তন্ময় মল্লিক: যদি প্রশ্ন করা হয়, এই মুহূর্তে বঙ্গ রাজনীতির সবচেয়ে চর্চিত বিষয় কী? উত্তর আসবে একটাই, বিচারাধীন ৬০লক্ষের মধ্যে ভোটার তালিকায় ফিরবে কত নাম। সেই সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও একটা ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত, যাদের জন্য এই হয়রানি তাদের রেয়াত করবেন না বিচারাধীন ভোটাররা। কারণ নির্বাচন কমিশন তাঁদের ‘বিচারাধীন’ করলেও কলকাঠি কারা নাড়ছে, তা জলের মতো পরিষ্কার। তাই ছাব্বিশে নির্বাচনে বাংলার ফল জানার জন্য গণনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলেও ‘বিচারাধীন’দের সমর্থন কোন দিকে যাবে, তা এখনই স্পষ্ট।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে জ্ঞানেশ কুমার যখন রাজ্য প্রশাসনের কর্তাদের ধমক দিচ্ছিলেন ঠিক তখনই সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিল, বিচারাধীন ভোটারদের নিয়ে কমিশন নয়, শেষ কথা বলবেন বিচারকরা। ১০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট মানুষের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে বেশকিছু নির্দেশ দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, জানাতে হবে নাম বাতিলের কারণ। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের ফলে বিচারাধীন ভোটারের নাম ‘ডিলিট’ করার আগে তথ্য যাচাইয়ের ব্যাপারে আরও সতর্ক হবে কর্তৃপক্ষ।
মাইক্রো অবর্জারভার ও রোল অবর্জাভারদের দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে এরাজ্যে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬০ লক্ষ। এই সব ভোটারের ভাগ্য কমিশনের হাতে থাকলে পরিণতি হত ভয়াবহ। এটা শুধু বিরোধীদের অভিযোগ নয়, উপলব্ধি সুপ্রিম কোর্টেরও। সেই জন্যই দেশের সর্বোচ্চ আদালত বিচারাধীন ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব দিয়েছে বিচারকদের। তবে, সেই কাজও যাতে বিচারকরা দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে শেষ করতে না পারেন তারজন্য কমিশন নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ। বিষয়টি অনুধাবন করেছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। তাই সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া রিপোর্টেও কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। সংবিধানের কাছে ‘নিরপেক্ষ’ ভূমিকা পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ নির্বাচন কমিশনকেও সন্দেহের চোখে দেখছে সুপ্রিম কোর্ট। তবে, টিম জ্ঞানেশ কুমারের যা ট্র্যাক রেকর্ড তাতে হাল ছাড়বে বলে মনে হয় না। এরপরেও বিচারাধীনদের আটকাতে প্যাঁচ কষে পরিস্থিতি জটিল করতে চাইবে।
ইতিমধ্যেই ১০লক্ষ ১৬হাজার বিচারাধীন ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছেন বিচারকরা। বাদ গিয়েছে ৩লক্ষ ৪হাজার নাম। অর্থাৎ কমিশনের চোখে সন্দেহজনকদের প্রায় ৭০ ভাগই ছিলেন বৈধ ভোটার। এই পরিসংখ্যান কী প্রমাণ করছে? নির্বাচন কমিশন লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ফন্দি এঁটেছিল। তাই ২০০২ সালে যাঁরা ভোট দিয়েছিলেন তাঁদেরও ‘বিচারাধীনে’র তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ না করলে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যেত। কিন্তু, তৃণমূল নেত্রীর সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল ও মেট্রো চ্যানেলের ধরনা বিজেপির বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে। তাই তাঁর উপর বিজেপির এত রাগ।
প্রথম পর্যায়ে বিচারাধীন ভোটারদের প্রায় ৭০ শতাংশের নাম ‘সাপ্লিমেন্টারি’ ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কমিশন নতুন ফ্যাকরা তৈরি না করলে বাকি ৫০লক্ষের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০লক্ষ নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। সংখ্যাটা ৪৫লক্ষ হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এতদিন বিরোধীরা দাবি জানাচ্ছিলেন, নাম বাদ দিলেই হবে না, জানাতে হবে তার কারণ। নির্বাচন কমিশন বিরোধীদের সেই দাবিকে পাত্তা দিচ্ছিল না। কিন্তু, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, জানাতে হবে নাম বাতিলের কারণ। এর পাশাপাশি যাঁদের নাম বাতিল হবে তাঁরা চাইলে ট্রাইবুনালে গিয়ে ফের ভোটার হওয়ার আবেদন জানাতে পারবেন। সেই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য, ‘কমিশন যে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অনেকটাই খুলে গিয়েছে।’
এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ‘তুঘলকি’ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিজেপি-বিরোধী সব দল সরব হয়েছে। তবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিচারাধীনদের ভোটার তালিকায় ফেরার দরজা খুলে দিয়ে
ছক্কা হাঁকিয়েছেন। তাঁর সুপ্রিম সওয়াল ও মেট্রো চ্যানেলের ধরনাকে বিরোধীরা যতই ‘নাটক’ বলে কটাক্ষ করুক না কেন বিচারাধীনরা জানেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইয়ের জন্যই নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে। তা না হলে বাংলাও ‘বিহার’ হয়ে যেত।
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বশাসিত সংস্থা বিজেপির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে কেন? এর কারণ বিজেপি এবং কমিশন একই সুরে কথা বলছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বাংলায় এসে কী বলে গেলেন? বললেন, একজন অবৈধ ভোটারের নামও যেন ভোটার তালিকায় না থাকে। নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে সংশোধনের দায়িত্বে থাকা অফিসারদের। জ্ঞানেশ কুমার কিন্তু একটি বারের জন্যও বললেন না, কোনো বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে অফিসার বা মাইক্রো অবর্জাভারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি তিনি বলতেন তাহলে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস কেউ পেত না।
এসআইআর নির্বাচনি ব্যবস্থার অঙ্গ হলেও বিজেপি তাকে দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করার হাতিয়ার বানাতে চেয়েছিল। সেই উদ্দেশ্যেই এসআইআর শুরুর আগে থেকেই বঙ্গ বিজেপির নেতারা এক কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়ার কথা সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন। তাঁরা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে যে ভোটের ফারাক আছে সেটা মুছে দেবে এসআইআর। বিষয়টি সেদিকেই গড়াচ্ছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করায় বিজেপি কর্মীরা বুঝেছেন, কাজটা মোটেই সহজ হবে না। সেই কারণেই তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এসআইআর গেরুয়া শিবিরের কর্মীদের মনে ছাপ ফেলতে পারেনি। সেই কারণেই বিজেপির পরিবর্তন যাত্রায় ভিড় হয়নি। পরিবর্তন যাত্রার সভায়
লোক টানার জন্য বিজেপির চেষ্টার ত্রুটি ছিল
না। বক্তাদের তালিকায় ছিলেন অভিনেতা থেকে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। দু’চার জায়গায় কিছুটা ভিড় হলেও অধিকাংশ এলাকাতেই ছিল হাতে গোনা লোকজন। ফলে নেতারা দু’চার মিনিট থেকেই রথ নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, যেসব এলাকায় বিজেপির বিধায়ক বা সাংসদ আছেন সেখানেও ভদ্রস্থ কর্মী-সমর্থক জোগাড় করতে পারেননি উদ্যোক্তারা। বাঁকুড়ার তামলিবাঁধের সভায় লোকজন না থাকায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার মঞ্চে পর্যন্ত ওঠেননি। অথচ বাঁকুড়া বিধানসভায় গতবার জিতেছিল বিজেপি।
পরিবর্তন যাত্রায় লোক না হওয়ার জন্য বিজেপির কেউ কেউ ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের দিকে আঙুল তুলছেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘নির্বাচনের মুখে ভোট কেনার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুবসাথী প্রকল্প ঘোষণা করেছেন। তাতে দলমত নির্বিশেষে যুবক-যুবতীরা আবেদন করেছেন। অনলাইনে যাঁরা আবেদন করেছিলেন তাঁদের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে। অফলাইনে আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই হচ্ছে। পরিবর্তন যাত্রায় অংশ নিলে তাঁদের নাম বাদ যাবে এই আশঙ্কায় অনেকেই পরিবর্তন যাত্রায় যোগ দেননি। তবে, ভোট তাঁরা বিজেপিকেই দেবেন।’ পরিবর্তন যাত্রার সভায় যুবকদের অনুপস্থিতির কারণ ‘যুবসাথী’র টাকা হাতছাড়া হওয়ার ভয়, নাকি বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু বাস্তবটা হচ্ছে, একুশে বিজেপিকে ঘিরে যুবকদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল, এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই।
এই পরিস্থিতিতে আজ, শনিবার ব্রিগেডে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। ‘পরিবর্তন যাত্রা’ ফ্লপ করায় যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তা মেরামতের জন্য ব্রিগেডে বড়ো জমায়েতের মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে বিজেপি। চালানো হচ্ছে স্পেশাল ট্রেন। পাঁচ বছর ধরে বাংলাকে নানাভাবে বঞ্চিত করে বাঙালিপ্রেমী সাজার চেষ্টা করছে। তারজন্য দক্ষিণেশ্বরের আদলে তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। তুলে ধরা হচ্ছে বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ছবি। সরকারি অনুষ্ঠান থেকে দেওয়া হবে বাংলার উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি। তবে থাকবে শর্ত, বাংলাকে তুলে দিতে হবে বিজেপির হাতে। আর থাকবে ‘মোদি কা গ্যারান্টি’। কারণ নির্বাচন এলেই তিনি বুক চাপড়ে ‘গ্যারান্টি’ বিলিয়ে থাকেন। এখন দেখার, মতুয়াদের জন্য মোদি কী বলেন? তবে, এবার ‘মোদি কা গ্যারান্টি’র গাজর ঝুলিয়ে লাভ হবে না। কারণ গোটা দেশ জেনে গিয়েছে, ‘মোদি কা গ্যারান্টি’ মানেই ফাঁকা আওয়াজ।