নিজস্ব প্রতিনিধি, জলপাইগুড়ি ও সংবাদদাতা, রাজগঞ্জ: খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত প্রশান্ত বর্মনকে অবশেষে রাজগঞ্জের বিডিওর চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই ব্লকের যুগ্ম বিডিও সৌরভকান্তি মণ্ডলকে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাজ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন জেলাশাসক শমা পারভীন। অর্থাৎ, আপাতত রাজগঞ্জে বিডিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সৌরভকান্তি। জেলাশাসকের নির্দেশের পরই রাজগঞ্জ বিডিওর চেম্বারের সামনে থেকে প্রশান্ত বর্মনের নেমপ্লেট খুলে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বিডিওর পদ যেতেই রাজগঞ্জের পাশাপাশি জলপাইগুড়ি জেলাজুড়ে তুমুল জল্পনা, তাহলে কি প্রশান্তর ‘দাবাংগিরি’ শেষ? পাড়ার মোড় থেকে চায়ের ঠেক সর্বত্রই চর্চা তুঙ্গে। প্রশান্ত শুধু রাজগঞ্জ ব্লকে নয়, জেলার প্রশাসনিক মহলেও রীতিমতো ‘ত্রাস’ হয়ে উঠেছিলেন বলে অভিযোগ। শোনা যায়, তিনি নাকি এতটাই ‘প্রভাবশালী’ ছিলেন যে, বিডিও প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে মুখ খোলার কার্যত ‘সাহস’ পেতেন না আধিকারিকরা। জেলা প্রশাসনের ডাকা বহু মিটিংয়ে দিনের পর দিন প্রশান্তকে গরহাজির থাকতে দেখা গিয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, বেশিরভাগ দিনই দিনের বেলায় অফিসে গিয়ে বিডিওর দেখা মিলত না। সন্ধ্যার পর অফিসে ঢুকতেন তিনি। বিডিওর সঙ্গে তাঁর ‘সাঙ্গপাঙ্গ’রাও রাত পর্যন্ত ব্লক অফিসে থাকতেন। অন্য জেলা থেকে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের নিয়ে এসে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে প্রশান্তর বিরুদ্ধে। জানতে চাইলে প্রশান্তর কড়া জবাব ছিল, ‘বিডিওর চাকরি ২৪ ঘণ্টার। কখন আমি অফিসে আসব, তা নিয়ে কৈফিয়ত দিতে হবে?’
নিজেকে দাবাং হিসেবে পরিচয় দেওয়া প্রশান্ত রাজ্য সরকারকেও বিপাকে ফেলতে ছাড়েননি। বেহাল রাস্তা নিয়ে বাসিন্দারা ক্ষোভ জানালে তিনি দাওয়াই দেন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নেওয়া বন্ধ করুন। তাহলে রাস্তা সংস্কার হবে।’ কিন্তু তারপরও প্রশান্ত স্বমেজাজে দাপিয়ে বেরিয়েছেন। তাঁর বদলির অর্ডার বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়েও চর্চা হয়েছে বিভিন্ন মহলে। স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা খুনের ঘটনায় নাম জড়ানোয় ‘জাতপাতের তাস’ খেলার চেষ্টা করেন প্রশান্ত। বলেন, আমি রাজবংশী বলেই আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত চলছে। প্রশান্তর পাশে দাঁড়িয়ে ভিডিও বার্তা দেন কেএলও প্রধান জীবন সিংহ। কিন্তু রাজবংশীরা তাঁর পাশে দাঁড়াননি। বরং তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আইন আইনের পথে চলবে।
এরপরই পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গা ঢাকা দেন প্রশান্ত। নিম্ন আদালতে আগাম জামিন মঞ্জুর হওয়ায় দু-একদিন অফিসে দেখা মিলেছিল তাঁর। কিন্তু নিম্ন আদালতের নির্দেশ হাইকোর্ট খারিজ করে দিতেই আর অফিসে পা রাখেননি প্রশান্ত বর্মন। হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দেশের শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। কিন্তু ২৩ জানুয়ারির মধ্যে প্রশান্তকে আদালতে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে বিডিওর পদ থেকে সরিয়ে দিল প্রশাসন। বিডিওর কাজের দায়িত্ব পাওয়া সৌরভকান্তি মণ্ডলের সঙ্গে এদিন দেখা করেন রাজগঞ্জের বিধায়ক খগেশ্বর রায়, রাজগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রূপালি দে সরকার। বিধায়ক বলেন, বিডিও না থাকায় অনেক কাজ পড়েছিল। যুগ্ম বিডিওকে বিডিওর কাজের দায়িত্ব দেওয়ায় আমরা খুশি।