ্রিয়ার। সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হতে থাকে। শেষমেশ সুজয়কে বিয়ে করতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে পড়েন তরুণী। বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই কাঁটাতারের বেড়া টপকে ভারতে প্রবেশ করতে গিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার বাগদা সীমান্তে ধরা পড়ে যান। অনুপ্রবেশের মামলা দায়ের হয়। আদালত জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয়। এরপর তদন্ত শেষ করে বনগাঁ আদালতে চার্জশিট পেশ করে পুলিস। মামলাটি বিচারের জন্য যায় বনগাঁর দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক প্রদীপকুমার অধিকারীর এজলাসে। সেখানে সম্প্রতি চার্জ গঠন করে শুনানি শুরু হওয়ার কথা ছিল। জেল থেকে তরুণীকে আদালতে হাজির করানো হয়। মামলার শুরুতেই সুপ্রিয়া বিচারককে জানান, ভালোবাসার টানে এবং ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতেই তিনি পাসপোর্ট ও বৈধ নথি ছাড়াই ভারতে ঢুকতে চেয়েছিলেন। আদালতের কাছে আর্জি জানান, তাঁকে যেন তাঁর প্রেমিকের কাছে যেতে দেওয়া হয়। সমস্ত বক্তব্য শোনার পর বিচারক তাঁকে বলেন, ‘আপনার বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া আপনি আদালতের কাছে দোষ কবুল করেছেন। তাই আইনের বিধান অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করে চার বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হল। সেই সঙ্গে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছ’মাসের হাজতবাস।’
কার্টুন: সুব্রত মাজী