নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: নির্দেশ সত্ত্বেও প্রায় পঞ্চাশ বছরের আগে জমি দখল করে বেআইনিভাবে খাল বানানোর ক্ষতিপূরণ দেয়নি সেচদপ্তর। যার জেরে আদালতের নির্দেশে নদীয়া ডিভিশনের সেচদপ্তরের এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের অফিস বন্ধ করে দেওয়া হল। শুক্রবার বিকেলের দিকে নদীয়া জেলার জলঙ্গি ভবনের দোতলার অফিসের ছ’টি ঘর সিল করে দেওয়া হয়। তার আগে জলঙ্গি ভবনে বিশাল পুলিস বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। ১৯ আগস্ট এই রায় দিয়েছিলেন তৃতীয় মুন্সেফ আদালতের বিচারক দিব্যেন্দু দাস।
১৯৭৭-৭৮ সালের ঘটনা। তেহট্ট থানার কুড়ি নম্বর পাঁচদ্বারা মৌজার অভয়নগরে আজগর শেখ, আজমত শেখ, খেজমত শেখ ও সুলতান শেখের মোট ২.৬৫ একর জমি ছিল। একদিন তাঁরা দেখতে পান যে, সেচদপ্তরের উদ্যোগে তাঁদের জমির উপর খাল খনন শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রশাসনের তরফ থেকে তাঁদের জানানো হয়, শীঘ্রই জমি অধিগ্রহণের নোটিস দেওয়া হবে। কিন্তু কয়েক বছর কেটে গেলেও জমি অধিগ্রহণের কোনও নোটিস তাঁদের হাতে পৌঁছয়নি।
পরবর্তীতে জমির মালিকরা প্রশাসনের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেন। কিন্তু বিনা নোটিসে জমি দখলের প্রায় ২০ বছর কেটে গেলেও তৎকালীন সরকার ক্ষতিপূরণ দিতে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। অবশেষে ১৯৯৭ সালে তাঁরা কৃষ্ণনগর আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় দাবি করা হয়, জমির প্রকৃত মালিকানা আদালতের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হোক এবং খনন কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হোক।
২০০০ সালে আদালত রায়ে জানিয়ে দেয় যে, জমির প্রকৃত মালিক আজগর শেখ, আজমত শেখ, খেজমত শেখ ও সুলতান শেখ। পাশাপাশি, কোনওরকম আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সরকার খনন করেছে বলে জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণের যোগ্য— এই মন্তব্যও করে আদালত। খনন কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রাজ্য সরকার পাল্টা মামলা করলেও আদালত আগের রায় বহাল রাখে। তবে খনন বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয়। ২০০৪ সালে জমির মালিকরা পুনরায় ক্ষতিপূরণের দাবিতে মামলা করেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজ্য সরকার নানা অজুহাতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারটি এড়িয়ে যায়। অবশেষে ২০২২ সালে জমির মালিকরা কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। তাতে আদালত নির্দেশ দেয়, ল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট ১ লক্ষ ৮১ হাজার টাকা এবং সেচদপ্তর ৩৩ লক্ষ ১৯ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেবে। ল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট টাকা দিয়ে দিলেও সেচদপ্তর এখনও পর্যন্ত টাকা দেয়নি।
এরপর জমির মালিকরা পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হন। তারই প্রেক্ষিতে গত ১৯ আগস্ট কৃষ্ণনগর আদালত নদীয়া জেলার সেচদপ্তরের এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের অফিস সিল করার নির্দেশ দেয়। সেইমতো এদিন জলঙ্গি ভবনের দোতলার অফিসটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। জমির মালিক পক্ষের আইনজীবী দেবব্রত মৈত্র বলেন, জমির মালিকদের কোনও নোটিস না দিয়েই বেআইনিভাবে ৪৭ বছর আগে খাল খনন করা হয়েছিল। অথচ তার জন্য এখনও পর্যন্ত ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়নি। সেই নিয়েই আমরা লড়ছিলাম। কয়েকদিন আগেই আদালত অফিস সিল করার নির্দেশ দেন। সেচদপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, আমাদের জলঙ্গি ভবনে দু’টি অফিস রয়েছে। গ্রাউন্ড ফ্লোর সাব ডিভিশনাল অফিস এবং দোতলায় নদীয়া ডিভিশন অফিস। কিন্তু আদালতের নির্দেশে ডিভিশন অফিসের বেশ কয়েকটি ঘর বন্ধ করে দেওয়া হল। এখন বর্ষার মরশুম, কাজ করতে সমস্যা হবে।